আমার বাঁ-পকেটটা তাই আজ ভারমুক্ত, ফাঁকা। তবে একবারে ভোঁ ভোঁ নয়। ওখানে সকালের খবরটার কাটিং আছে, যার শেষটুকু পড়া হয়নি। আমি রাস্তার মোড়ে কাগজটা বার করলাম। তারপর মোড়ের বাসনের দোকানের বিকট আলোয় পড়তে গিয়ে থম মেরে গেলাম। ফের বোধ হয় বুড়ো বয়সে ভূতে ভর করল আমাকে, কী সর্বনাশ, সকালে খবরের আসলটুকু না পড়েই পথে বেরিয়ে পড়েছি!
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্না ক্যাবারে ড্যান্সারের মৃত্যুসংবাদে লিখছে—তিন চার বার বিয়ে করেছেন। কিন্তু জীবনের শেষ তিনটে বছর কাটিয়েছেন সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ। শেষ দু-বছর ছিলেন প্রায় পঙ্গু, নাচের ফ্লোরে পড়ে গিয়ে মেরুদন্ডের হাড় ভেঙে গিয়ে। তাঁকে নিয়ে জীবনী লিখেছেন ইংরেজ লেখক টম আক্কিন, বইয়ের নাম ‘ক্যাবারে : দ্য লাইফ অফ লাশিয়াস লোলা। তিনি নিজে জীবনের শেষ দিনগুলোয় দুরারোগ্য আথ্রাইটিসে বিছানায় শুতে পর্যন্ত পারতেন না। হুইলচেয়ারের জীবনেই তিনি শেষ করেছেন তাঁর স্মৃতিকথা— ‘লেটার টু অ্যান অ্যাংরি বয়। বইটির মুক্তি অনুষ্ঠানে তিনি শেষবারের মতো দিল্লির ওবেরয় হোটেলে যান। এবং তারপরই পাশের স্যুইটে বিশ্রামে যান ও আঠারোটি ঘুমের বড়ি খেয়ে বরাবরের মতো ঘুমিয়ে পড়েন। তাঁর মৃত্যুতে কবি ডম মোরেজ বলেছেন যে, এক অসাধারণ, অলৌকিক নাচ শেষ হয়ে গেল।
আমি খবরটা পড়ে ফের কাগজটা প্যান্টের বাঁ-পকেটে গুঁজে দিলাম। আর তা করতে গিয়ে আজ দশম, দ্বাদশ কিংবা চতুর্দশ বারের মতো চমকে উঠলাম। আমার পকেটে জগুদার সেই ভয়ংকর ছুরি এখন আছে! ওটা আমি সিঁড়ির পাশের ঘুলঘুলিতে সরিয়ে রাখিনি। ওটা বরাবরের মতো আমার পকেটে ভর করে আছে। আমি আস্তে আস্তে বার করলাম ছুরিটা। বোতাম টিপতেই খুলে গেল ফলাটা। লকলক করছে সাপের ফণার মতো। এতকাল ধার না দিয়েও ধার মরেনি জন্তুটার। হঠাৎ ফের রক্তের গন্ধে জেগে উঠেছে। আমি জানি এভাবে ওকে বেশিক্ষণ উলঙ্গ করে রাখলে ও আমাকেই খাবে। আজ বড়ো দুর্দিন আমার, ও জানে।
আমি ভোলা ছুরিটা রাস্তাটার পাশের ড্রেনে ফেলে দিলাম। বহুকাল ও আমাকে পাহারা দিয়েছে। আজ ওকে মুক্তি দিলাম।
আমার মনে পড়ল লীলাদের বাড়িতে মূৰ্ছা যাওযার পর মা বলেছিল, সঙ্গে একটা লোহা রাখিস, নিতু। খারাপ হাওয়া-টাওয়া কাছে আসতে পারে না। মা বোঝাতে চেয়েছিল বুড়ি ব্রাগানজার আত্মার ছোঁয়া।
এখন মনে হচ্ছে ছুরিটার সঙ্গেই সব হাওয়া ছাড়া পেল আমার থেকে। এক টুকরো খবরের কাগজ আপাতত লোহার ছুরির মত ভর করেছে আমাকে।
আমি মৌলালির দাসবাবুর দোকান থেকে ক-টা কামপোজ কিনলাম। আজ ঘুম আসা অত সহজ হবে না। জানি ওষুধের ঘুমে বড়ো ভয় আমার গিন্নির, কিন্তু ঘুম আমার চাই। একটু লম্বা ঘুম হলেও বা দোষের কী!
প্রিয়গুপ্তের অভিজ্ঞানশকুন্তলম
উজ্জয়িনীর পার্শ্ববর্তী মেদিনীরাজ্যে প্রিয়গুপ্ত দার্শনিক থাকেন। নিজের বাসস্থলের তল্লাটটাও ভালো করে দেখে নেবার ফুরসতটুকু এই তরুণ দার্শনিকের বড়ো একটা হয়নি। জগৎ সম্পর্কে ধারণা তাঁর যতই লঘু ততই গুরু তাঁর দর্শনচিন্তা। এযাবৎ তিনি কালিদাসের অভিজ্ঞান শকুন্তলমের টীকাকৃতিতে ব্যস্ত। মুখ গুঁজে বই ঘাঁটেন, লেখার সময়টায় বিস্তর লেখেন। প্রিয়গুপ্ত বাস্তবিকই ঘাবড়ে গেছিলেন রাজার পেয়াদা তাঁকেই খোঁজ করছে শুনে। গুরুতর কাজ ফেলে প্রিয়গুপ্ত রাজসভায় গিয়ে যা শুনলেন তাতে ওঁর বিস্মিত না হয়ে উপায় ছিল না। রাজ্যের গুণিন সামন্তসেন রায় দিয়েছেন রাজকুমারী রাগেশ্রীর শুভবিবাহে সব চেয়ে বড়ো বাগড়া প্রিয়গুপ্ত। নেই নেই করে সাত-সাতটা চমৎকার যোগাযোগ নষ্ট হয়েছে, কারণ এই প্রিয়গুপ্ত মনে-প্রাণে কামনা করেন রাগেশ্রীকে। এবং এই অশুভ কামনার অবসান না হলে রাজকুমারীর কোনো সম্বন্ধই টিকবে না। রাজা বললেন, দার্শনিক! তোমার এত বড়ো স্পর্ধা কী করে হল! সাধারণ রক্তের মানুষ তুমি রাজরক্তের স্ত্রী কামনা কর কী সাহসে? প্রিয়গুপ্ত এতটা আশ্চর্য কখনোই হননি। দর্শনের কোনো জটিল সমস্যাও তাঁকে এতখানি বিব্রত কখনো করেনি। তাই মুখ কাঁচুমাচু করে বললেন, কিন্তু রাজন, আমি তো আপনার কন্যাকে কখনো দেখিনি। তাঁকে আমি কামনা করব কী করে? তা ছাড়া ইদানীং আমি অভিজ্ঞানশকুন্তলমের টীকা লিখনে ব্যস্ত আছি। কোনো স্ত্রীসংক্রান্ত চিন্তা আমাকে স্পর্শ করে না। এবার সামন্তসেন আসন থেকে উঠে দার্শনিকের কাঁধে হাত রাখলেন। সাদা দাড়িগুলো চুলকোতে চুলকোতে বললেন, তুমি না সত্যানুসন্ধী দার্শনিক! এরকম মিথ্যে কথার খই ফোঁটাচ্ছ কী ভেবে?
প্রিয়গুপ্তের এবার সত্যিই কান্না পাচ্ছিল। ছুটে গিয়ে রাজার সামনে নতজানু হয়ে বলতে লাগলেন, বিশ্বাস করুন রাজন আমি আপনার কন্যাকে কখনো দেখিনি, চিনি না, কামনা করি না। রাজা একটু ভাবিত হচ্ছেন দেখে সামন্তসেন বললেন, তাহলে দাঁড়াও দার্শনিক। আমি আমার যৌগিক আয়নাটা আনাই। তাতেই তোমার সব ধড়িবাজি ধরা পড়বে।
দেখতে দেখতে চারজন পেয়াদা একটা বিশাল আয়না এনে সভায় হাজির করল। আয়না, অথচ তাতে কোনো কিছুর প্রতিফলন ঘটছে না। গুণিন বললেন, তুমি যে নারীকে অদ্যাবধি চিন্তা করেছ তাকেই স্মরণ করো। আয়নাতে তার প্রতিবিম্ব ফুটবে। সে নারী যদি আমাদের জনগণপ্রিয় রাজকুমারী না হন তাহলেই রাজা তোমাকে মুক্তি দেবেন।
