মৃন্ময়ীর মাথায় রক্ত চেপে গেল—আর তোরা ধেই ধেই করে হাসপাতাল চলে গেলি। দেখলি না বাচ্চাটা খেল কি খেল না?
স্বাতী পরিস্থিতি সামলে দিতে বলল, অমু তোমার বাচ্চা? ও চৌবাচ্চা। দেখোনি বউদির সঙ্গে কী গলায় গলায় পিরিত। দাদা তাও ঠিক আছে, উনি মুহ্যমান। যেন ওরই বউ গেল।
মা ধমকে উঠলেন, চুপ। যা তা বকিস না। বউমাকে তো ওকেই কেবল ভালোবাসতে দেখলাম। কষ্ট হবে না? পৃথা মার হাত ধরে বলল, তুমি ওঠো, চান করে নাও। দেখো আবার কে কখন তদন্তে আসে। উঠতে উঠতেও মৃন্ময়ী আবার ধপ করে বসে পড়লেন—সত্যি! কপালে কত দুঃখ যে আছে আমার। শেষে বউয়ের গায়ে আগুনও দেখতে হল! আমায় কেন তুলে নেন না ঠাকুর। মা ডুকরে কাঁদছে দেখে কথা ঘোরাতে পৃথা বলল, বউদির মা এক হাট। লোকের সামনে চিৎকার করে বলছিল আমরা নাকি পুড়িয়ে মেরেছি ওর সোনার প্রতিমাকে।
মৃন্ময়ী এবার কাপড়ের খুঁটে চোখ মুছতে মুছতে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, বিয়েও আমরা দিইনি, অযত্নও করিনি কোনোদিন। জলজ্যান্ত বাড়ির বউকে পুড়িয়ে মারতে যাব কোন দুঃখে? আর কী বলল?
পৃথা বলল, বাড়ির থাম দেখে বিয়ে করে বউদি মরল। থামের আড়ালে সব নাকি ঠন ঠন।
ব্যথায় নিভে এল মৃন্ময়ীর ধবধবে সাদা মুখের রং। কপালে এও শোনার ছিল হতভাগা নিমুর দোহাইয়ে। দাঁতে দাঁত চেপে বললেন, পিতু এসব রুচির ব্যাপার, শিক্ষার বিষয়। যা প্রাণে চায় বলুক। তোরা কিছু বলিসনি তো উত্তরে। সঙ্গে সঙ্গে স্বাতী বলে উঠল, আমরা? আমরা বলে পালিয়ে বাঁচি! বউদিকে তো একবার চোখের দেখাও দেখতে পেলাম না গতকাল থেকে।
মৃন্ময়ী একটু চুপ করে রইলেন। মেয়েরাও চুপ করে গেল। মৃন্ময়ী শাড়ির কোঁচড় থেকে একটা আধুলি বার করে পৃথার হাতে দিয়ে বললেন, বলাইয়ের দোকান থেকে চাট্টি মুড়ি কিনে দিয়ে আয় অমুকে। কিছু না খেয়ে পিত্তি পড়বে ছেলের।
পৃথা পয়সাটা নিতে নিতে বলল, কিন্তু বাবুটিকে পাব কোথায়? মৃন্ময়ী সংক্ষেপে উত্তর দিলেন, ছাদে। অমনি নাকি সুরে কেঁদে উঠল স্বাতী, কেন আমাদের খিদে পায় না বুঝি? যত খিদে তোমার ওই কোলের ছেলের! মৃন্ময়ী বললেন, তা খাবি তো খাস। আমি কি না করেছি। ছেলেটা তো কালকেও কিছু মুখে দেয়নি। আর ঝটিদাকে বলিস আলু, কপি দিয়ে
একটা তরকারি বানিয়ে রাখতে। মাছ করতে বারণ করিস।
স্বাতী মুড়ি কিনতে চলে গেলে মৃন্ময়ী পৃথাকে জিজ্ঞেস করলেন, নিমু কিছু বলল, বউমা এটা করতে গেল কেন? পৃথা জোরে জোরে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, দাদা তো কিছুই বুঝতে পারছে না। বলল আগের রাতেও বউদি দিব্যি আনন্দে ছিল। জানলে তো তোমার ওই ছোটোটাই জানবে, রাতদিন বউদির সঙ্গে গুজুর গুজুর, ফুসুর ফুসুর। কিন্তু সেই তো এখন ঘাপটি মেরে বসে আছে ছাদে।
-কেন, কী করছে?
–কী আবার? চোখের জল ফেলছে নয়তো, শরৎচন্দ্র পড়ছে।
–একটু দেখে আসবি?
—স্বাতী মুড়িটা আনুক, তারপর যাব।
পৃথা আর স্বাতী চিলেকোঠার বন্ধ দরজায় কান পেতে তাজ্জব বনে গেল। আপন মনে কী বকে যাচ্ছে অমু। শেষে বিরক্ত হয়ে জোরে জোরে ছিটকিনি নাড়ল। ভেতর থেকে অমুরও বিরক্ত গলা ভেসে এল, তোমরা যাও। আমি এখন নামব না। পৃথা আওয়াজ করে মুড়ির ঠোঙা দরজার গোড়ায় রেখে বলল, এই রইল মুড়ি। খাবার হলে খেয়ো, নয়তো গোল্লায় যাও। আমরা গেলাম।
মুড়ির নামে একটু খিদে খিদে ভাব হয়েছিল অমলের, ও আরেকটু সবুর করে দরজা খুলে মুড়ির ঠোঙাটি ঢুকিয়ে নেওয়ার তাল করল। আর তক্ষুণি ফতফত ফতফত করে ডানা ঝাপটে ঘরের মধ্যে ঢুকে এল গোলা পায়রা ঘণ্টা। অমল অবাক নেত্রে দেখল ঘণ্টার পায়ে সুতো দিয়ে আবার কী একটা বাঁধা। অমল ঘণ্টাকে দেওয়ালের সঙ্গে ঠেসে ধরে পায়ের কাগজটা খুলতে লাগল। তারপর একহাতে মুখে মুড়ি চুসতে চুসতে আর এক হাতে ধরে পড়তে লাগল ঘণ্টার পা থেকে খোলা কাগজটা।
কাগজটা চিঠি। দাদাকে লেখা পাশের রাস্তার সুন্দরী বৃন্দার। বৃন্দাদি মেজদি পৃথার সঙ্গে কনভেন্টে পড়ে। দারুণ স্মার্ট, পড়াশুনায় ভালো, দাদাকে ভারি পছন্দ ছিল। সবাই বলত দাদার সঙ্গে মানায় ভালো। বৃন্দাদিকে খুব মনে ধরেছিল অমলেরও। বাগড়া যা দেবার দিয়েছে। বৃন্দাদির বাবা, বলেছে, নিমুর সঙ্গে কী বিয়ে দেব মেয়ের। কিস্যু করে-টরে না। চেহারা আর বাড়ির থাম দেখে কি বিয়ে হয়। দাদা এসব শুনে রাগ করেই নাকি প্রেম করতে শুরু করে বউদির সঙ্গে। আর তারপর…
অমল পড়তে লাগল চিঠিটা—প্রিয়তম…কী যে অসুস্থ লাগছে। ভেবেছিলাম তোমাদের ওখানে যাব একবার। পরে ভাবলাম, কী দরকার অযথা কষ্ট বাড়িয়ে তোমার? অথচ কিছু একটা না লিখেও থাকতে পারছিলাম না। তুমি হয়তো গত আটমাস আমায় ভুলে গিয়ে থাকবে, কিন্তু তোমার ঘণ্টা এখনও আমায় ভোলেনি। রোজ সকালে একবার করে আসে এখানে। এখন অবিশ্যি ওর পায়ে তোমার লেখা কোনো চিঠি থাকে না। কত কতবার ইচ্ছে হয়েছে ওর পায়ে একটা চিঠি বেঁধে দিই। কিন্তু দিইনি, তোমার সুখের জীবনের আঁচড় কাটতে চাইনি, সামলে নিয়েছি নিজেকে।
কিন্তু আজ আর পারলাম না। কী হল কুন্তলার সত্যি করে বলো লক্ষ্মীটি। তোমার মতো কাউকে পেয়েও এত দুঃখ কেন? গায়ে আগুন দেওয়ার কথা তো ওর নয়। অন্য কারুর। কিন্তু সে তো দিব্যি আছে চিঠি লিখছে, বাবার দেখা পাত্রদের ফেরত পাঠাচ্ছে। পারলে চিঠি দিও, না দিলেও দোষ দেব না। ইতি তোমার…
