আমি ক্ষমা করতে পারিনি সে-দিন লোরেনের ক্ষমাপরায়ণতাকে। যে-মানুষ আমাকে আর লোরেনকে আলাদা করে দিতে চেয়েছিল তার জন্য ওই কান্না আমি মেনে নিইনি। আমি ব্রাগানজা মেমসাহেবের শবমিছিল থেকে আলাদা হয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে শেষ অবধি বাড়ি এলাম না। বলা ভালো নিতুই বাড়ি এল না।
নিতুকে একেক সময় বড়ো ভয় পাই আমি। আমি অনেক কিছুই পারি না যা নিতু অবলীলায় পারে। যেমন আমাদের পাড়ার বিখ্যাত কার্ডিওলজিস্ট ডা: ঋতেন বসুর মেয়ে লীলার সঙ্গে আমি যেচে পড়ে কথা কইতে পারি না। কিন্তু নিতু পারে। আমি বরং অনেক স্বস্তি পাই ছাদের ঘরে বসে চেঁচিয়ে লোরেনের সঙ্গে ইংরেজিতে বাতচিত করতে। কিন্তু তেরো বছরের লীলাকে সামনে দেখলে আমার জিভে আঠা ধরে। কখনো সখনো ভিতরে একটা উশখুশে ব্যাপার হয় ঠিকই, যেটা মনে হয় নিতুর ব্যাপার।
আমি লোরেনের চোখের জলে আহত হয়ে যে শেষ অবধি লীলাদের বাড়ি গিয়ে বেল দিলাম সেটা একান্তই নিতুর কারবার। তারপর যখন দরজা খুলে পুলকিত বিস্ময়ে লীলা বলে উঠল, অ্যাঁই তুমি! আমি ভিতরে ভিতরে কাঁপতে শুরু করলাম। কী বলব ভেবে পাচ্ছিলাম না, হঠাৎ মনে হল আমাকে এভাবে এখানে দাঁড় করিয়ে নিতু ভেগে পালিয়েছে। আমি আমার তোতলামি শুরু করে দিলাম। আসলে…আসলে…আমি একটা কথা বলতে…
লীলা বলল, বুঝেছি। আমার গলায় ওই গানটা শুনতে চাও তো?
আমি প্রায় ল্যাবার মতো বলেই ফেলেছিলাম, কোন গানটা বলো তো? আর তক্ষুনি মনে পড়ল লীলার লেখা চিঠিটার কথা—’যদি কখনও আসো আমাদের বাড়ি তালে শোনাব তোমার প্রিয় গানটা। মানবেন্দ্রর ‘আমি এত যে তোমায় ভালবেসেছি। শুনেছি এটা নাকি তোমার খুব প্রিয় গান। বলা বাহুল্য, আমি সে-চিঠির কোনো উত্তর দিইনি। অথচ কী এক টানে এসে দাঁড়িয়েছি ওরই দোরগোড়ায়। বুঝছি না কী বলে সামাল দিই।
ঠিক তখনই বোধ হয় নিতু ফিরে এল আমার মধ্যে। আমি বলে বসলাম, লীলা, ক্যাবারে নাচ দেখেছ কখনো। মেয়েটা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল আমার দিকে, মুখে কথা সরছে না। অনেকক্ষণ পর কথা ফুটল, ক্যাবারে? তুমি দেখো?
আমি মাথা নেড়ে রীতিমত গর্বের হাসি হেসে বললাম, রোজ!
–রোজ?
–রোজই বলতে গেলে।
–কোথায় হয় এসব?
আমি সংলাপ ছোটো করার জন্য (কারণ আমি ভিতরে ভিতরে কাঁপছি) তাড়াতাড়ি বললাম, সে জায়গা আছে। আগে দেখবে কি না বলো।
আর অমনি লীলা আমার দিদির মতো হয়ে গেল। যে লোরেনের মুখে ক্যাবারে গল্প শুনবে বলে দিনের পর দিন ওর অ্যালজেব্রা কষে দেয়। কী ভাবল, কিংবা কিছুই ভাবল না, শুধু বলল, কবে?
আমি সংলাপ শেষ করার জন্য বললাম, জানা থাকল। যে-কোনো দিন সন্ধেয় ডেকে নেব।
নিতু, থুড়ি আমি এবার পিছনের আলসে ছেড়ে বাড়ির সামনের দিকের আলসেতে এসে ভর দিয়ে দাঁড়ালাম। লীলাদের বাড়ির নীচের চেম্বারে আলো জ্বলছে, তার মানে ওর দাদা নিরুপম পেশেন্ট দেখছে। নীলা তো সেই কবেই বিয়ে করে বিলেতে।
আমি ওদের সুন্দর বাড়িটার ওই মার্বেল করা সিঁড়িটার কথা ভাবছি। না থাক, সে পরে হবে। আমি আস্তে হেঁটে ছেলেবেলার পড়ার ঘরটার পাশে এসে দাঁড়ালাম। ছিটকিনি খুলে ভিতরে ঢোকার বড়ো ইচ্ছে, কিন্তু আমিই যেন নিজেকে বাদ সাধছি। কারণ…কারণ…এই ঘরের মধ্যেই সে-দিন বিদ্যুতের আলোয় সব এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল। আমার স্পষ্ট মনে আছে।
ক-দিন পর মনে নেই, তবে দিনটা ভালো ছিল না। বড়ো বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল। আমি অন্ধকার স্পাইরাল সিঁড়ি দিয়ে হাত ধরে লীলাকে উঠিয়ে নিয়ে এসেছিলাম চিলেকোঠায় আমার স্টাডিতে। সব দেখেশুনে লীলা বলল, এখানে আবার ক্যাবারে কীসের? আমি ঠোঁটে আঙুল চেপে বললাম, সাইলেন্স! এটাই ক্যাবারে শোয়ের বক্স সিট। বলে খুলে দিলাম পিছনের গরাদহীন জানলা। আর সঙ্গে সঙ্গে ভেসে উঠল কালো বডিস আর সাদা লং স্কার্টে নৃত্যরতা লোরেনের দৃশ্য। লীলা মুখে দু-দুবার তালুর টোকা মেরে বলল, ও মা! এ কী নাচ নিতু? আমি বললাম, ফ্লোর শো। কেন, তোমার খারাপ লাগছে?
সঙ্গে সঙ্গে লীলা বলল, কেন, আমি কি তাই বলেছি?
আমি বিজ্ঞের মতো বললাম, বলা যায় না, তোমরা তো সব রিচ অ্যাণ্ড কনজারভেটিভ ফ্যামিলির মেয়ে।
লীলা জানলায় বসে একদৃষ্টে লোরেনের নাচ দেখতে দেখতে বলল, আর তুমি?
লোরেন ততক্ষণে লং স্কার্টটাও খুলে ফেলেছে। কালো টু-পিসে মেয়েটা এখন অপ্সরার মতো হয়ে পড়েছে। ও আঁচ করেছে আমার জানলায় আমি সেট হয়ে গেছি। ও জানে না যে বিস্ময়ে বিমুগ্ধ নয়নে এক ত্রয়োদশী বাঙালি কিশোরী ওর শরীরসুধা পান করছে। আর আমি?
আমি একটা একটা করে ওই নিরেট অন্ধকারে কিশোরীর ফ্রকের পিছনের টিপ বোতামগুলো আলগা করে দিচ্ছি। ক্রমে জামাটা একটু একটু করে তুলে আনছি মাথার দিকে। হঠাৎ এক বিদ্যুৎ ঝলকে দেখলাম কিশোর সদ্যফোঁটা অপূর্ব স্তন দুটি। বিদ্যুৎ ঝলকের সঙ্গে সঙ্গে চোখ বুজে ফেলেছে লীলা, কিন্তু ওর হাত আমার হাতকে থামানোর কোনোই চেষ্টা করছে না। আমি হঠাৎ এক ঝটকায় ওর মুখটা আমার দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে প্রচন্ড জোরে চুমু রাখলাম ঠোঁটে। তারপর ওকে কাঠের মেঝেতে শুইয়ে একে একে খুলে নিলাম পরিধানের যাবতীয় উপকরণ।
আমার বুদ্ধিতে যা যা করা যায় একটা সুন্দরী মেয়েকে তার সবই করছি আর ভাবছি এর পর কী? কিছুদূর এগিয়ে ফের ভাবনা—এর পর কী? এরও পর?
