দপ করে কীরকম নিভে গেল ছেলেটা। নার্ভাসনেসের মাথায় একটা কাঁচি ধরিয়ে বসল। তারপর নিজের পায়ের ডগার দিকে তাকাতে তাকাতে বলল, চলি।
আমাকে কিন্তু কীরকম জিঘাংসায় পেয়ে বসেছিল। বাক্যবাগীশ সঞ্জীবের কথা হারিয়ে গেছে দেখেও বলতে ছাড়লাম না, টম ফিলপটের একটা অটোবায়োগ্রাফি পেয়েছি। চাইলে উলটে পালটে দেখতে পারিস, প্রেমিকাকে বুঝতে সাহায্য করবে।
একরাশ ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে সঞ্জীব কথার উত্তর না দিয়ে চলে গেল। তখনো বুঝিনি ও আর কখনো কথা কইবে না আমার সঙ্গে। আর আমারও কেন জানি না কোনোদিন ইচ্ছে হল
ওর সঙ্গে সম্পর্ক মেরামত করার। অথচ বুকটা কীরকম হু হু করে উঠল খবরের কাগজের একটা খবরে, বেশ ক-বছর পর। একই সঙ্গে প্রবল গৌরব বোধও হল সঞ্জীব এককালে আমার বন্ধু ছিল বলে। খবরে জানলাম, কচ্ছ ও ছাম্বের পাক-ভারত যুদ্ধে ওর ন্যাট বিমানে শত্রুদের বেশ কিছু প্লেন ধ্বংস করে তরুণ বৈমানিক সঞ্জীব দত্ত বীরের মৃত্যু বরণ করেছেন।
দ্বিতীয় ঘটনাটা সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত। ততদিনে আমাদের বাসাবদলের তোড়জোড় চলছে, রোজ সন্ধে নামলেই বুকটা কীরকম মোচড় দিয়ে ওঠে। হায়, এইসব দৃশ্য, মুখ মানুষ সম্পর্ক ছেড়ে চলে যেতে হবে। রাস্তায় যাকে পাই তার কাছ থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নিই।
এভাবে একদিন মিন্টো রো-র বন্ধুদেরও হাত নাড়তে গেলাম। পাড়া ছাড়তে মোটে চারদিন বাকি।
হঠাৎ দেখি বিশাল ভিড় ১৪ নম্বর বাড়ির সামনে। যাকে বলে লোকে লোকারণ্য। বুকটা কেঁপে উঠল কীরকম, লোরেন সুইন্টনদের বাড়িতে কিছু ঘটল নাকি। ওদের ওখানে তো ঝামেলা লেগেই আছে নিত্য। মদোমাতালদের নিয়েই তো কারবার ফ্যামিলিটার।
একটুক্ষণ পর ফের ভিতরটা আনচান করতে লাগল। তাহলে রেচেলের কিছু হল না তো আবার।
দ্বিতীয় আশঙ্কাটাই সত্যি হল, তবে রেচেলের কিছু হয়নি, যদিও ঘটনাটা ওকে নিয়েই। শুনলাম, তিন হপ্তা খাওয়া-দাওয়া ত্যাগ করেছিল রেচেল। টম ফিলপটকে সহ্য করতে পারত না, দেখলেই বলত, তোমার চোখের মধ্যে আমি একজন খুনিকে দেখতে পাই।
ফিলপট জিজ্ঞেস করত—কার খুনি।
রেচেল বলত, আমার মা-র খুনি।
ফিলপট বলত, তোর মা নিজের হাতে প্রাণ নিয়েছে। জিজ্ঞেস কর রুক্মিণীকে।
তখন চিৎকার করে প্রতিবাদ করত রেচেল, না! তুমি গুলি করেছ মাকে।
সে দিনও এই তর্কই লেগেছিল পালক পিতা ও কন্যায়। লোরেন আর ওর মা-ও ছুটে এসেছিল ওদের মিটমাট করাতে। রেচেল সমানে বলে যাচ্ছিল, তোমরা ওকে বার করে দাও এখান থেকে। এখানে হয় ও থাকবে, নয় আমি। আমি মা-র খুনির সঙ্গে থাকব না।
টম ফিলপট তখনই কোটের পকেট থেকে রেচেলের জন্য করা উইলটা বার করে টেবিলে রাখেন। তারপর অন্য পকেট থেকে রিভলবার বার করে নিজের মাথায় শুট করেন। মৃত্যুর আগে ওঁর শেষ কথা ছিল, রেচেল, আমি তোর মতো কাউকে কোনোদিন ভালোবাসিনি জীবনে। ঈশ্বর তোকে ভালো রাখুন!
মিন্টো রো ছেড়ে এলেও বিগত চল্লিশ বছর পাড়াটা আমার মগজে ভর করে আছে অতৃপ্ত আত্মার মতো। আমার স্ত্রী বলে, মিন্টো রো-র ভূত তোমায় জন্মেও ছাড়বে না। আজও আমি স্বপ্ন দেখি শুধু মিন্টো রো-কে। ইতিমধ্যে কত কত পাড়ায় থাকলাম, কিন্তু তারা কেউই আমার স্বপ্নে বাসা বাঁধল না। আর, মিন্টো রো-র মধ্যেও একটা বিশেষ বাড়ি তার নিজস্ব স্থাপত্য ও রহস্য নিয়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রইল অন্ধকার বেলাভূমিতে পরিত্যক্ত বাতিঘরের মতো। আমার স্বপ্নের লাইট হাউস।
আর আজ খবরে বলছে, সে বাড়িটা আর শাবল-গাঁইতির কোপ থেকে রক্ষা পাবে না। বহুক্ষণ নিশ্ৰুপ থাকার পর স্ত্রীকে বললাম, আজ ফিরতে দেরি হবে। একটু মিন্টো রো ঘুরে আসব। স্ত্রী বললে, কেন, ওখানে আবার কী ঘটল?
বললাম, ঘটেনি। ঘটতে চলেছে।
-কীরকম?
–কর্পোরেশন থেকে ১৪নং মিন্টো রো পেড়ে ফেলবে।
— সে আবার কী! যা শুনেছি তোমাদের থেকে, ও তো পোড়োবাড়ি নয়।
ক্লান্তস্বরে কোনোমতে বললাম, কে জানে, কোনো প্রমোটারই লেগে গেল পিছনে হয়তো। প্রমোটারই তো কর্পোরেশন চালায়।
শীতের অন্ধকারে চল্লিশ বছর পর ১৪ নম্বরে উঠতে উঠতে দিনবদলের কত অজস্র সুর। শুনতে লাগলাম। একতলার গঞ্জালভেস পরিবার উঠে গেছে, তাদের ফ্ল্যাটের দরজায় দেখলাম সাইনবোর্ড আটা-শাহু ইলেকট্রনিক্স’। তার উলটোদিকের ফ্ল্যাটে থাকত বাড়ির একমাত্র হিন্দু বাসিন্দা আড্ডি পরিবার। তামাক না ছাপাখানা কী যেন নিয়ে ব্যাবসা করত ওরা। সেখানে ঝুলছে সাইনবোর্ড–নৌরতন কেমিক্যালস। আমি দ্রুত পা চালিয়ে উঠে গেলাম দোতলায়।
না, এখানে লোরেন সুইন্টনরা বহুকাল নেই, ওদের মলিন দরজাটায় বর্তমান বাসিন্দাদের কোনো নেমপ্লেটও নেই। ওদের পাশে যে ফ্ল্যাটে শোনা যায় প্রায়ই আসতেন কিশোরী মার্ল ওবেরন, সে ফ্ল্যাটের দরজা হাট করে খোলা। ভিতরটা ঘন অন্ধকার, এখানে প্রেতাত্মা ছাড়া আর কিছুর বাস সম্ভব না। আমি অন্ধকার সিঁড়ি ভেঙে উঠে গেলাম রেচেলদের তলায়, আর অমনি বুকের মধ্যে ধড়াস ধড়াস শব্দ শুরু হল। এতদিন পর ওরা কি আর থাকবে? আর থাকলে…
চিন্তাটা কোথাও পৌঁছোনোর আগে ফ্ল্যাটের বেল টিপে বসেছি। তারপর অন্ধকারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আকাশ-পাতাল ভাবছি। রেচেল কি বেঁচে আছে? বেঁচে থাকলে ও কি সুন্দর আছে? ওর কত বয়স হবে এখন? ওর চোখ…
