বললাম পুরো ব্যাপারটা। ওর চোখ দুটো কাচের গুলির মতো গোল হয়ে গেলে। বলল, আমি বিশ্বাস করি না।
বললাম, তুমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করো, তা হলেই হবে। এসব সাধারণ ব্যাপারে তোমার বিশ্বাস করলেও চলবে।
সিস্টার পার্টন জিজ্ঞাসা করল, এর নাম কী হবে?
বললাম, ও তো তোমার মেয়ে, তাই পার্টন।
-ও তো পদবি হল, আর নাম?
-রেচেল!
সিস্টার পার্টন একটু থমকে গেল যেন, রেচেল? আপনি তো দেখছি নাম ঠিক করেই এসেছেন। তবু জিজ্ঞাসা করছি, রেচেল কেন?
বললাম, কারণ ওটা আমার মায়ের নাম। জন্মমুহূর্তে যাকে হারিয়েছিলাম।
.
কৌতূহলে দগ্ধ হচ্ছিলাম ঠিকই, কিন্তু শেষ তিনটে পরিচ্ছদ তখনই পড়ে ফেললাম না। ইচ্ছার বিরুদ্ধেই বইটা বন্ধ করে মাথার পাশের টেবিল ল্যাম্পটা নিভিয়ে দিলাম। আর তারপর পরের দিন সন্ধ্যায় গুটিগুটি রওনা হলাম ১৪ নম্বর বাড়ির দিকে।
অন্ধকার কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলাম রেচেলদের ফ্ল্যাটে। কড়া নাড়তে নাড়তে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম, শেষে যখন মহিলার দাই রুক্মিণী এসে দরজা খুলল—কী চাই? বললাম, রেচেল মেমসাহেবের সঙ্গে একটু কথা আছে। রুক্মিণী বলল, উনকা হালাত খারাব হ্যায়। কুছ নহি বোল পায়েগি।
বললাম, একটু দেখতে পারি ওকে? রুক্মিণী সন্দেহের চোখে অনেকক্ষণ দেখল আমাকে, তারপর ছোট্ট করে বলল, আও। অন্ধকার করিডর দিয়ে যেতে যেতে জিজ্ঞেস করলাম, সঞ্জীব খুব আসে, তাই না? অন্ধকারে তো মুখ দেখতে পেলাম না। তবু কথার ভঙ্গিতে মনে হল ওর ভুরুজোড়া কপালে ঠেকে গেছে—কৌন সঞ্জীব!
আমি আর কথা বাড়ালাম না, মানে মানে গিয়ে দাঁড়ালাম বাড়ির পিছন দিককার বারান্দায়, যেখানে একমনে তারার আকাশের দিকে চেয়ে বসে আছে রেচেল। রুক্মিণী মেমসাব! বলে ডাকতে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল, আর ওর পাশে আমাকে দেখে এক অদ্ভুত চাহনিতে চেয়ে রইল বহুক্ষণ।
আর ওই চাহনিতেই আমি আমার সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেলাম। জানলাম, সঞ্জীব কখনো কোনোদিন ওর সঙ্গে একটি বাক্যও বিনিময় করেনি, ওর সব গল্পই মনগড়া। না হলে এই চাহনির কথা ও বলতই। জানলাম, রেচল টম ফিলপটের রক্ষিতা নয়, কুড়ি বছর আগে জঙ্গলে কুড়িয়ে পাওয়া শিশুটিই ও। জানলাম রেচেলের পাগলামি রাঁচির পাগলা গারদের পাগলের পাগলামি নয়। ওর মধ্যে একটা জঙ্গলের প্রাণী আর একটা শহরের প্রাণী পাশাপাশি বসবাস করে। আর এই সবকিছু জানিয়ে দিল একজোড়া চোখ আর তাদের চাহনি।
রেচেলের তাকানোর মধ্যে একটা বাঘিনির চাহনি দেখলাম। কিন্তু সে চাহনিতে হিংস্রতা নেই, বিপন্নতা আছে। মনে পড়ল, ফিলপটের আত্মজীবনীতে গুলিবিদ্ধ বাঘিনি তিরখি-র শেষ চাহনির কথা। ফিলপটের মনে হয়েছিল, ওই চোখ দুটো যেন চোখ নয়, সরোবর। যেখানে তিরখি-র হৃদয় ডুবে আছে। আমি আস্তে করে ডাকলাম, রেচেল! রেচেল কিন্তু সেই একইভাবে তাকিয়ে রইল। দেখলাম, ওই বাঘিনি-চাহনির বিপন্নতা কেটে একটু একটু করে হিংস্রতা ফুটে বেরচ্ছে। অনেকক্ষণ দেখে ফের ডাকলাম, রেচেল! আর অমনি বাঘিনির মতোই যেন থাবা বিস্তার করে উঠে দাঁড়ল রেচেল, আর গর্জন করল, গেট আউট! অর আই’ল কিল ইউ!
রেচেল দ্রুতপায়ে এগিয়ে আসছিল আমাদের দিকে। রুক্মিণী ভয়ে কাঁদতে কাঁদতে বসে পড়ল। আর আমি অন্ধকার করিডর দিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটলাম সিঁড়ির দিকে। ছিটকিনি নামিয়ে ফ্ল্যাটের দরজা খুলছি আর ভাবছি, এই এসে পড়ল বুঝি পিঠে ওর নখ; কিন্তু না কানে ভেসে এল রুক্মিণীর কান্না আর রেচেলের কিল চড়ের আওয়াজ। হঠাৎ মনে হল, দাইকে এভাবে বিপদে ফেলে চলে যাওয়া ঠিক না। দুরুদুরু বুকে ফের অন্ধকার করিডর পেরিয়ে ফিরে গেলাম বারান্দায়।
কিন্তু, ওরই মধ্যে সব ফের শান্ত। মাটিতে উবু হয়ে বসে রুক্মিণী আঁচলে চোখ মুচছে, আর ওকে জড়িয়ে ধরে গালে গাল ঘষে আদর করে যাচ্ছে রেচেল। আদরের ধরনটা মানুষের নয়, জঙ্গলের জীবের। আমি দু-দন্ড দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখে ফের নিঃশব্দে বেরিয়ে এলাম ১৪ নম্বর বাড়ি থেকে।
ওই রাতে আমি ফিলপটের বইয়ের শেষ তিন পরিচ্ছেদ শেষ করলাম খাওয়া-দাওয়ার পর বিছানার মাথায় টেবিল ল্যাম্পের আলোয়। কেন যে আমি এই পরিচ্ছেদগুলো আগের রাতে তুলে রেখেছিলাম, ঈশ্বর জানেন। পরের দিন পড়া শুরু করেই টের পেলাম যে বইয়ের পূর্বের অংশের সঙ্গে আমূল তফাত এই শেষ তিন পরিচ্ছেদের। পূর্বের দিকের সেই প্রতিভাবান, কিছুটা আত্মম্ভরী মানুষটা যেন নিমেষে উধাও হল। সে-জায়গায় এক করুণ, বিপন্ন মানুষ ফুটে উঠতে শুরু করল। জঙ্গলের পত্রপল্লবের বিস্তারে যেন একটু হারিয়ে যেতে থাকল দিনের সূর্য। শেষ পরিচ্ছেদে তো রীতিমতো ধ্বনিত হচ্ছে কান্না। আমি কীরকম আটকে গেলাম একটি বাক্যে—দীর্ঘদিন নিজের সঙ্গে তর্ক করার পর একদিন লিখেই দিলাম লণ্ডনে স্ত্রী এস্থারকে, ডার্লিং, অবসর জীবনটুকু ফের লণ্ডনে কাটানোর স্বপ্নটা বোধ হয় বাতিল হয়ে গেল।
নিঃসন্তান ফিলপট দম্পতির স্বপ্ন ছিল অবসর জীবনের সন্ধ্যেগুলো ওরিয়েন্টাল ক্লাবে কাটানোর। ফিলপটের আত্মজীবনীতে আর কোনো স্ত্রীর উল্লেখ না দেখে বুঝলাম ওর তিন তিনটে বিয়ের কাহিনিও সঞ্জীবের উর্বর মস্তিষ্কপ্রসূত। বইটা পড়তে পড়তে বহুবার রাগে জ্বলে উঠেছি সঞ্জীবের উপর। পরে নিজেকে শান্ত করেছি এই ভেবে যে, রেচেলকে নিয়ে উদ্ভট কল্পনার জাল বোনা আমাদের পাড়ার প্রসিদ্ধ কালচার। ফিলপটকে মাঝে মাঝে দূর থেকে এক-আধ ঝলক দেখলেও পাড়ার কেউই সম্ভবত কথা কয়নি ওর সঙ্গে। আর রেচেল? চিড়িয়াখানায় দূর থেকে খাঁচার বাঘ দেখার মতোই সম্ভবত সবাই দূরের জানলা থেকে দেখেছে ওকে। যেমন, আমি দেখেছি সাতবাড়ি দূর থেকে, ছাদের নির্জনতা থেকে। তাতেই বুঝতাম মেম বড়ো সুন্দর, কিন্তু ওভাবে কখনো ওর বাঘিনি চাহনির সামান্য আঁচও পাইনি।
