প্রিয়গুপ্ত বললেন, কিন্তু গুণিন, আমি যে নারীর চরিত্রমাধুর্যের পর্যালোচনা করি সে তো বাস্তবের কোনো লোক নয়। আমার মন-জুড়ে আছে কবি কালিদাসের শকুন্তলা। সে তো নিছক মানসী।
সামন্তসেন বললেন, বটে! তাহলে তুমি শকুন্তলাকেই চিন্তা করো। যেমনভাবে তুমি তাকে মনশ্চক্ষে দেখেছ।
প্রিয়গুপ্ত চোখ বুজলেন। অচিরেই শকুন্তলার চিন্তায় ডুবে গেলেন। সেই মগ্নমুহূর্তে চোখ দিয়ে দু-ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। কোনো একসময় রাজকুমারী রাগেশ্রীও সভার এক কোণে এসে দাঁড়িয়েছেন।
যখন ঘোর ভাঙল সভাসদদের, তাঁরা অপার বিস্ময়ে দেখলেন আয়নায় প্রতিফলিত নারীর রূপটি রাগেশ্রীরই। সবচেয়ে অবাক মানলেন প্রিয়গুপ্ত। এ কী! এ কন্যা তো শকুন্তলাই। অন্তত তাঁর স্বপ্নে ধরা শকুন্তলা।
কান্নায় ভেঙে পড়লেন দার্শনিক। নিজেকে বড়ো মূখ ঠেকল। একবারও যদি এই কন্যাকে তিনি কোথাও দেখে থাকতেন তাহলে তো এই বিভ্রাট হত না। না জেনে, নিয়তির অমোঘ নিয়মে, তিনি রাজকন্যাকেই শকুন্তলা সাজিয়ে এসেছেন মনে! হে ঈশ্বর! কী বিচিত্র সৃষ্টি এই মানবমন।
দেখতে দেখতে রাজা হুকুম দিলেন প্রিয়গুপ্তের প্রাণদন্ডের। প্রিয়গুপ্ত হতভম্ব হয়ে তা শুনলেন।
পরের দিন ভোরেই প্রিয়গুপ্তকে স্নান করিয়ে আনা হয়েছে হাড়িকাঠে। জল্লাদও উপস্থিত নিকটে। পুরোহিত আহ্নিক সেরে নিচ্ছেন। সমস্ত বধ্যভূমি গিজগিজ করছে দর্শকে। রাজা আছেন, গুণিন আছেন, কে নেই!
হাড়িকাঠে মাথা রেখেছেন প্রিয়গুপ্ত। জল্লাদ আস্তিন গোটাচ্ছে। অন্য একজন হাড়িকাঠের খিলটা পরিয়ে দিচ্ছে দার্শনিকের গলায়। এমন সময় রাজকুমারী রাগেশ্রী ঢুকলেন কম্বকরাজ্যের যুবরাজের সঙ্গে। এর সঙ্গেই অবশেষে ঠিক হয়েছে রাজকন্যার বিবাহ। দ্বারী সরবে কুমারের রাজ্যের নামটা ঘোষণা করতেই স্মৃতির কোথায় একটা খোঁচা খেলেন মুমূর্ষু প্রিয়গুপ্ত। তবু চেষ্টা করে চোখ মেলে দেখলেন কুমারকে। সত্তার অন্তঃস্থল থেকে কে যেন জানিয়ে দিল যুবরাজ হলেন কালিদাস কথিত দুষ্মন্ত।
ঝিমন্ত প্রিয়গুপ্ত আচমকা সজাগ হয়ে উঠলেন! তাঁর একটু বেশি বেশি মনে পড়তে লাগল সব কিছু! কিন্তু এ সমস্ত স্মৃতি জন্মের ওপার থেকেই যেন ভেসে আসছে। এক দন্ডে দার্শনিক বছরের পর বছর ছুঁয়ে যেতে লাগলেন। প্রশ্ন জাগল ওই স্বাস্থ্যবান পুরুষটিই যদি কালিদাসের কাহিনির সেই লম্পট দুষ্মন্ত হয়, এবং ওই সুদর্শনা কন্যাই যদি শকুন্তলা হয় তবে প্রিয়গুপ্ত স্বয়ং কে?
প্রিয়গুপ্ত ক্রমশ নিজেকেও চিনে ফেলেন। মনে পড়ল কন্থ মুনির আশ্রমের পাশের একটা ব্রহ্মচর্যাশ্রম। মনে পড়ল পুণ্যদেবকে। পুণ্যদেবের মুখ প্রিয়গুপ্ত জলের প্রতিফলনে ছাড়া দেখেননি। অর্থাৎ এই পুণ্যদেব প্রিয়গুপ্ত নিজেও হতে পারেন। এই মুহূর্তে পুণ্যদেবের চোখই প্রিয়গুপ্তের চোখ। পুণ্যদেবের দৃষ্টি এবং বিচারই প্রিয়গুপ্তের দৃষ্টি এবং বিচার।
পুণ্যদেব, নামে রূপে সাধনায় বাস্তবিকই পুণ্যদেব। পাপের লেশমাত্র তাঁকে স্পর্শ করে না। পাশের আশ্রমের শাঙ্গদেব, শারদ্বত, প্রিয়ংবদা সকলেই জানে শকুন্তলার সঙ্গে পুণ্যদেবের এক অপূর্ব নিষ্পাপ প্রেমের সম্পর্ক আছে। ওরা চায়ও শকুন্তলা বয়সকালে এই সৌম্য যুবকটিকে বিবাহ করুক।
সন্ধ্যাহ্নিক শেষে পুণ্যদেব যখন আশ্রমের বেড়ার ধারটায় এসে দাঁড়ায় সে শুনতে পায় শকুন্তলার মিষ্টি গলায় বেদগান। সে দেখতে পায় গোধূলির আলোয় মুনিকন্যা কত সুন্দর। শকুন্তলাও পুণ্যদেবকে দেখে লজ্জায় রাঙা হয়ে যায়। কাছে এসে বলে, ব্রহ্মচারী! ওভাবে কাউকে দেখতে নেই জান না!
পুণ্যদেব শকুন্তলার করতলের পৃষ্ঠদেশে চুমু দেয়। বলে, সামনের বছর আমি তোমার পিতৃদেবের কাছে নতজানু হয়ে বলব, মুনে! আপনার কন্যাটিকে আমায় উপহার দিন। ওই পরমাপ্রকৃতি নারীটিকে আমি কামনা করি।
লজ্জায়, আনন্দে ভরা ঢেউ শকুন্তলা বলে, বাবা তোমার কান মলে দেবে। বলবে, আরও বারো বছর ব্রহ্মচর্য পালন করো বৎস। বলেই ছুটে পালিয়ে যায় শকুন্তলা।
কিন্তু বিভ্রাট ঘটল এর মাসখানেক পরে। রাজা দুষ্মন্ত এসে নিষ্পাপ শকুন্তলার সরলতার সুযোগ নিলেন। প্রমাদ গুণল পুণ্যদেব। ভয়ে-দুঃখে-লজ্জায় আশ্রমের বেড়া ডিঙোল না মাসের পর মাস। শেষে যেদিন আশ্রমের সমস্ত কিছুকে কাঁদিয়ে গর্ভবতী শকুন্তলা বিদায় নিল, দূর থেকে গাছের পাতার আড়ালে দাঁড়িয়ে সে দৃশ্য দেখল পুণ্যদেব।
পরে যখন শুনেছিল দুষ্মন্ত শকুন্তলাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন তখনও বুক বাড়িয়ে গিয়ে বলতে পারেনি, প্রিয়তমা তুমি আমার।
নিরীহ আস্ফালনে পুণ্যদেব মনস্থ করেছিল এক কাব্যনাটকে দুষ্মন্তের ওপর তার রাগের জের তুলবে।
সহসা হাড়িকাঠে ফাঁসবাঁধা প্রিয়গুপ্ত চিৎকার করে উঠলেন, রাজন! রাজন! একটা আর্জি আছে রাজা, একটা আর্জি আছে।
খঙ্গ তুলেছিল জল্লাদ কোপ বসাতে। রাজা হাত দেখাতে খঙ্গ নামাল। অপরজন হাড়িকাঠ থেকে মুক্ত করে আনল দার্শনিককে। রাজা জানতে চাইলেন প্রিয়গুপ্তের আর্জি।
বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে প্রিয়গুপ্ত জানালেন পুরো অভিজ্ঞানশকুন্তলম একটা ধড়িবাজের লেখা। পুণ্যদেবের সমস্ত ব্যাপারটাই সেখানে উপেক্ষিত। এক ভীতু কালিদাসের রাজভক্তিই প্রকট হয়েছে ওই মিলনান্তক নাটকে। ওটা হওয়া উচিত বিয়োগান্তক উপাখ্যান। নিষ্পাপ মাধুর্যের ওপর স্বেচ্ছাচারের দৌরাত্মই নাটকের বিষয়, যেটা শিল্পীর স্বভাবসুলভ দ্বিধার সঙ্গেই এড়িয়ে গেছেন কালিদাস।
