বলল, হাউ সুইট মাই ডার্লিং! হাউ সুইট! আমি বললাম, গুড ডে ম্যাম!
বুড়ি বলল, গুড ডে। তারপর ঝট করে আমার বাঁ কাঁধটা বাগিয়ে ধরে খিঁচিয়ে উঠল, বাট কান্ট ইউ বিহেভ ইয়োরসেলফ ইন দ্য ইভনিং!
আমি থতমত খেয়ে গিয়েছিলাম। আমতা আমতা করে বললাম, কেন, কী হয়েছে? বুড়ি ব্রাগানজা ওর ঝোলা থেকে একটু ললিপপ বার করে আমার দিকে বাড়িয়ে বলল, ধরো। আমি মাথা ঝাঁকিয়ে বোঝালাম, চাই না। বুড়ি বলল, বয়স কত? ললিপপ ফেরত দিচ্ছ যে বড়ো!
বললাম, তেরো, গোয়িং অন ফোর্টিন। বুড়ি মুখে তাচ্ছিল্যের ভাব এনে বলল, আর রোজ সন্ধেয় ওই সব্বোনেশে ধিঙ্গি মেয়েটার রকমসকম দেখছ ফ্যালফ্যাল করে? ওটা কি নাচ হয়? ও তো স্রেফ অসভ্যতা। ও কি ভদ্রলোকের দেখার জিনিস? যেমন মা একটা হোর, তেমনি তৈরি করেছে মেয়েটাকে। তুমি ভালোবাড়ির ছেলে বাপু—
বুড়ি আরও কী সব বলছিল, আমার আর ধৈর্যে ধরেনি। আমি পোঁ পোঁ দৌড়েছি বাড়ির দিকে। খানিকটা মাখনও কলাপাতার থেকে ঠিকরে পড়েছে ট্রামলাইনে।
সন্ধ্যেবেলায় চিলেকোঠার জানালা খুলতে গিয়ে কী ভাষণ দুপদুপুনি বুকের ভিতর। নাচ তো হবে দোতলায়, কিন্তু নীচে অন্ধকারে বুড়ি ব্রাগানজা যে ইজিচেয়ারে বসে কী শাপ-শাপান্ত করবে কে জানে! মুশকিল হল যে বুড়িটা ঘরের আলোও জ্বালে না;অন্ধকারে প্যাঁচার মতো বসে জগৎ পাহারা দেয়। যখন পুরোদমে ন্যাট কিং কোল আর হ্যারি বেলাফন্টে বাজছে আর লোরেন ওর নতুন-শেখা দুর্ধর্ষ সব স্টেপস প্র্যাকটিস করছে আমার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল। আমি আস্তে করে ঘরের আলো নিভিয়ে দিয়ে জানলা খুলে দিলাম। বুড়ি ব্রাগানজার অন্ধকারের বিরুদ্ধে আমার হাতিয়ার এই অন্ধকার।
কিন্তু জানলা খুলতেই ওই ভীষণ দৃশ্যটা ঘটল। দেখি আজ আর থেলমা ব্রাগানজা ঘর অন্ধকার করে বসে নেই, ঘর এবং উঠোনের বাতি জ্বালিয়ে পায়চারি করছে আর থেকে থেকে উপরের ফ্রেঞ্চ উইণ্ডো আর লাগোয়া সিঁড়ির দিকে আগুনে দৃষ্টি হেনে বলছে, ডোন্ট ইউ ডেয়ার মেস উইথ দ্যাট ইনোসেন্স, ললিপপ কিড। যেমন মা একটা বেশ্যা, তেমন তৈরি হচ্ছে মেয়ে। যা মরগে যা ক্যাবারে ডান্সার হয়ে, তাই বলে নিষ্পাপ ছেলেটার মাথা খাবি। আর তাই দেখতে হবে আমায় এই মরণকালে বসে বসে?
কতক্ষণ এভাবে চলল জানি না, শেষে লোরেনই স্রেফ একটা বাথটাওয়েলে স্পাইরাল সিঁড়ির মাথায় এসে দাঁড়াল। নর্তকীরা নাচ শেষে যেমন ভঙ্গিতে বাও করে তেমন একটা কিছু করে বলল, নিটু ইজ ইন্টেলিজেন্ট ইনাফ টু নো হোয়ট আই ডু হিয়র ইন দ্য ইভনিং। ও চাইলে ওর জানলা বন্ধ রাখতেই পারে। আমার ধারণা আমার শরীরটা ওর দেখতে খারাপ লাগে না।
তারপর এক দমফাটা হাসি লোরেনের, যেন চোদ্দখানা কাচের গেলাস একসঙ্গে ভেঙে পড়ল মাটিতে। ব্রাগানজা ফের কীসব বলছিল উলটোদিকে মুখ করে, লোরেন ফের বলল, আন্টি, তুমি ডাক্তার দেখাও না কেন? সেই জন্ম থেকে দেখে আসছি চেয়ারে বসে দিন কাটাচ্ছ। তোমার রাতে নিজের বিছানায় শোওয়ার ইচ্ছে হয় না?
এই শেষ কথাটায় ভেঙে পড়ল বুড়ি। হাউহাউ করে কেঁদে উঠে ঢুকে গেল ভিতরে, আর তারপরই ঝপ করে গোটা নীচের তলাটা অন্ধকার। কী এক অব্যক্ত ভয়ে আর দুঃখে বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল আমারও। আমাদের মতো পাড়ায় কোনো বাড়িরই গোপন কথাটা খুব বেশিদিন গোপন থাকে না। সব সত্যি পুরোপুরি না বেরুলেও মিথ্যে, কল্পনা আর গুজব দিয়ে তাদের ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বাইরে বার করা হয়। এসব পাড়ায় আমরা ছেলেপুলেরা বড় তাড়াতাড়ি পেকে যাই। ছেলেদের সম্পর্কে মেয়েদের, আর মেয়েদের সম্পর্কে ছেলেদের কৌতূহল এখানে খুব গভীর। আর বড়োদের জীবনের অদ্ভুত অদ্ভুত সব ব্যাপারস্যাপারও আমরা কী করে, কী করেই না জেনে যাই। যেমন মণিদা কবে ছাদ ডিঙিয়ে চুমু খেয়ে এসেছে ব্রততীকে, উকিল দ্বিজুকাকা কীসব ব্লু ফিলম চালিয়ে দেখে মাঝরাত্তিরে, মুদি ফণীকাকু নাকি কাজের মেয়েদের মুড়ি-চানাচুর খাইয়ে কীসব করে, আর…কত বলব এ সব, এর কি শেষ আছে?
তেমনি একটা সত্য কিংবা মিথ্যে চালু আছে থেলমা ব্রাগানজাকে নিয়েও। ব্রাগানজা আর তার ইজিচেয়ার। থুড়ি, ব্রাগানজা আর তার পরিত্যক্ত বিছানা। আজ মৃত্যুতেও সে-বিছানায় শোয়ানো গেল না মেমসাহেবকে।
এতক্ষণ ওর বটের ঝুরির মতো ভুরু চুলের ফাঁক দিয়ে পিটপিট করে কফিনে-বসা মেমসাহেবকে দেখছিল পরসাদি। পাড়ার জমাদার। বাবুদের পায়খানা সাফ করা তার কাজ, কাউকে হাত দিয়ে স্পর্শ করা ওর অধিকারের অতীত। মেরেধরে শোয়ানো যখন গেলই না তখন মিনমিন করে ওকে বলতেই হল, শায়েদ ইয়ে কোই জিন কা মামলা হ্যায়। ঝাড়ফুকসে কাম হো যায়েগা।
আমার বিজ্ঞানমনস্ক কাকা এতক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কী ভাবছিল কে জানে, পরসাদির কথায় যেন ওর চটকা ভাঙল। বলল, না। এবার রওনা দেওয়াই ভালো। এ বার প্রসাদীর ঝাড়ফুকের খেলা শুরু হবে। বলেই বাড়ির দিকে পা চালাল কাকা।
ফাদার মাস্কারেনহাস বললেন, আই কান্ট স্ট্যাণ্ড উইটনেস টু আ ডেভিলস ডান্স। আই মাস্ট লিভ অ্যাট ওয়ানস। কাম মি হোয়েন দ্য পুওর সোল হ্যাজ বিন লেড টু দ্য কফিন।
ভড়কে গিয়েছিল বুড়ির ছেলে সিরিল আর ক্লাইভও। কিন্তু এগিয়ে এল ডেবরা, সিরিলের বউ। বলল, পরসাদি, যো করনা হ্যায় ও করো। মগর মা’ জিকো কফিনমে সুলানা হ্যায়। অউর জলদি করো।
