অভিজ্ঞানশকুন্তলমে।
সেদিনই মধ্যাহ্নে হাড়িকাঠে মাথা নোয়ালেন প্রিয়গুপ্ত দার্শনিক। শাঁখের আওয়াজ ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ওঁর সুন্দর মুখটা ধুলোয় গড়িয়ে পড়ল খঙ্গের কোপে। কবি কালিদাসের অমর অভিজ্ঞানশকুন্তলমও অক্ষয় রইল।
১৯৭৪ সালের ৩রা ডিসেম্বর পর্যন্ত আর কেউ কালিদাসের থেকেও ভালো করে শকুন্তলা লিখেছেন বলে খবর পাওয়া যায়নি।
প্ল্যানচেট
একটা মস্ত সাদা কাগজের মাঝখানে বাটি রেখে বৃত্ত আঁকা পেনসিলে। বৃত্তের ধার দিয়ে গোল করে লেখা এ বি সি ডি ই এফ জি এইচ…একস ওয়াই জেড। সেই বড়ো গোলের মধ্যিখানে একটা ছোট্ট বাটি ফেলে, তাতে তর্জনী ঠেকিয়ে, চোখ বুজে আপন মনে অমল ক্রমান্বয়ে প্রশ্ন করে চলেছে, বউদি, তুমি এসেছ? এলে ইয়েস লিখে বলো তুমি এসেছ।
শীতের সকালের মিঠে রোদ খেলছে সারাছাদে। চিলেকোঠার দরজা আঁট করে টানা। চারটে জানলার তিনটেই ভেজানো। শুধু একটা জানলা দিয়ে তেরছাভাবে পাতলা, জলের মতো রোদ এসে পড়ছে ফর্সা কাগজটার ওপর। কাঁসার বাটিটার গায়ে মাঝ মাঝে ঝিলিক। দিচ্ছে রোদ। পাড়ার রোয়াকে রোয়াকে মজলিশ। অমলদের ছড়ানো-বিছোনো ছাদটা নিস্তব্ধ, খাঁ খাঁ। চিলেকোঠার পায়রাগুলোও চরতে বেরিয়েছে, দূর থেকে একবার শুধু ফটিকের চিৎকার ভেসে এল–ভোকাট্টা-আ-আ-আ-আ
অমলের কিন্তু প্ল্যানচেটে ছেদ পড়ার কথা নয়। সে একমনে ডেকে যাচ্ছে, বউদি তুমি এসেছ? এসে থাকলে একবার ওয়াই, একবার ই, আর একবার এস-এ যাও। তাহলে বুঝব এসেছ।
একতলার নিজের ঘরে দোর এঁটে বসে নির্মল ভাবছে, কুন্তলা এটা করতে গেল কেন? আগের রাতেও যে গলা জড়িয়ে বলতে পারে তুমি ছাড়া আমার আর কেউ নেই বাপী, গালে ঠোঁট ঘষতে ঘষতে বার বার বলে আমার নিজের থেকেও তোমাকে ভালোবাসি বাপি, সে হঠাৎ করে সকালে চা দিতে দিতে কে বলে? অমলের খেয়াল রেখো, বাপী, তারপর অমল স্নান করতে গেলে দিব্যি শাড়িতে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে বসল। মরা কি এত সহজ জিনিস? জীবন, সংসার, ভালোবাসা—এসবের কোনো পিছুটান নেই? পায়ে ধরে কেউ কাউকে বাঁচিয়ে রাখে নাকি পৃথিবীতে? সবাই-ই তো নিজের টানে বাঁচে। নিজের নিজের জেদে মরে। তোমার হঠাৎ মরার জেদ হল কেন, কুন্তলা? আগের রাতের ভালোবাসাও হেরে গেল, এমন জেদ কোথায় লুকিয়ে ছিল তোমার? বিয়ের ছ-ছটা মাস পেরোল না, অথচ এভাবে লোক হাসিয়ে গেলে?
হাসপাতাল থেকে লজ্জায় মুখ ঢেকে পালিয়ে এসেছে পৃথা আর স্বাতী। পাড়ার ছেলে মেয়েরা ভিড় করে দেখতে গেছে আগুনে পোড়া সুন্দরী কুন্তলাকে। আগুনের মতো রং ছিল নতুন বউটার। এখন পুড়ে, ফোসকায় ফোসকায় মুখ ভরে, কালো কয়লা হয়ে শুয়ে আছে হাসপাতালের এমার্জেন্সি ওয়ার্ডে। পৃথা, স্বাতীকে দেখে, কী হল ব্যাপারটা? হঠাৎ এমন অ্যাক্সিডেন্ট? কী করে লাগল?—এইসব বুক জ্বালানো, অবান্তর প্রশ্ন নিয়ে ছুটে এল সবাই। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে ওরা কুন্তলার মার কান্না আর চিৎকার শুনেছে, আমার সোনার প্রতিমা এভাবে বিসর্জন হল শেষে? পই পই করে সেদিন বলেছিলাম, মামণি, ওই থামওলা বাড়ির ভেতরটা ঠন ঠন। সব গেছে দেনার দায়ে। আর কার্তিকঠাকুর চেহারা দেখে ভুললি। ও তোর নখের যোগ্য নয় মা। ছ-মাসও গেল না, জানোয়ারটা আমার মেয়েটাকে পুড়িয়ে মারলে!’
সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে বারান্দায় এই কান্না শুনে আর ওপরে ওঠার সাহস হয়নি দুই বোনের। কিছুক্ষণ থরথর করে কেঁপেছে সিঁড়ির এক কোণে, তারপর পায়ের চটি হাতে নিয়ে খালি পায়ে দুদ্দাড় করে ছুটে এসেছে বাড়ি।
কিন্তু ঠাকুরঘরে গিয়ে মাকে কিছু জানানো হয়নি। মা কালীর ফটোর সামনে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে মা। একটু আগে পুলিশ এসে জেরা করে গেছে। বউটাকে কেমন ঠেকত, মৃন্ময়ী দেবী? বরের সঙ্গে বনিবনার গরমিল দেখতেন কি? কোথায় ছিলেন ছেলে যখন আগুন আগুন করে চেঁচাল, বউ কি আপনাদের পছন্দের ছিল? নাকের হীরেটা তো আপনারই দেওয়া তাই না? সম্মান-টম্মান কি করত বউ? অসবর্ণ বিয়ে বলে, লাভ ম্যারেজ বলে খেদ ছিল না আপনার?—একটা ঘোরের মাথায় হ্যাঁ না বলে কোনোক্রমে উত্তর করে গেছেন মৃন্ময়ী। ভেতরে ভেতরে লজ্জার আগুনে দগ্ধ হচ্ছিলেন। এ বাড়ির ফরাসে বসে এমন প্রশ্ন কেউ কোনোদিন করতে পারেনি তাকে। কুন্তলার গায়ের আগুন এখন মৃন্ময়ীর সারাশরীরে মনে। কথা শেষ করে ঠাকুরঘরে ঢুকতেই পুরোনো ফিটের রোগটা ফিরে এল সাত বছর পরে।
কাছেপিঠে অমলও নেই যে নাকে ন্যাকড়া পোড়া ধরে জ্ঞান ফেরাবে। ছাদের ঘরে অমলের আঙুলের ডগায় এখন বাঁই বাঁই করে ঘুরছে পেতলের বাটি। একবার ওয়াই একবার ই একবার এস, অর্থাৎ বউদি এসেছে। অমল বলল, বউদি তুমি এসেছ? বাটি ঘুরে ঘুরে ইয়েস লিখল। অমল জিজ্ঞেস করল, তুমি গায়ে আগুন দিলে কেন? বাটি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল এক জায়গায়। অমল ভাবল বউদি ভাবছে কেন? উৎকণ্ঠার সঙ্গে অমল বাটিতে ঠেকিয়ে, চোখ বুজে বসে রইল সকালের রোদে চিলেকোঠার অন্ধকারে।
মায়ের সংবিত ফিরল পৃথা যখন সলতে পাকিয়ে কাপড় পোড়ার গন্ধ দিল নাকে। মৃন্ময়ী প্রথমে কথা বললেন, হ্যাঁ রে, ওরা কি নিমুকে ধরে নিয়ে গেল? পৃথা ঝাঁঝ করে বলল, কেন? দাদা কী করেছেন? দাদা কি বউদির গায়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছেন নাকি? কথা নেই, বার্তা নেই, ধরে নিয়ে গেলেই হল? মৃন্ময়ী একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললেন, ওরা তো তাই করে। স্বাতী এসে শুয়ে থাকা মায়ের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে বলল, তুমি ওসব নিয়ে মাথা ঘামিও না তো বাপু। যা হবার হবে, তোমার ওই শরীরে কে কী করছে, বা করল ভেবে কাজ নেই। মৃন্ময়ীর সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ল অমলের কথা, জিজ্ঞেস করলেন, অমুটাও নিশ্চয়ই কিছু খায়নি সকাল থেকে। ও কোথায়? স্বাতী বলল, কাল রাতেও খেয়েছে কিনা ভগবান জানে। ঝটিদা বলল, ওর কালকের রাতের থালা যেমনকে তেমন পড়ে আছে।
