সেই ভয়, সেই কাঁটা দেওয়া, সেই হৃৎকম্পন আজও আমার শরীর ছেড়ে যায়নি। এই এতকাল পরেও। আমার স্পষ্ট মনে আছে ওই চাহনি আর ওই ভৎসনা, হাও ডেয়ার ইউ হার্ম দিস লিটল কিড!
আমি থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে বললাম, বাট আন্টি, হোয়াট হ্যাভ আই ডান? কী করেছি আমি?
বুড়ি ব্রাগানজার হাত আরও জেঁকে বসল আমার কাঁধে, তুমি ভাবছ আমি কিসসু দেখিনি! লোরেনকে আমি ঘৃণা করি তোমাকে নষ্ট করে বলে। কিন্তু তুমিও তো নষ্ট হয়েই আছ। ইউ মাস্ট বি পানিশড!
ওই অন্ধকারে পায়ের তলার মার্বেল যেন আরও ঠাণ্ডা মেরে গেছে। আমি কাঁপছি থরথর করে। কিন্তু তার মধ্যেও আমি বলে ফেলেছিলাম, আমাকে পানিশ করো করো, কিন্তু তুমি লীলাকে কষ্ট দিচ্ছ কেন?
গর্জে উঠল বুড়ি, আমি ওকে শাস্তি দিইনি, ওকে পরিষ্কার করেছি। ইউ হ্যাড সিনড অন হার। তুমি ওকে অপবিত্র করেছ। আর তোমাকেও পাপ থেকে ছাড়িয়ে আনব। আই উইল ক্লেনজ ইউ অফ ইয়োর সিন।
বুড়ি ব্রাগানজা যখন এসব কথা বলছে তার মধ্যেই আমি অন্ধকার দেখতে শুরু করেছি। ধূপের মতো মধুগন্ধ আমার নাকে এসে লাগছে। চারদিকের অন্ধকারের মধ্যে অদৃশ্য আগুনের উত্তাপ বোধ হচ্ছে। অন্ধকারটা কখনো কালো কড়াইয়ের অন্ধকার, কখনো রাত্রির আকাশের অন্ধকার বলে ঠাওর হচ্ছে। স্কুলের মিসের কাছে হেল বা নরকের যে বিবরণ শুনেছিলাম সেই হেল কি এরকমই উত্তপ্ত অন্ধকার? চিৎকার করে হাসি আর চিৎকার করে কান্না শুনতে পাচ্ছি। পিঠের উপর বিষম ভার চাপছে বোধ হল, মনে হল জিভটা ঠেলে বেরিয়ে আসবে। মনে হচ্ছে আমার ভিতর থেকে নিতুকে কেউ টেনে হেঁচড়ে বার করে নিতে চাইছে। ও প্রাণপণে আমাকে ধরে থাকতে চাইছে আর আমি ওকে। কিন্তু কেউই কাউকে ধরে রাখতে পারছি না। আর এই টানাটানির মধ্যে প্রচন্ড একটা আঘাত মাথায়…অন্ধকারের চেয়েও এক গভীর অন্ধকারে আমি ছিটকে পড়লাম, আর ডুবতে থাকলাম, ডুবতে থাকলাম, ডুব ডুব ডুব ডুব ডুব…
পঁচিশ বছর পর কোনো কিছুই আর আগের মতো থাকে না। সবকিছু এতটাই বদলে যায় যে পূর্বের স্মৃতিকে মিথ্যে বলে মনে হয়। যেমন আজ মনে হচ্ছে সব কিছুকেই। কিন্তু স্মৃতি তো আর মিছে হয় না, কিংবা আমার মাথার পিছনের এই দাগ। দেড় ইঞ্চির যে-ক্ষত সে দিন তৈরি হয়েছিল লীলাদের বাড়ির মার্বেলের সিঁড়িতে। রক্তাক্ত অবস্থায় যে সন্ধ্যায় সবাই আমাকে খুঁজে পেয়েছিল সিঁড়ির নীচে, অন্ধকারে।
শুনেছি তিনদিনের অজ্ঞান অবস্থা থেকে প্রথম যেই চোখ মেলেছিল লীলা, ঠিক তক্ষুনি সবাই সিঁড়ির তলা থেকে আমার পড়া আর চিৎকারের শব্দ শোনে।
চার দিন পর ক্যাম্বেল হাসপাতালের বেডে প্রথম যখন চোখ মেললাম, দেখি আমার মাথার ব্যাণ্ডেজে আলতো করে হাত রেখে দাঁড়িয়ে লোরেন। আমাকে গুড বাই করতে এসেছে। ওরা মিন্টো লেন ছেড়ে উঠে যাচ্ছে এলিয়ট রোডে সামনের মাসে। এর মধ্যে ও একবার শিলং যাবে। আর হয়তো দেখা হবে না।
আমি একটা কথাও সে দিন বলিনি ওর সঙ্গে। ওর ঈর্ষা জাগাতে গিয়ে নিজের ঢের ক্ষতি করে বসেছি। আর কথা নয়, এরপর প্রতিহিংসা, শুধু প্রতিহিংসা।
লোরেন আমার গালে একটা চুমু খেল। আমি চাইলে ওর চুলে, মুখে হাত ছোঁয়াতে পারতাম। বেডের পাশে তো আর কেউ ছিল না। কিন্তু হাতই তুললাম না। প্রতিহিংসা তোলা থাক প্রতিহিংসার দিনের জন্য। যে দিন সেই দিন আসে।
আমি জানি না আজ সেই দিন কি না। জানি না সকালের ওই মৃত্যুসংবাদের পরও মানুষ পুরোনো খবরের মতো পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ উবে যায় কি না। জানি না প্রেম বা প্রতিহিংসার জন্য আত্মারা অতিরিক্ত সময় জড়িয়ে থাকে কিনা সংসারে। জানি না শেষ বিচারে প্রতিহিংসাই প্রেম বা প্রেমই প্রতিহিংসা কি না জানি না পঁচিশ বছর পরেও নীতীন্দ্র সেনকে লোরেন সুইন্টনের মনে ছিল কি না। আঠারো বছর আগেই তো বিয়ের চিঠিতে আমার নামের বানানে ভুল করে বসেছিল লীলা। ফলে আমিও ওকে একটা গ্রিটিংস কার্ড পাঠিয়েছিলাম ‘লীলা’র জায়গায় ‘নীলা’ লিখে। তাতে ছোট্ট একটা চিঠি লিখেছিল ও আমাকে—এতদিন পরও রাগ কমল না! মেয়েটা জানলই না যে ভুলে যাওয়ার চেয়ে রাগ পোষণ করা অনেক ক্ষুদ্র প্রতিশোধ।
আমি ছাদ থেকে নেমে বাড়ির বাইরে এসে মিন্টো রো ধরে হাঁটতে শুরু করলাম। সেই আগের মতোই থেকে গেছে পাড়াটা, কেবল বেশি আলো ঝলমলে হয়েছে। পূর্বের সেই অন্ধকারগুলো ম্যাড়মেড়ে হয়ে গেছে আর পাড়ার অলংকারের মতো ছিল যে-সব অ্যাংলো ইণ্ডিয়ান পরিবার তারা বরাবরের মতো হারিয়ে গেছে। আসলে পাড়াটার ভিতরটা ফাঁকা হয়ে গেছে, বাইরেটা প্রায় সেই আগের মতো। এপাড়ার কাউকেই আর চিনতে পারি না, কেউ চিনতে পারে না আমাকেও। এখানকার কেউই হয়তো খবর রাখে না এপাড়ায় আগে ভূত নামত, জমাদার পরসাদি মন্তর পড়ে সেই সব ভূতের গতি করত। এখানে দিনদুপুরে খোলা ছুরি নিয়ে লড়াই বাঁধত, ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটত, তারপর বিকেলে সেইসব ছোকরারাই রোয়াকে বসে গাইত অনুরোধের আসরের গান। উত্তম-সুচিত্রার ছবি দেখে এসে বাড়ির মেয়েরা বারান্দায় ঝুঁকে শুনত সেই সব গান। আর রাত নামত অ্যাংলো যুবক-যুবতীর মাতাল নাচগানে। আরও অনেকের মতো আমার পকেটেও ভর করেছিল একটা অটোম্যাটিক চাকু। বোতাম টিপলেই ব্লেড খুলে যায়। একটা ব্যাঙও কাটিনি আমি পাড়ার মাস্তানের থেকে উপহার পাওয়া সেই ছুরিতে। আজ পঁচিশ বছর পর সেই চাকুটা জমা দিয়ে এসেছি পুরোনো বাড়ির ছাদের সিঁড়ির ঘুলঘুলিতে। ওই ছুরিতে জগুদা স্ট্যাব করেছিল বেপাড়ায় হুজুতে মাস্তান কেলে বিশেকে। তারপর ওটা ছুড়ে ফেলে দেয় নর্দমায়। তারপর মন্ত্রমুগ্ধ আমার দিকে চেয়ে বলেছিল, ওটা কুড়িয়ে নাও। কাজে আসবে।
