পাবক ঘরের দোরগোড়ায় আসতেই কাকি ছুটে এসে পাবককে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল। পাবক বলল, কাকি, ছাড়ো। আমি বাবার কাছে যাব। কাকি ওকে হাত ধরে এনে বসিয়ে দিল বাবার মাথার কাছে। পাবক মাথা নীচু করে বাবার মুখের কাছে কান এনে শুনতে চাইল বাবা কিছু বলছে কি না।
—হ্যাঁ, সত্যি! বাবা কথা বলছে। বাবা বলছে, পাবক, কী মজা বলো?
পাবক ফিসফিস করে বলল, তাই তো?
পাবক, আমি সবসময় এমনি করে তোমার কাছে আসব, রাজি তো? পাবক ফের ফিসফিস করে বলল, হ্যাঁ।
পাবক, এরা খুব কান্নাকাটি গোলমাল করছে। আমি কাল ফের তোমার কাছে আসব। তুমি কিন্তু ভালোভাবে থাকবে। না হলে আমার কষ্ট হবে।
পাবক ফের ফিসফিস করে বলল, না বাবা। আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি। আমি আর কোনোদিনও তোমার কথা অমান্য করব না। কিন্তু তুমি না এলে আমি খুব রাগ করব। তখন আমি কাঁদব।
কাকা এবার বড়ো দুটো মালা এনে বাবার গলায় পরিয়ে দিল। পাবক মাথার কাছ থেকে সরে গিয়ে বাবার পায়ের কাছে বসল। আর বাবার ধবধবে সাদা পা দুটোয় আস্তে আস্তে করে হাত বোলাতে লাগল। বাবার আরাম হবে এতে।
পুরোনো অন্ধকারে
সবশেষে এল পাড়ার কাচ্চাবাচ্চারা আর বুড়ো পরসাদি।
আমরা বাচ্চারা দেখছি এক পেল্লায় কফিনবাক্সে মেজাজে গ্যাঁট হয়ে বসে আছে বুড়ি মেমসাহেব ব্রাগানজা। আর বটের ঝুরির মতো ভুরুর চুলের ফাঁক দিয়ে পিটপিট করে সবকিছু দেখে পরসাদি বলল, আরে ও মেমসাহিবকো সুলানা আসান নেহি হোগা।
মরে গিয়েও থেলমা ব্রাগানজা শোবে না, এ আবার কী! তা হলে তো যে ইজিচেয়ারে পঁচিশ বছর ধরে মেমসাহেব কী দিন, কী রাত বসে কাটাল তাতে করেই ওকে গোর দিলে হত। এই কফিন-ফফিন এনে হত টানাহ্যাঁচড়ার কী দরকার ছিল?
বড়োছেলে সিরিল বলল, নো নো, ড্যাট য়োন্ট ডু। মাডার মাস্ট স্লিপ ইন কফিন। অর হাও গড উইল টেক হার আপ? বলেই সিরিল বুকে ক্রসচিহ্ন আঁকল। সিরিল সবসময় ‘দ’-কে ‘ড’ উচ্চারণ করে দেখে আমরা ছোটোরা যারা হাসি তারা আজ কিন্তু হাসলাম না। গোটা মিন্টো লেন আজ সকালে থ মেরে আছে বুড়ি ব্রাগানজার মৃত্যুতে। সব জাতের লোকরাই এক এক করে আসছে আর শোকদৃশ্যের বদলে একটা আজব ব্যাপার দেখছে।
যাকে কফিনে বয়ে নিয়ে যাওয়া হবে গোরস্থানে সে কফিনে শুচ্ছেই না। ফাদার মাস্কারেনহাস তাঁর গোল গোল সোনালি চশমাটা চোখ থেকে নামিয়ে রুমালে মুছতে মুছতে বললেন, এভরিথিং ইজ হ্যাবিট, মাই ডিয়ার। পুওর সোল হ্যাজ নট স্লেপ্ট অন আ বেড ফর এজেস। বাট টুডে শি মাস্ট স্লিপ।
মাস্ট স্লিপ তো বটেই, কিন্তু শোয়াবে কে? পাড়ার মুদি ফণীকাকা ফিসফিস করে বলল, আশ্চর্য! শেষ নিঃশ্বাস ফেলার পরও মাথাটা হেলে পড়েনি। তবে কি দানোয়-টানোয় পেল? সত্যি মরেছে তো মেমসাহেব?
এর মধ্যে হন্তদন্ত হয়ে ঢুকল ক্যাম্বেলের ছোকরা ডাক্তার বরেন, যে নাকি পেটের রোগেও পেনসিলিন ঝাড়ে। বয়স্করা কেউ বলে পিছনপাকা, কেউ আকাট মুখ। সেই বরেন এসে বলল, লকড জয়েন্ট। হাড়ে হাড়ে খিল খেয়ে গেছে, লাঠিটাঠি দিয়ে পিটিয়ে লক ছাড়াতে হবে।
রুখে দাঁড়াল সিরিল, হোয়াট রাবিশ! আই হিট মাই ডিয়ার মামি আফটার শি’জ ডেড? ইউ ক্রেজি! সিরিলের বউ ডেবরা এবার ডুকরে কেঁদে উঠল, আর তাই শুনে সারাবাড়িতে জমায়েত সমস্ত খ্রিশ্চান সাহেব-মেম, কাচ্চাবাচ্চা জোরে জোরে নিজেদের ক্রস করতে লাগল।
আমার মনে পড়ল সেইসব সন্ধ্যে যখন ছাদের পড়ার ঘরের জানলা খুলে অপেক্ষায় থাকতাম কখন পিছনের অ্যাংলোবাড়ির দোতলায় গ্রামোফোনে এলভিসের রেকর্ড চাপিয়ে আপনমনে নাচ শুরু করবে লোরেন। লোরেন সুইন্টন। সুইট সিক্সটিন অ্যাণ্ড র্যাভিশিং।
দিদির সঙ্গে লোরেটোয় পড়ে লোরেন, সামান্য এ প্লাস বি হোলস্কোয়্যার ফর্মুলাও দিদিকে দেখিয়ে দিতে হয়। ও শুধু বলে, আফটার অল, আমি তো আর স্কুল লিভ করা অবধি পড়ছি না। অ্যাজ সুন অ্যাজ আই টার্ন অ্যাডাল্ট আই অ্যাম গোয়িং টু বি আ ক্যাবারে ড্যান্সার।
অ্যালজেব্রা বুঝিয়ে দিদি ওর কাছে নাইট ক্লাব, ক্যাবারে, বেলি ড্যান্সি, ফক্সট্রট, পোল্কা, ডাইভ, শেকের গল্প শোনে। তারপর বাড়ি ফিরে এসে সেইসব রহস্যের কথা উগরে দেয় আমার উপর। শেষে কখনো বলতে ভোলে না, নিতু, প্লিজ কাউকে বলিস না। তা হলে ওর সঙ্গে মেশা বন্ধ হয়ে যাবে। আমি সাততাড়াতাড়ি শুনিয়ে দিই, তুই খেপেছিস, দিদি?
কিন্তু যেটা দিদিকেও সাহস করে বলি না তা হল ওই লোরেনের কেরিয়ারের প্রস্তুতি আমি রোজ একটু একটু দেখতে পাই সন্ধ্যেকালে। যখন আকাশে তারা ফোটে, পাড়া অন্ধকার হয়, সবাই ভিতরে ঘরের আলোর দিকে তাকায়, আমি চিলেকোঠার জানলা দিয়ে অন্ধকার দেখি আর মিনিট গুনি কখন বিশেষ একটা বাড়ির ফ্রেঞ্চ উইণ্ডো ঝপাংসে খুলে যাবে, গ্রামোফোন থেকে মধুর সুরে গেয়ে উঠবে এলভিস প্রেসলি বা প্যাট বুন, আর একটি ষোড়শী সুন্দরী কখনো গাউন, কখনো শোওয়ার নাইটি, কখনো বা স্রেফ বড়ো বাথ টাওয়েল পরে নাচ শুরু করবে সেই ধ্বনিতে। একদিন এভাবেই একটা তোয়ালে পরে নাচার সময় তোয়ালেটা খুলে পড়ে গিয়েছিল লোরেনের। আর তখন ওই দুধসাদা মেয়েটাকে ওভাবে দেখতে দেখতে…।
না, থেলমা ব্রাগানজার মৃতদেহের পাশে দাঁড়িয়ে আমি ওই দৃশ্য মনে মনেও দেখতে পারি না। আমি কি ভুলে গেছি কী বলেছিল বুড়ি একদিন আমাকে ইন্টালি মার্কেটে রুটির দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে? আমি দু-পাউণ্ড রুটি আর আট আনার মাখন কিনে খুচরোর জন্য অপেক্ষা করছি, পিছন থেকে কাঁধে একটা চাপড়। ঘুরে দেখি বুড়ি ব্রাগানজা।
