ঠিক সেইমুহূর্তে আকাশ ছেয়ে গেল এক দীর্ঘাতিদীর্ঘ বিদ্যুল্লতায় আর আমরা দুজনে দু জনকে সম্পূর্ণ নর ও নারী হিসেবে দেখতে পেলাম। আমার মাথাটা বুকে গুঁজে নিয়ে লীলা ঝটিকায় সোজা হয়ে দাঁড়াল মেঝের ওপর, আর ঘামে ভেজা দেহে কাঁপতে কাঁপতে বলল, কথা দাও, তুমি আর কোনোদিন ওকে ওভাবে দেখবে না। শুধু আমাকে…।
আমি ওকে কথা শেষ করতে দিইনি। তার আগেই বলে দিলাম, কথা দিচ্ছি। শুধু একবার একটা ছোট্ট কাজ…বলতে বলতে হাত বাড়িয়ে দেওয়ালের সুইচটা অন করে দিলাম লোরেনকে আমার নিজস্ব ফ্লোরশো দেখানোর প্রতিহিংসায়।
আজ বুঝি ওই কীর্তি, আমার নয়। একবার আলো জ্বলে উঠতে একই সঙ্গে চমকে উঠেছিল দুই নারী। লীলা আর লোরেন। এ কী করলে! বলে চিৎকার করে উঠল লীলা, তারপর ছিটকে গিয়ে সুইচ অফ করে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপল। আমি ওর জামাটা গায়ে পরিয়ে দিতে যেতে সরে গিয়ে বলল, ডোন্ট ইউ টাচ মি! ছিঃ! তুমি এই চেয়েছিলে?
জামা পরে দরজা খুলে দড়াম করে দরজা বন্ধ করে লীলা বাইরে অন্ধকারে ছুটে বেরতেই ঝমঝম করে বৃষ্টি নামল ছাদ, পাড়া ও শহর জুড়ে। আর ওদিকে দমদম আওয়াজে কবাট পড়ল লোরেনের ঘরেও। মধ্যিখানে আমি এক অন্ধকারে খোলা দেহে বসে রইলাম কাঠের শীতল মেঝের উপর। আমার নিজের অঙ্গই তখন দমকে দমকে উষ্ণতায় ভিজিয়ে দিচ্ছে আমার শরীর।
কতক্ষণ বৃষ্টি চলেছিল আজ মনে নেই; কতক্ষণ ওভাবে বসেছিলাম তাও মনে পড়ে না। শুধু এটাই মনে আছে যে ওই একই সন্ধেয়, একই মুহূর্তে আমি একই সঙ্গে লোরেন আর লীলার থেকে সমান দূরত্বে চলে গিয়েছিলাম। পড়ার ঘরের জানলায় বসা আর সামনের আলসেতে ভর করে লীলাদের ছাদের দিকে চেয়ে থাকা—সব স্বাধীনতাই চলে গেল। একই দিনে আমার পাড়া মিন্টো লেন আমার বৈরী হয়ে গেল। ঘটনার তিনদিন পর চিলেকোঠার ঘর থেকে যাবতীয় বইপত্র নামিয়ে নিয়ে এসে মাকে বললাম, মা, আমাকে বোর্ডিঙে পাঠিয়ে দাও।
অবাক হয়ে বহুক্ষণ চেয়েছিল মা আমার দিকে। তারপর বলল, তুই ঠিক বলছিস তো? বোর্ডিঙে যেতে তোরই তো অত আপত্তি। বললাম, আপত্তি তো আছে। কিন্তু এখানে পড়াশুনো একদম ভাল হচ্ছে না।
মা ফের অবাক হয়ে গেল। কী বাপু, সারাক্ষণ তো বই নিয়ে থাকিস ছাদের ঘরে। কেউ তো বিঘ্ন ঘটায় না। আর অমিয় তো ভালোই পড়ায় বলছিলি তুই।
বললাম, সব ঠিক আছে। কিন্তু আমার ভয় করে।
—ভয়? কীসের ভয়?
বলেই ফেলছিলাম দুটি মেয়েকে। ঠিক সময়ে সামলে নিয়েছিলাম। বললাম, বুড়ি ব্রাগানজাকে মাঝে মধ্যে দেখি। ওর ওই ইজিচেয়ারে বসে আছে অন্ধকারে। পাথরের মতো চোখ নিয়ে। মা তৎক্ষণাৎ শাড়ির আঁচল তুলে মুখে গুঁজে ধরল, সর্বনাশ! তার মানে তো বেশ খারাপ কিছু।
-তা তো বটেই! বিশ্বাস তো আমিও করতে চাই না এসব। কিন্তু…।
—না, না বাপু, তুই উপরে যাওয়া ছাড়ান দে। ভানু যা বলেছিল তা তো তা হলে ঠিক।
হঠাৎ করে উদগ্রীব হয়ে উঠলাম ভানুর কথায়। আমাদের কাজের লোক, বানিয়ে কথা বলায় ওস্তাদ। বললাম, ভানু কী বলছিল মা?
বলছিল ঋতেনবাবুর মেয়ে লীলার উপর নাকি ভর করেছে ব্রাগানজা মেম। পরসাদিকে দিয়ে ঝাড়ানো হচ্ছে ওকে এখন।
এবার গুলতি খাওয়া পাখির মতো আর্তনাদ করে উঠলাম আমি, সে কী? লীলাকে ভর করেছে বুড়ি?
মনে মনে ভাবলাম আমি যা কল্পনার রং চড়িয়ে বললাম তা আসলে মিথ্যে নয়! বুড়ি সত্যিই হয়তো সন্ধেকালে জাঁকিয়ে বসে ওর ইজিচেয়ারে।
আমি ‘আসছি’ বলে ছুট দিলাম ছাদের ঘরের দিকে, সত্যি একবার নজর করে দেখি বুড়ি ওর জায়গায় বসে আছে কি না। ছুটে এলাম ঘরের দরজা অবধি। কিন্তু কিছুতেই সাহস হয় না শিকল নামিয়ে ঘরে ঢোকার। যদি সত্যি সত্যি দেখে ফেলি থেলমা ব্রাগানজা অন্ধকারে বসে পাহারা দিচ্ছে আমাকে।
আজ পঁচিশ বছর পরেও আমার সেই একই বাধা শিকল খুলে আমার ছেলেবেলার পড়ার ঘরে ঢোকার। ঢুকলে কী দেখব আমি জানি না, কিন্তু যা-ই দেখি আমার সহ্য হবে না। আজ থেলমা ব্রাগানজাকে দেখার কথা ভাবছি না, কিন্তু যদি আমি ঘরের জানলা খুলতে দেখি আলো জ্বলে উঠেছে লোরেন সুইন্টনের ঘরে। বেজে উঠেছে গ্রামোফোন। গাইছে এলভিস, প্যাট বুন, ক্লিফ রিচার্ড। আর সেই সুরে, সেই ছন্দে নাচছে…আজ সকালে যার খবর পড়েছি কাগজে।
আজ আমি থমকে দাঁড়িয়ে আছি চিলেকোঠার সামনে, কিন্তু সে দিন আমি ফের দৌড়ে নেমে গিয়েছিলাম নীচে। তারপর আরেক দৌড়ে লীলাদের বাড়ি। গেট খোলা ছিল কী কারণে যেন, খোলা ছিল ঋতেনবাবুর চেম্বারের দরজাও। আমি বেড়ালের মতো নরম পায়ে উঠে গেলাম মার্বেলের সিঁড়ি দিয়ে। দোতলা অবধি উঠে এসেছি যখন কানে এল একটা পরিচিত শব্দ। পরসাদি ওর দেহাতি বুলিতে বলে যাচ্ছে কী সব হাবরজাবর। আর নিমের ডাল দিয়ে পিটছে মাটিতে। সেইসঙ্গে একটা গোঙানির শব্দ বিচিত্র কণ্ঠস্বরে। না, না, এ কখনও লীলার কণ্ঠস্বর হতে পারে না। এ কণ্ঠ আমি চিনি, এ কেবল একজনেরই। আমার মনে আছে সেই সকাল ইন্টালি মার্কেটে, আমি দু-পাউণ্ড রুটি আর আট আনার মাখন কিনে খুচরোর জন্য অপেক্ষায় ছিলাম, যখন হঠাৎ করে আমার বাঁ কাঁধে একটা হাত…
আমি চমকে ফিরে তাকিয়েছি, আর লীলাদের মার্বেলের সিঁড়ির মাথায়, দোতলার হলের অন্ধকারে দেখি আমার পিছনে পাথরের মতো নিথর চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে বুড়ি থেলমা ব্রাগানজা!
