—তাহলে এগুলো কি?
—বলে একগুচ্ছ চিঠি অমলের সামনে ছড়িয়ে দিল বউদি। অমল বিস্ফারিত চোখে দেখল সত্যিই এক রাশ চিঠি, সব বৃন্দাদির হাতের লেখায়। বউদি বলল, অবশ্য এসব বিয়ের আগে লেখা।
অমল বলল, তাহলে?
—তাহলে এই চিঠিটা পড়ো… অমল চিঠিটা নিয়ে পড়তে শুরু করল, এই ভালোবাসা তোমায় কেউ দেবে না জেনো। কেউ দিলে আমি গায়ে আগুন দিয়ে মরব। অমল আর পড়তে পারছে না। কিছু বুঝতে পারছে না। ফ্যালফ্যাল করে খানিক চেয়ে থেকে বলল, এসব আজেবাজে কথা সবাই লিখতে পারে, তাতে কি কেউ বিশ্বাস করে?
বউদি বলল, তোমার বোকা বুদ্ধ দাদাটা করে। ও ভাবে যা লেখা যায় তাই করা যায়।
—আর তুমি?
—আমি আর এক বুদ্ধ। ভেবেছিলাম গায়ে একটু আগুন ছুঁইয়ে চমকে দেব দাদাকে। কিন্তু ও দেরি করল বাথরুম থেকে বেরোতে। আমি ভাবতেও পারিনি শাড়িতে আগুন এত তাড়াতাড়ি ছড়ায়। ওকে শিক্ষা দিতে আমি…।
—আর দাদা তোমায় বাঁচাতে পারল না, বউদি? বউদির মুখ যেন পাথর হয়ে এল, ও বাথরুম থেকে সমানে হাসছিল আমি যখন ‘আগুন আগুন’ করে চেঁচালাম। ভাবছিল আমি ইয়ার্কি করছি। কিংবা ভাবছিল আমি বৃন্দার ঢং ধরেছি। ও দরজা খুলে যখন প্রথমে দেখল আমায় ও তখনও বোঝেনি কী দেখছি। আর
তখনই আমার বাঁচার সব ইচ্ছে চলে গেল।
-কেন?
–বুঝলাম ও কেবল বৃন্দাকে শিক্ষা দেবে বলে আমায় বিয়ে করেছিল। ভালোবাসেনি।
—আর তুমি?
—আমি? আমি বিয়ের পর প্রতিদিন বুঝেছি ও বৃন্দার শূন্যস্থানে আমাকে বসিয়েছে। এত ভালোবাসা ও কখনোই আমাকে বাসতে পারে না। ও চিনত আমায় কতটুকু?
-তাই বলে তুমি গায়ে আগুন দেবে?
-কে বলেছে আমি আমার গায়ে আগুন দিয়েছি? আমি বৃন্দার প্রক্সির গায়ে আগুন দিয়েছি। আসল আমিটা তো এই তোমার সামনে বসে।
হঠাৎ নীচে থেকে মেজদির ডাক, অমু, অমু। এক্ষুণি নীচে আয়।
অমল বউদিকে বলল, তুমি দু-মিনিট বসো। আমি ঘুরে আসছি।
অমলকে দেখেই মেজদি ভেউ ভেউ করে কেঁদে উঠল-বউদি নেই রে অমু। মর্গে নেবার আগে একবার দেখবি চল।
কী হল ভগবানই জানেন, অমলের কিছুতেই আর কান্না পাচ্ছে না। পকেটে হাত দিয়ে দেখল চিঠিটা ঠিকই আছে। দিতে হবে দাদাকে। দাদার বিয়ের পর বৃন্দাদির প্রথম চিঠি। বউদি কিছুই বোঝেনি।
বাঘিনি
আজ সকালে কাগজে ছোট্ট একটা খবর পড়ে মনটা বড্ড দমে আছে। শহরের কয়েকটা বাড়িকে শনাক্ত করা হয়েছে বিপজ্জনক বলে। খুব শিগগির সেগুলো ভেঙে ফেলবে কর্পোরেশন। এমন খবরে আমার দমে যাওয়ার কোনো কারণ থাকতে পারে না। দমে গেলাম বিশেষ একটা বাক্যে, যেখানে বলছে, ভাঙার জন্য শনাক্ত করা বাড়িগুলোর মধ্যে ১৪ নম্বর মিন্টো রোর ক্লাসিক্যাল স্থাপত্যের বাড়িটিও, যেখানে এককালে বাস করেছিল আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নর্তকী লাশিয়াস লোলা যার আসল নাম লোরেন সুইন্টন, যেখানে তাঁর কৈশোরে প্রায়শ আসতেন পরবর্তীকালে হলিউডের বিশ্রুত নায়িকা মার্ল ওবেরন, আর যে বাড়িতে মাথায় গুলি করে আত্মহত্যা করেছিলেন বিখ্যাত ব্যাঘ্ৰ শিকারি টম ফিলপট।
খবরটা পড়ার পর কিছুক্ষণ শ্বাস চেয়ে বসেছিলাম। মনে পড়ছিল বাল্যের সেইসব দিন, যখন সন্ধ্যে নামলে কাতর দৃষ্টিতে চেয়ে থাকতাম ওই বাড়ির ছাদের দিকে, ভূত দেখব বলে। পাড়ার লোকের মুখেই শুনতাম সন্ধ্যেকালে ১৪ নম্বরের ছাদে ভূত নামে। দূর দূর থেকে আগুনের গোলা দেখা যায়, দৌড়োচ্ছে ছাদের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে। আশপাশ থেকে শোনা যায় কান্না কি গোঙানির শব্দ। কথা নেই, বার্তা নেই, ছাদ থেকে রাস্তায় নেমে আসে গলায় ফাঁস দেওয়ার দড়ি। পথ চলতে যে তা দেখে, তারই নাকি সাধ হয় ওই ফাঁসের গেরো গলায় পরার। রঞ্জু পোপা নাকি গাঁজায় চুর হয়ে একবার গলায় গলিয়েও ফেলেছিল ওই ফাঁস; তারপর হঠাৎ সংবিৎ ফিরে পেয়ে সে কী কান্না ওর। ও দিকে সামনে হ্যাঁচকা টান শূন্য থেকে। কেউ যেন ছাদ থেকে টান মেরে জমি থেকে উপড়ে নিচ্ছে দশাসই মানুষটাকে।
মনে পড়ল পাগলি রেচেল পার্টনকে, যাকে ভালোবাসতেন শিকারি ফিলপট। ফিলপটেরই উপহার করা বাঘছালে মোড়া আর্মচেয়ারে বসে সারাক্ষণ বিড়বিড়, বিড়বিড় করত রেচেল। যখন স্কুলের উঁচু ক্লাসে পড়ি, টের পেলাম মহিলা ফিলপটের মিস্ট্রেস। শোনামাত্র জিব কেটেছিলাম—সে কী, অতবড়ো শিকারি শেষে একটা পাগলির পাল্লায় পড়ল! তখন বন্ধু সঞ্জীব খেকিয়ে উঠল, পাগলি তো কী হয়েছে? মেয়েটার কী চেহারা দেখেছিস কখনো? তোর ওই সুচিত্রা সেন-ফেন ঘেঁষতে পারবে না। সাক্ষাৎ সোফিয়া লোরেন। অগত্যা আমতা
আমতা করে বললাম, তা হলে ও-ই বা বুড়ো ফিলপটকে বাছল কেন?
সঞ্জীব বলল, টাকা। আবার কী?
বললাম, ও তো পাগলি, ওর কি টাকার ভাবনা আছে?
সঞ্জীব ফুঁসে উঠল, নেই আবার! ওর গায়ের গয়নাগুলো দেখেছিস কখনো? হিরে বসানো সব ওই ফিলপটের দেওয়া।
জিজ্ঞেস করলাম, ফিলপটের বউ নেই?
সঞ্জীব বলল, একটা নয়, তিন-তিনটে। একটা লণ্ডনে, একটা আলমোড়ায়, আরেকটা মৃত। রেচেল রক্ষিতা মাত্র, তবে ওকেই নাকি সাহেব সবচেয়ে ভালোবেসেছেন জীবনে।
আমি একেবারে তাজ্জব হয়ে গেছি। বললাম, তুই এতসব জানলি কোত্থেকে?
অনেকক্ষণ নীরবে রহস্যের হাসি হাসল সঞ্জীব। শেষে আমার কৌতূহলের বাঁধ যখন ভেঙে পড়ল বলে, ও আস্তে আস্তে বলল, কে আর বলবে? রেচেলই বলেছে।
