দেখলাম আগের দিনে দেখা সেই চাহনির কথা লিখেছেন ফিলপটও। আমি শ্বাসরুদ্ধ হয়ে পড়লাম–
কালিম্পং-এ রেচেলকে রাখা নিরাপদ মনে হল না। প্রথমত, ওকে জঙ্গলে খুঁজে পাওয়ার কাহিনিটা একটু একটু করে শহরে ছড়িয়েছে। দ্বিতীয়ত, অর্ফানেজের অনেকেই বলাবলি শুরু করেছে, ওর চাহনি ও কিছু কিছু আচরণ নিয়ে। ওর তাকানো নাকি একেক সময় বাঘিনির তাকানো হয়ে ওঠে। এত অবধিও ঠিক ছিল, কিন্তু নতুন উপদ্রব হয়েছে এক ইহুদি দম্পতির কনভেন্টে আসা-যাওয়া। তাদের কাছে উড়ো খবর এসে পৌঁছেছে যে, তাদের হারিয়ে যাওয়া কন্যাটি নাকি জঙ্গল থেকে উদ্ধার হয়ে আপাতত কনভেন্টে আছে। সিস্টার পার্টন ওদের কথাবার্তায় বিশেষ বুঝ মানছে না, ওর ধারণা কাগজের রটনা থেকে ওরা গল্প ফেঁদে বাচ্চাটাকে হাতাতে চাইছে। কিন্তু, আমি ভিতরে ভিতরে প্রমাদ গুনছি, এ শিশুকে প্রাণ থাকতে আমি কারও হাতে তুলে দিতে পারব না। কুড়িয়ে পাওয়ার সময় ওর গলায় যে ছোট্ট কারে-বাঁধা লকেট দেখেছিলাম, তাতে বাস্তবিক হিব্রুতে কী সব লেখা ছিল। আমি বাচ্চাটিকে স্নান করানোর সময় সন্তর্পণে সেটা সরিয়ে দিয়েছি।
উপরিউক্ত তৃতীয় কারণটির জন্যই রেচেলকে নিয়ে কলকাতায় চলে যাওয়া স্থির করলাম। ইতিমধ্যে লণ্ডন থেকে চিঠি এল এস্থারের, সে শেষজীবন আমার সঙ্গেই কাটাতে চায় ভারতে, তবে কলকতায় নয়, দার্জিলিং-এ। বলা বাহুল্য, এতে যে আমি কী স্বস্তি পেলাম ভাষায় বোঝাতে পারব না। কালবিলম্ব না করে আমি দার্জিলিং-এ একটা বাংলো কেনার উদ্যোগ নিলাম।
কিন্তু হায় কপাল, যা নিয়ে স্বপ্ন দেখা যায় তার কতটুকুই বা বাস্তব হয়। প্রথম রাত থেকে এস্থার ভয় পেতে লাগল রেচেলের ব্যাঘ্রচাহনিকে। রেচেলও দেখলাম বেশিক্ষণ সহ্য করতে পারে না এস্থারকে। শেষে একদিন নৈশভোজের সময় খাবার টেবিলের এপার থেকে ওপার জন্তুর মতো ঝাঁপ দিয়ে নখ দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে দিল ওর মুখ। আমি সেদিনই মনস্থ করলাম, একবার দেখা করব সেই ইহুদি দম্পতির সঙ্গে যারা ক্রমাগত দাবি করে গেছে। শিশুটিকে।
সিস্টার পার্টনের কাছে শুনলাম যে, রেকস্টাইন দম্পতি মধ্য কলকাতার বাসিন্দা, সিস্টার ঠিকানাও দিল। আমি সেই বাড়ি, ১৪ নম্বর মিন্টো রো-তে, যেদিন হাজির হলাম তার ক-দিন আগেই মধ্যবয়সী দম্পতি সন্তানশোকে বিষ খেয়েছে। কেউ কেউ বললে, বিষে নয়, ওরা মরেছে গলায় দড়ি দিয়ে। সারা ফ্ল্যাট দেখলাম লন্ডভন্ড হয়ে আছে, কোনো জিনিসটাই ন্যায্য চেহারায় নেই। আর ওই উলটুল আসবাবপত্রের জঙ্গলে হঠাৎ আমার নজরে এল একটা ছোট্ট ফ্রেমে বাঁধানো শিশুর ছবি। বয়স আর কত হবে? এক কি দেড়। কিন্তু, ওই একঝলকেই ছবির বাচ্চাটাকে চিনে ফেলা যায় রেচেল বলে। আমি ছবিটা তুলে নিয়ে বাড়ির কাজের মেয়েটাকে বললাম, এই কি ওদের হারিয়ে যাওয়া মেয়ে?
মেয়েটা আমার কথা শেষ হতেই একটা বুকফাটা চিৎকার জুড়ে কেঁদে উঠল, হ্যাঁ, সাব, ও-ই মিসিবাবা। বৃহৎ কোশিশকে বাদ ও আয়ি থি। সাহাব, অউর মেমসাবকো এক হি বচ্চা।
জিজ্ঞেস করলাম, কিন্তু ও হারিয়ে গেল কী করে? মেয়েটা বলল, কুছ পতা নাহি সাব। শুনা এক পহাড়ি জঙ্গলমে সাবকা গাড়ি উঁচাইসে গির পড়ি। সাব, মেমসাব বেহুস থে, হাঁসপতালমে চোখ খোলকে দেখে কি মিসিবাবাকা পতা নহি।
কথা শেষ করেই মেয়েটা ফের কান্না জুড়ল। আমি ওকে কাঁদতে নিষেধ করে বললাম, তোমার মিসিবাবা যদি ফিরে আসে, তুমি থাকবে এখানে?
মেয়েটা বিস্ময় আর অবিশ্বাস-মেশা চোখে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকাল, তারপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল আমার পায়ে, ম্যাঁয় আখরি শ্বাস তক উসকো পালুঙ্গি, সাব। মেহেরবানি করকে উসে লওটা দিজিয়ে।
আমি ওকে টেনে তুলে দাঁড় করিয়ে বললাম, আমি তোমাদের মেয়েকে ফেরত দিতেই এসেছি।
বেরোবার মুখে জিজ্ঞেস করলাম, কত মাসে বাচ্চাটা হারিয়ে যায়? কাজের মেয়ে রুক্মিণী বলল–দেড় বছর। মনে মনে হিসেব কষে বুঝলাম রেচেলকে ছ-মাস কি এক বছর পালন করেছিল ওর বাঘিনি মা। হঠাৎ ডান হাতের তর্জনীটি ভীষণ জ্বালা-জ্বালা করতে লাগল।
এরপর রেচেলকে নিয়ে যে দিন ফিরলাম রেকস্টাইনদের ফ্ল্যাটে রুক্মিণীকে দেখে অবাক চোখে ওর দিকে চেয়ে রইল রেচেল। তারপর নিঃশব্দে হেঁটে গিয়ে ওর কোলে উঠে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করল। রুক্মিণী ওর শাড়ির কোঁচড় থেকে এবার বার করল একটা হিরের হার আর দুল। বাচ্চাকে হারটা পরাতে পরাতে বলল, মেমসাবনে ইয়েচিজ মুঝে ইন্তেকালকে দিন দে গয়ি। উনকা বহেন অউর দামাদনে সারা ঘর ছান মারা ইস হিরাকে লিয়ে। ম্যায়নে কবুল নহি কি। মুঝে বিশ্বাস থা কি বাচ্চা একদিন ওয়াপস আয়েগি। তব উসকো লওটাউঙ্গি।
বলে রেচেলকে চুমোতে চুমোতে ভরাতে লাগল রুক্মিণী। বইটা শেষ করে টেবিল ল্যাম্প নিভিয়ে ঘুমোতে যাওয়ার আগে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম, আর কখনো ও বাড়িমুখো হব না। এর দু-বছর পর ওই পাড়া ছেড়ে আসা অবধি আমি নিজের কাছে নিজের কথা রেখেছিলাম। কিন্তু, ওই দু-বছরের মধ্যেই দু-দুটো ঘটনা ঘটে গিয়েছিল রেচেল সংক্রান্ত। যা মন থেকে মুছে যাওয়ার নয়।
এক, সঞ্জীবের সঙ্গে বন্ধুত্বের ইতি, যার অনেকখানি দায়িত্বই আমার। রেচেলদের বাড়ি থেকে ওভাবে পালিয়ে আসার পর একদিন কথায় কথায় জিজ্ঞেস করলাম ওকে, তোর বান্ধবীর কী খবর? ও থতোমতো খেয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, কোন বান্ধবী? বললাম, আবার কার কথা বলছি তাহলে! ও বলল, ক-দিন যাওয়া হয়নি, যেতে হবে আজকালের মধ্যে। বললাম, পারলে আজই যা। বড্ড তোর কথা বলছিল সে দিন।
