রাজা জানতে চাইলেন বিয়োগবেদনার অমোঘ কারিগর কালিদাস কেন এ ত্রুটি করলেন? প্রিয়গুপ্ত বললেন, সম্ভবত এইজন্যই যে পুণ্যদেবের খোঁজ কেউ রাখেনি। কালিদাস হয়তো জানতেন না কখনো কোথাও পুণ্যদেব বলে কেউ ছিলেন কি না। কিংবা এক নিষ্পাপ মুনিবালকের আত্মহত্যা তিনি সমাজের সামনে তুলে ধরতে চাননি।
রাজা জিজ্ঞেস করলেন, কিন্তু তুমি এসমস্ত জানলে কোত্থেকে? প্রচন্ড লোভ হওয়া সত্ত্বেও আত্মসংবরণ করলেন প্রিয়গুপ্ত। বললেন, আমাকে সময় দিন রাজা। আমি অভিজ্ঞানশকুন্তলম কালিদাসের চেয়েও সুন্দর করে লিখে পড়ে শোনাব আপনাকে। এবং সে-লেখার পর কালিদাসের ওই বাতুল নাটককে মানুষ ভুলেই যাবে।
রাজা বললেন, বেশ। আমার কন্যার বিয়ে সাত মাস পর। তুমি ওই বিবাহ-বাসরে তোমার নবলিখিত অভিজ্ঞানশকুন্তলম সভাসদদের পড়ে শোনাবে। কবি কালিদাসের থেকে তা শ্রেয় হলে সেদিনই তোমার মৃত্যুদন্ড প্রত্যাহৃত হবে, এবং তোমাকে সসম্মানে সভাকবি নির্বাচন করা হবে।
প্রবল হর্ষধ্বনির মধ্যে প্রিয়গুপ্ত বাড়ি ফিরলেন। ফিরেই প্রচন্ড ঘৃণায় কালিদাসের বইগুলিকে সবচেয়ে নিকটের পুকুরে ছুড়ে ফেললেন। নিজের লেখা শকুন্তলার টীকাগুলোও চুলোয় গুঁজে দিলেন। তারপর স্নান-আহ্নিক সেরে নতুন করে কালিদাসের নাটকটাকে লিখতে বসলেন।
লিখতে লিখতেই প্রিয়গুপ্ত টের পাচ্ছিলেন তাঁর হাত দিয়ে এত সুন্দর সংস্কৃত এর আগে কখনো বার হয়নি। এমন ঘোরের মাথায় লেখা বেরুচ্ছে যে লেখক টেরই পাচ্ছেন না তিনি কী লিখছেন। সম্ভবত অনুপ্রাণিত লেখা একেই বলে। যে লেখা কালিদাসের গুষ্টির কেউ কখনো চিন্তা করেনি।
লেখার মধ্যেই কাটাকাটি যা হবার হয়ে গেল। কোনো ত্রুটি প্রিয়গুপ্ত রাখবেন না স্থির করেছেন। পঞ্চম মাসে যখন নাটক শেষ হল অশেষ কৌতূহল ও উত্তেজনা সত্ত্বেও প্রিয়গুপ্ত লেখাটা নিজেকে পড়ে শোনালেন না। অধীর আগ্রহে বসে রইলেন রাজকন্যার বিয়ের দিনটির জন্য। মনে মনে বুঝতে পারছিলেন এ সংস্কৃত সাহিত্যের মুকুটমণি হয়ে থাকবে। একটু-আধটু করুণাও হল বেচারি কালিদাসের জন্য।
মেদিনীরাজ্যের সমস্ত সম্রান্ত শিক্ষিত পুরুষ-নারী জমায়েত হয়েছেন সভাকক্ষে। রাজার পাশেই রাজকন্যা দীর্ঘ ঘোমটা টেনে বসে। পাশে ককরাজ্যের যুবরাজ। তার মুখে হাসি। সভার প্রত্যেকটি মানুষ প্রফুল্ল বোধ করছেন। রাজা ডাক দিলেন, দার্শনিক। তারপরেই ভুল সংশোধন করে বললেন, কবি! এবার তোমার কাব্যনাট্য পড়ে শোনাও।
এই ক্ষণটির জন্যই কত আকাঙ্ক্ষায় দিন কাটিয়েছেন প্রিয়গুপ্ত! সভার প্রত্যেককে নমস্কার জানিয়ে পাঠ শুরু করলেন। বস্তুত এরকম পরিবেশে যা সবারই হয়ে থাকে প্রিয়গুপ্তেরও তাই হল। এমন অনুরাগ দিয়ে পড়তে লাগলেন প্রিয়গুপ্ত যে, নিজে কিছুই কানে শুনতে পেলেন না। কিংবা বলা চলে কানে শুনলেও মনে ছাপ বসল না। সভার সদস্যেরা কিন্তু একমনে সেই মন্ত্রোচ্চারণের মতন নাটকপাঠে ডুবে রইলেন।
যখন পাঠ শেষ হল, প্রিয়গুপ্ত তখনও এক আচ্ছন্নতায় মগ্ন। ঘোর ভাঙল রাজার চিৎকারে। পামর! ধূর্ত বেয়াদব! চালাকি পেয়েছে আমার সঙ্গে? ভেবেছ আমরা কেউ শকুন্তলা পড়িনি? তোমার রচনা বর্ণে বর্ণে, ছত্রে ছত্রে বিন্দুতে বিন্দুতে কালিদাসের শকুন্তলা। তাই বলি এত ভালো সংস্কৃত এই হতভাগা শিখল কবে। আর কোথায় তোমার পুণ্যদেব? তাঁর কথা তো নাটকের এক জায়গাতেও বিবৃত করোনি। কোথায় গেল তোমার সে আস্ফালন? আসলে তুমি সমস্তটাই স্বৰ্গত অমর কবির লেখা থেকে টুকেছ। তোমার মৃত্যু আজই। হ্যাঁ, বিবাহবাসরের আগেই তোমার অপসারণ আমরা চাই।
প্রিয়গুপ্তের কাছে সমস্ত ব্যাপারটাই খুব গোলমেলে ঠেকছিল। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে এসেছে। তিনি একটু জল চাইলেন। জল খেয়ে তাকালেন গুণিনের দিকে। গুণিন স্মিত হেসে একটা কালিদাসের শকুন্তলা দার্শনিকের হাতে তুলে দিলেন। পাতা ওলটাতেই লজ্জায় মরে গেলেন প্রিয়গুপ্ত। জিভ কাটলেন। চোখ ফেটে জল গড়াল! ভাবলেন, হে ঈশ্বর! এরকম স্মৃতি-বিভ্রম আমার ঘটল কী করে? সারাজীবন যে শকুন্তলা আমি পাঠ করে এসেছি সেই শকুন্তলাই আমি নতুন করে অজ্ঞানের মতো লিখলাম কী করে? এমনকী একটা বয়ানেরও হেরফের হল না কোথাও! ঈশ্বর, হে করুণাময় ঈশ্বর। এ কি সম্ভব? না এ স্বপ্ন? চোখ রগড়ালেন প্রিয়গুপ্ত। না সমস্তটাই তো বাস্তবের ব্যাপার। তাহলে … তাহলে … তাহলে… ওই পুণ্যদেব ওরফে প্রিয়গুপ্তই কি কালিদাস?
ফের স্মৃতির অতলে নামলেন প্রিয়গুপ্ত। না, ঠিক স্মৃতিও নয়। বলা চলে স্মৃতি-সত্তা ভবিষ্যত। আস্তে আস্তে কতকটা মানে খুঁজে পাচ্ছেন দার্শনিক। বুঝলেন শিল্পের শেষ বিচারে কোনো পুণ্যদেব ওরফে প্রিয়গুপ্ত ওরফে কালিদাসের দাম কিছু নেই। আসল দাম, তাঁরা তাঁদের নিজস্ব দুঃখকে যে শব্দের বিনিময়ে বেচলেন সেই ঝংকারে। পুণ্যদেবরা পুড়ে ভস্ম হলে কালিদাস হয়। তাঁদের ভস্ম-উপস্থিতি রচনায় থাকে না। তাঁদের ঠিকানা পন্ডিত টীকাকাররাও জানতে পারেন না।
কাজেই পুণ্যদেব আত্মহত্যা করলেন কি না, প্রিয়গুপ্ত হাড়িকাঠে মাথা গলালেন কি না, কালিদাস শেষ বয়সে স্মৃতি হারালেন কি না এ প্রশ্ন জগৎ তোলে না। জগজ্জন জানে এক অভিজ্ঞানশকুন্তলম লিখেছেন এমন এক মানুষ যিনি জীবন এবং কল্পনার দুই সমান্তরাল অগ্নিস্রোতের মধ্যে দিয়ে নিস্পৃষ্ট সীতার মতো হেঁটে-চলে বেড়ান। মৃত্যু নামে যে ক্ষয়, কিংবা জীবন নামে যে অপচয় এ দুয়েরই পরপারে তাঁরা। তাঁদের দুঃখ যত বাড়ে মানুষের কল্পনার আকাশে তত বেশি তারা ফোটে। এ মানুষগুলি তাঁদের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, গোপনীয়তা নিয়ে পাতার আড়ালে দাঁড়িয়ে শকুন্তলাদের বিদায় নিতে দেখেন। সমস্ত রাগ তাঁদের পড়ে গিয়ে ওই পামর দুষ্মন্তদের ওপর। সেই রাগ থেকেই ওই পামরগুলো অমরত্ব পায় এক একটা
