পরসাদি একছুটে ওর ডেরায় গেল আর ঘটিভরা জল, নিমের ডাল, তামার পয়সা আর কী-কী সব নিয়ে এসে বিড়বিড় করে মন্তর পড়ে মড়ার চারপাশে চরকি খেতে শুরু করল।
আমার মনে পড়ল সেই গুজবটা : দিনভর হাসপাতালে খেটে বাড়ি এসে থেলমা ব্রাগানজা দেখেছিল ওর জাহাজের মসালচি বর আব্রাহাম ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের এক ঘুড়িকে নিয়ে বিছানায় গড়াগড়ি যাচ্ছে। প্রৌঢ় আব্রাহাম শরীরের কারণে জাহাজে যাওয়া বন্ধ করেছে, কিন্তু মেয়ের রোগে ধরেছে। থেলমার শুধু একটাই কড়ার ছিল—যা করার বাইরে করো, বাড়িতে কোনো ফাজলামো চলবে না। ওর ভাষায়, নো হ্যাগস ইন মাই রুম।
সেটাই সে-দিন করে বসেছিল আব্রাহাম। তারপর বাকি কথার কিছু গুজব, কিছু সত্যি। কেউ বলে থেলমা ঘরের খিল দিয়ে বেদম প্রহার করে বরকে। ঘা পিঠে পড়তেই আব্রাহাম আর তার ছুঁড়ি দুদ্দার করে ঘর ছেড়ে পালিয়ে খিদিরপুরের ডকে গিয়ে প্রথম কার্গোশিপে চড়ে বসে। কেউ বলে ও সব বাজে বকওয়াস, আব্রাহাম এরপর ওর গোয়র পিতৃভূমিতে ফিরে যায় ট্যাঁকে মেয়েটিকে নিয়ে।
কিন্তু একটা কথা সত্যি। সেইদিন থেকে থেলমা ব্রাগানজা আর ওর বিছানায় শোয়নি। আর কাউকে শুতেও দেয়নি। কারও মতে ও অপেক্ষায় আছে কবে ফের ফিরবে আব্রাহাম আর ওরা ফের শোবে ওদের প্রথম এবং একমাত্র বিছানায়। কারও মত হল বরকে যা বিছানায় পিটিয়ে হেভেনে পাঠানো হল তাতে ফের কী করে শোয় বেচারি! তবে স্বামীকে হত্যা করা নিয়ে কোনো কোর্ট-কাছারি হয়েছিল কি না স্পষ্ট জানি না। উকিল দ্বিজুকাকা বলে, ওয়েল, শি ওয়জ অ্যাকুইটেড অন দ্য গ্রাউণ্ড অফ ক্রাইম কমিটেড আণ্ডার এক্সট্রিম প্রোভোকেশন। দুই অনাথ বালকের খাতিরে মার্সি গ্রাউণ্ডও ছিল। কেউ কেউ আবার বলে, এত মর্যাল মহিলা অ্যাংলো সমাজে পাওয়া ভার। সে-কথা কি আর আমি জানি না? সে দিন সেই যে ইন্টালি মার্কেটে…
আমার ভাবনাগুলোয় ছেদ পড়ল হঠাৎ করে ওঠা এক গোঙানির শব্দে। মাই গড! মরা মেমসাহেব কি সত্যিই তা হলে মরেনি! মড়ায় কখনো ধ্বনি দেয়? আর দেখতে দেখতে পড়পড় করে থেলমা ব্রাগানজার বিপুল দেহটা ধসে পড়ল কফিনের মধ্যে। আর প্রায় একই সঙ্গে কফিনের পাশে দাঁড়ানো ডেবরা গোঙাতে গোঙাতে আছাড় খেয়ে পড়ল মাটিতে। বোঝা গেল না গোঙানির ধ্বনিটা কার ছিল—বুড়ির না ছেলে-বউয়ের। ততক্ষণে চাপাস্বরে ‘ভূত ভূত’, ‘দানো-দানো’, করে ভিড় ফাঁকা হতে শুরু করেছে। ছোটোছেলে ক্লাইভ ছুটল পাদরিদের খবর করতে। আর আমরা বাচ্চারা খ্রিশ্চান পরিবারের সঙ্গে সুর মিলিয়ে কাঁদার খুব চেষ্টা করলাম। আর জীবনে নতুন করে ফের শিক্ষা পেলাম যে অন্যের দুঃখে কাঁদার অভ্যেস আমাদের বড় একটা নেই। নিজেদের দুঃখে কত স্বচ্ছন্দে জল আসে চোখে, অথচ পরের বেলায় কত বানাতে হয় দুঃখকষ্টগুলোকে। চারপাশে তাকিয়ে দেখি কত অনায়াসে নরনারী সবাই বানানো দুঃখয় বুক ভাসাচ্ছে। অথচ এরাই একটু আগে কত টীকাটিপ্পনী সহকারে উপভোগ করেছে বুড়ি মেমের কফিন প্রহসন।
হঠাৎ আমার হৃদয় চুপসে গেছে শুধু এক জোড়া চোখের দিকে চোখ পড়ে। লোরেন সুইন্টনের। নীরবে মাতৃহারা বালিকার মতো অঝোরে কেঁদে যাচ্ছে মেয়েটি। অথচ ওর কোনো আত্মীয় নয়, থেলমা ব্রাগানজা; বরং বুড়ি সুযোগ পেলেই ওকে দু-চারটি মন্দ কথা শোনাত। লোরেনও সুযোগ বুঝে খোঁচা দিতে ছাড়েনি কোনোদিন। আমি একটু একটু করে সরে এলাম লোরেনের দিকে। জিজ্ঞেস করলাম, এত কাঁদার কী আছে লোরেন? মানুষ তো…
আমার কথার মধ্যে এই প্রথম শব্দ করে ভেঙে পড়ল মেয়েটা, বাট নিটু, শি ওয়জ দ্য ওনলি পার্সন হু টুক মি সিরিয়াসলি। একমাত্র ওই আমাকে বলেছে, কেন তুমি ক্যাবারে ডান্সার হবে? ওটা ভালো জীবন নয়। তুমি স্কুল পাস করে স্টেনোগ্রাফি শেখো। ইউ আর সো বিউটিফুল অ্যাণ্ড স্মার্ট। দেয়ার ইজ আ ব্রাইট ফিউচর ওয়েটিং ফর ইউ সামহ্যোয়ার।
শেষে কফিন নিয়ে যখন সবাই রওনা হল আমার মনে হল এইমাত্র বুঝি একটা জন্মদিনের পার্টি ফুরল।
২.
শোনা যায় আব্রাহামকে খুন করার পর ঠিক পঁচিশ বছর তার ইজিচেয়ারের জীবনে বেঁচে ছিল থেলমা ব্রাগানজা। আর মেমের সেই মৃত্যুদিনের ঠিক পঁচিশ বছর পর বেহাত হওয়া পুরনো সেই মিন্টো রো-র বাড়ির ছাদে এসে দাঁড়িয়েছে নিতু। থুড়ি আমি। থুড়ি নিতু। না, না, আমি। আমার নিতুর মধ্যে কেন যে হঠাৎ হঠাৎ এরকম দেয়াল তুলে দিই আমি…থুড়ি তুলে দেয় নিতু, আমি বুঝি না। থুড়ি নিতু বোঝে না, বা আমি বুঝি না নিতু কেন বোঝে না। কিন্তু এই মুহূর্তে, এই তারকাখচিত সন্ধ্যার তারার অন্ধকারে আমি আর নিতু দিব্যি এক হয়ে স্মৃতি ভাগাভাগি করে ভাবছি আর দেখছি বুড়ি ব্রাগানজার অন্ধকার ঘর, তার উপরে আরেক অন্ধকার ঘর— লোরেন সুইন্টনের। যেখানে কোনো রেকর্ডের বাজনা নেই। রূপসীর নাচ নেই, সদ্য-যুবতী দুধসাদা শরীরের ব্যঙ্গ, কটাক্ষ বা ছুরি নেই। অথচ এই অন্ধকারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে রক্তপাত হচ্ছে আমার ভিতর। আমাদের বাড়িটা মারোয়াড়ির হাতে পড়ে কুৎসিত মকান হয়ে গেছে, পাশের বাগানেও বাড়ি গজিয়েছে। লোরেনদের এজমালি বাড়িটা কিন্তু অবিকল সেই আগের মতো, শুধু সে-দিনের কোনো বাসিন্দাই আজ আর নেই। বাড়িটার সেরা বাসিন্দা, বিখ্যাত লোরেন সুইন্টন, থুড়ি ইন্টারন্যাশনাল ক্যাবারে ড্যান্সার লাশিয়াস লোলা, গত রাতে দিল্লির পাঁচতারা হোটেলের স্যুইটে অতিরিক্ত ঘুমের বড়ি খেয়ে দেহরক্ষা করেছে। আমার স্ত্রীই আমার দিকে সকালে খবরের কাগজটা বাড়িয়ে দিয়ে বলেছিল, হ্যাঁগো, এই তোমাদের সেই লোরেন সুইন্টন না? আমি খবরটার শেষলাইন অবধি পড়তে পারিনি। এখনও আশা রাখি ওর সঙ্গে একটা শেষ মোলাকাতের। আমার প্রতিহিংসাপরায়ণতার একটা জবাব আমি সেই থেকে আশা করে আছি। পুরো পঁচিশ বছর।
