আমি আতঙ্কে, ঈর্ষায় আর্তনাদ করে উঠেছিলাম, রেচেল! সঞ্জীবও আমার প্রতিক্রিয়া দেখে হকচকিয়ে গিয়েছিল। বলল, অত এক্সাইটেড হওয়ার কী হল? যেন ভূত দেখলি!
আমি যথাসম্ভব নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম, কিন্তু রেচেল তো পাগলি, ও তোকে এতসব বলে কী করে? আর বলেই বা কেন?
সঞ্জীব সবে প্রি-ইউনিভার্সিটি পড়া শুরু করেছে, ফলে টুকটাক সিগারেট ফোঁকাও ধরেছে। একটা কাঁচি ধরাতে ধরাতে বলল, কারণ আমি ওর প্রেমিক।
সঞ্জীব কথাটা বলেছিল খুব স্বাভাবিকভাবেই, কিন্তু তাতেও আমার বুকের ভিতরটা যেভাবে মুচড়ে উঠেছিল তা আজও আমি ভুলতে পারিনি। মনে মনে ভাবলাম, ওয়ার্ল্ড ফেমাস টম ফিলপটের মিস্ট্রেসের প্রেমিক একটা চ্যাংড়া ছোকড়া! ছি! ছি! ছি!
মুখে বললাম। তুই কি রেচেলকে ভালোবাসিস?
সঞ্জীব ওর দু-হাত প্রার্থনার ভঙ্গিতে জড়ো করে শাম্মি কাপুর স্টাইলে চোখ বুজে আদুরে গলায় বলল, খু-উ-ব! এরপর আমি আর কথা বাড়াইনি, পরীক্ষার পড়া আছে বলে চুপকি দিয়ে বাড়ি চলে এসেছিলাম।
আর, এর ক-দিন বাদে ওয়েলিংটন স্কোয়ারের পুরোনো বইয়ের দোকানে রহস্য রোমাঞ্চের বই ঘাঁটতে ঘাঁটতে হঠাৎ করে হাতে উঠে এল এক পুরোনো, শ-দুয়েক পাতার পেপারব্যাক, যার ময়লা প্রচ্ছদটার দিকে আমি চেয়ে রইলাম কতক্ষণ কে জানে। চটকা ভাঙল প্রৌঢ় দোকানির টিপ্পনীতে, ভাই, হয় এটা নিন, নয় ছাড়ুন। অতক্ষণ ধরে কভার দেখলে হয়?
আমি বিব্রত স্বরে বললাম, না, এটা নেব ভাবছি। কত পড়বে?
দিন, পাঁচসিকে। সন্ধ্যের মুখে এয়েচেন।
আমি সাততাড়াতাড়ি দাম চুকিয়ে বইটা নিয়ে বাড়িমুখো হলাম। আর চলতে চলতে কেবলই প্রচ্ছদটা দেখছি। টাইটেলে লেখা ‘আ লাইফ ইন দ্য জাঙ্গলস’ আর লেখকের নামের জায়গায়? টম ফিলপট! প্রচ্ছদচিত্রে মরা বাঘের গায়ে পা রেখে মাথায় শোলার টুপি, পরনে খাকি শর্টসের সঙ্গে খাকি হাফশার্ট আর হাতে রাইফেল-ধরা তরুণবয়সি টম ফিলপট। আমি উত্তেজনার বশে বারবার প্রচ্ছদটাই দেখছি, অসম্ভব কৌতূহলে ঝলসে গিয়েও ভিতরের পাতায় যেতে পারছি না। জোরকদমে হাঁটতে হাঁটতে একসময় মনে হল বইটা যেন ক্রমশ ওজনে ভারী হচ্ছে, আর উষ্ণ হয়ে উঠেছে। বই নয়, আমার হাতে আলতো করে ধরা যেন এক ব্যাঘ্ৰশিশু!
একরাতে একটা গোটা ইংরেজি বই পড়ার অভিজ্ঞতা সেই প্রথম। ঘোরের মধ্যে পড়ছি যখন, আমার জীবন কাটছে জঙ্গলে। শেষে নিঃশ্বাস বন্ধ করে বসে রইলাম শেষের দিকের একটা পরিচ্ছেদ শেষ করে। আমার সমস্ত গায়ে কাঁটা, আর দেওয়াল ঘড়িতে কাঁটায় কাঁটায় সাড়ে তিনটে। আমি সেই পরিচ্ছেদের একটা জায়গা থেকে পড়তে শুরু করলাম:।
গোরুমারা জঙ্গলের উপকণ্ঠে কিছুদিন ধরেই প্রবল উত্তেজনা। একটা রয়্যাল বেঙ্গল বাঘিনি মাঝেমধ্যেই লোকালয়ে ঢুকে পড়ে ত্রাসের কারণ হচ্ছে। কীসের সন্ধানে সে যে গ্রামে ঢোকে। তাও একটা রহস্য। কারণ, মানুষ দূরে থাক, গোরু-ছাগল-শুয়োরের উপরও তার থাবা পড়েনি। সে নিঃশব্দ চরণে এসে নিঃশব্দে প্রস্থান করে। তাকে দূর থেকে দেখে অবশ্য বেশ কিছু নারী-পুরুষ মূৰ্ছা গেছে।
দার্জিলিং-এর প্ল্যান্টার্স ক্লাবে এই তথ্যগুলো দিয়ে ডিএসপি পুরুষোত্তম পাঠক বললেন, এখন আপনাকে মাঠে নামতেই হচ্ছে, মিস্টার ফিলপট।
আমি ব্যাপারটা ঘাঁটাতে চাইছিলাম না, তাই বললাম, আমার বন্দুক পাঁচ বছর ঘুমোচ্ছে। ওকে জাগানোটা কি ভালো হবে?
পাঠক বললেন, সবাই মৃত্যুর গন্ধ পাচ্ছে দিসুরিয়া গ্রামে। পরে হয়তো আপশোস করতে হবে।
বললাম, বাঘিনি কিন্তু এখনো ম্যানইটার নয়। ওর হয়তো অন্য সমস্যা আছে।
পাঠক উত্তর দিলেন, সেই সমস্যাও তো আপনিই তদন্ত করতে পারেন। অন্য কারও উপর তো ভরসা নেই আমার।
আজও মনে পড়ে বাঘিনির সেই ব্যথিত চাহনি। গুলিটা লাগার পর যে মস্ত লাফটা আশঙ্কা করেছিলাম, কোথায় সেই লাফ! বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো একবার শুধু ঘুরে দেখে সবুজের মধ্যে হারিয়ে গেল ও। আমি অবাক হয়ে গেলাম পাঁচ বছর শিকারে এসে এত সহজে অমার এত অব্যর্থ নিশানায়। বাঘিনির ওই করুণ চাহনি থেকে আমি জেনে গিয়েছিলাম এর চোখের আলো নিভে আসছে।
আমরা শেষ অবধি বাঘিনিকে মৃত অবস্থায় পাই এক গুহার সামনে। আর ওর গায়ে ঠেসান দিয়ে বসে অঝোরে কেঁদে চলেছে অপরূপ সুন্দরী এক মানবশিশু। আমার যখন বাঘিনির পাশে এসে দাঁড়িয়েছি, দেড়-দু বছরের মেয়েটি সমানে চেষ্টা করে যাচ্ছে তাকে ঘুম থেকে জাগাতে। আমার হাত থেকে রাইফেল খসে পড়ল, সে রাইফেল আমি আর মাটি থেকে ওঠাইনি। চোখের সামনে ভাসছে শুধু ‘পিয়েতা’-র দৃশ্য, মা মেরি-র কোলে মৃত যিশু। এখানে শুধু মা মেরিই মৃতা, তার কোল চাইছে শিশু।
বাঘিনির লোকালয়ে যাওয়ার রহস্য এবার ভাঙল। মানুষের বাচ্চার উপযোগী খাদ্যের সন্ধানে ওর দিসুরিয়ায় ঢু মারার ঘটনাগুলো হঠাৎ অলৌকিক ঠেকল। আমি বহুক্ষণ বাঘিনির মাথায় হাত বুলিয়ে শেষে বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নিয়ে চলে এলাম।
কিন্তু দার্জিলিং ফিরলাম না, কালিম্পং-এ আমার বন্ধু সিস্টার পার্টনের কাছে শিশুটিকে রেখে বললাম, এর বাপ কে, মা কে কিস্যু জানি না। এখন থেকে তুমিই এর বাবা, তুমিই এর মা। খরচ যা জোগানোর আমিই জোগাব। তুমি কিন্তু এর জগৎ সংসার।
সিস্টার পার্টন জিজ্ঞাসা করল, কিন্তু আপনি একে পেলেন কোত্থেকে?
