বৃন্দাদির এই চিঠি কত চেনা অমলের। ঘণ্টার পায়ে চিঠি এলে ওই তো আগে একদফা পড়ে নিত। তারপর ঠিকঠাক করে বেঁধে রাখত যথাস্থানে। আজ কিন্তু চিঠিটা পকেটে পুরল ও। বুকে একটা দুপদুপানি শুরু হয়েছে। মাথার মধ্যে খেলছে একবার বউদির মুখ একবার বৃন্দাদির। কী যে সমস্যায় ফেলল দাদাটি।
আর প্ল্যানচেটে বসতে পারছে না অমল। ও কাগজপত্র জায়গামতো রেখে হাতে মুড়ি নিয়ে নেমে এল চিলেকোঠা থেকে। গলি দিয়ে যেতে যেতে জানলার ফাঁক দিয়ে দাদার ঘরে উঁকি মারল। দাদা-বউদির বিয়ের ছবি কোলে নিয়ে বাবার মতো বসে আছে।
নির্মল এখনও একটা সামান্য আঁচ পেল না কুন্তলা এটা করতে গেল কেন। বড়োলোক মা বাবার গঞ্জনা তো বিয়ের দিন থেকে লেগে ছিল। শ্বশুরবাড়িতে একটি কটু কথাও শুনতে হয়নি। যা শোনার সবতো নির্মলই শোনে। মা তো বউমাকে না খাইয়ে একবেলাও খায়নি কখনো। পৃথা স্বাতীর পছন্দ বৃন্দাকে, কিন্তু ওরাও তো সেটা বউদিকে জানতে দেওয়ার পাত্রী নয়। শ্বশুরের পয়সায় ব্যাবসা করব না, এই অহংকার যদি থেকেই থাকে নির্মলের তাতে কুন্তলার তো গর্ব হওয়ারই কথা। যেটুকু যা সন্দেহ ছিল বৃন্দার ব্যাপারে তাও নিতান্তই সন্দেহ। আর সন্দেহ যদি থেকেও থাকে তার সমাধান গায়ে আগুন!
ভেতরে ভেতরে শিউরে উঠল নির্মল। মনে পড়ল গতকাল বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসে দেখা ওই দৃশ্য। অগ্নিপরীক্ষার সীতার মতো আগুনে ঘেরা কুন্তলা। কী যেন বলতে চাইল ওর কোলে আছড়ে পড়তে পড়তে। ও কী বলতে চেয়েছিল, আমি মরতে চাইনি লক্ষ্মীটি? না হলে ওভাবে বার বার মাথা দোলাল কেন? ও কি বলতে চেয়েছিল, আমি বাঁচতে চাই না লক্ষ্মীটি? তাই বা কী করে হয়। নিজেই আগুন আগুন বলে চেঁচাল কেন? কেন ঝাঁপ দিয়ে এল নির্মলের বুকে? কেন পেঁয়াজের খোসার মতো ছাড়াচ্ছিল শরীর থেকে শাড়ি? কেন পড়ে যাওয়ার আগে দু-হাতে চেপে ধরল নির্মলের হাত।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে সন্ধ্যে হতে চলেছে। সবাই গেছে হাসপাতালে। বাড়িতে শুধু মা আর অমল। অমল গুটি গুটি হাটা দিল পাশের রাস্তায় বৃন্দাদের বাড়ির দিকে। বাড়ির বাগানে দোলনায় মুখ নীচু করে বসেছিল বৃন্দা। অমল পাশে গিয়ে আস্তে করে ডাকল, বৃন্দাদি।
চমকে যেন চটকা ভাঙল বৃন্দার।—এ কী তুমি, অমু! বউদি কেমন আছে? অমলের মুখ দিয়ে কথা সরল না। চোখ দিয়ে টপটপ করে জল গড়াতে লাগল। বৃন্দা ঝট করে ওর মাথাটা বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে কেঁদে উঠল, অমু এ কী হল আমাদের? আমাদের সব সুখ নষ্ট হয়ে গেল।
বৃন্দা কাঁদছে, ওর বুকের মধ্যে মাথা রেখে অমলও কাঁদছে। দু-জনেই কত কথা বলছে। কাঁদতে কাঁদতে, কিন্তু কেউ কারোরটা শুনতে পাচ্ছে না। অথচ নিয়ম করে বাগানে সন্ধ্যে নামছে।
শেষে মাথা সরিয়ে নিয়ে এসে অমল বলল, তুমি দাদাকে চিঠি লিখলে কেন, বৃন্দাদি?
কেন অমু? জানতে হবে না কেন, কী হল?
হঠাৎ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে অমল বলল, তোমার জন্যই তো। তোমাকেই তো দাদা ভালোবাসে। তাই তো…
বৃন্দা উৎকণ্ঠার সঙ্গে হাত দিয়ে মুখ চাপা দিল অমলের, ছিঃ। অমন কথা বলতে নেই অমু। কুন্তলা তোমার বউদি, দাদা তাকেই ভালোবাসে। আমার সঙ্গে দাদার তো আর কিছু নেই, কিছু নেই
কথা শেষ করতে পারল না বৃন্দা। বিকট কান্নায় ভেঙে পড়ে দোলনা থেকে খসে পড়ল মাটিতে। অমল, বৃন্দাদি কেঁদো না, বৃন্দাদি কেঁদো না, বলে জড়িয়ে ধরল ওকে। বৃন্দা ওর হাত ছাড়িয়ে দিয়ে বলল, তুই চলে যা, অমু। তুই চলে যা—আমায় একলা থাকতে দে।
বাড়ি ফিরে ওর মনে হল শহরে বোধ হয় রায়ট বেঁধেছে। সব ঘর শুনশান, অন্ধকার। শুধু পুজোর ঘরে দোর ভেজিয়ে মা চোখ বুজে বসে। ঘরের চেহারা দেখেই মনে হচ্ছে হাসপাতালে বুঝি বা খারাপ কিছু ঘটে গেছে। অমল নিঃশব্দে ফের চিলেকোঠার ঘরে গিয়ে প্ল্যানচেট-এ বসল। একটু পর বাটি চলতে শুরু করলে জিজ্ঞেস করল, বউদি, তুমি এসেছ?
পিছন থেকে স্পষ্ট উত্তর এল, হ্যাঁ, এই তো আমি। অমল চকিতে মাথা ঘুরিয়ে দেখল দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকে এসেছে বউদি। লাল পাড়, বেগুনি রঙের শাড়ি। গায়ে অনেক গয়না। কপালে সিঁথিতে সিঁদুর, বউদি হাসছে।
অমল বলল, তুমি গায়ে আগুন দিলে বউদি? বউদি থামল। কোথায় দিলাম? লেগে গেল।
—ছাই লেগেছে। তুমি মরবে বলে দিয়েছ।
—কেউ কি মরতে চায়?
–কেন, তুমিই তো চাইলে?
–মোটেও নয়। তোমার দাদা আমায় ভালোবাসে না, তাই মরলাম।
–কে বলেছে তোমার দাদা ভালোবাসে না?
–তুমি জানো না।
–না, জানি না।
—তাহলে তুমি কিছুই জানো না। তোমার দাদা ভালোবাসে বৃন্দাকে।
—তোমায় বলেছে। বৃন্দাদি দাদাকে ভালোবাসে, দাদা তোমাকে।
বউদি কাঠের মেঝেতে গুছিয়ে বসে চুপ করে রইল। কিছুক্ষণ পর বলল, তোমার কি মনে। হয় আমি দাদাকে ভালোবাসতাম?
—ভালোবাসতাম কেন? এখন বাসো না?
থমথমে হয়ে গেল বউদির মুখটা। তারপর আস্তে আস্তে অমলের কাছে সরে এসে বলল, একটা কথা দাদাকে বলতে পারবে, অমু?
-কী কথা?
—যে, আমি ভীষণ ভালোবেসেছি ওকে।
—বলার দরকার নেই, দাদা জানে।
-তাহলেও বলো।
—তার আগে বলো, কেন গায়ে আগুন দিলে?
বউদি আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে বলল, পকেটে ওটা কার চিঠি?
অমল দৃপ্ত গলায় বলল, বৃন্দাদির।
—দেখলে তো, বিয়ের এত পরেও কত টান?
—বাজে কথা। বৃন্দাদির বিয়ের পর দাদাকে কখনো চিঠি দেয়নি। এই প্রথম। তুমি পড়ো।
