মুনসির স্বপ্নের মধ্যে এত কাজ ছিল যে, ওর জেগে থাকলে সমস্ত দিনটাই মাটি হয়ে যেত। প্রায়ই বাবুকে বলত, কাল রাতে বাবুজি আমি লালির গা থেকে চারটে খারাপ পোকা ফেলে দিয়েছি। ওগুলো থাকলে ওর খুব কষ্ট হয়। ছটফট করে। চোখ দিয়ে জল পড়ে।
কিন্তু হায়! মুনসি তো গরিব ছেলে। মা-বাবা নেই। শুধু স্বপ্ন দেখলে কি আর পেট চলবে? লোকের বাড়ি খেটে খেতে হত। তাও তো বাবা ওকে কম কাজ দিত। বাকি গল্প বলা আর স্বপ্ন দেখা।
শেষে ওর খুব কাশি হত। বাবা ওষুধ দিত ওকে আর বলত, তুই ঘুমো এখন মুনসি। বাজে বকিসনি বেশি।
মুনসির চোখ বন্ধ দেখলেই পাবক বুঝত ও পরির স্বপ্ন দেখছে। মুখে তখন ওর একফোঁটা হাসিও লেগে থাকত। যেরকম হাসি আজ বাবার মুখে পাবক দেখল।
বাবা বলল, পাবক, তুমি পাহাড় দুটো আমাকে দাও। ওগুলো মুনসির দেশে নিয়ে যাব আমি। ওকেই ফিরিয়ে দেব ওর পাহাড়।
পাবক বলল, তুমি কী করে পেলে মুনসির পাহাড়?
—ওই দেশেই তো গেলাম আমি গত পরশু দিন।
–বারে! সবাই যে বললে তুমি হাসপাতালে গেলে! ওই হলদে গাড়ি তো হাসপাতালের।
—ধুত্তোর! ওরা কিসসু জানে না। আমায় তো গাড়িতে শুইয়ে দিল। তারপর যেই না গাড়ি ছাড়ল আমি টুপ করে নেমে পড়ে মুনসির কাছে চলে গেলাম।
—ঠিক হয়েছে? ঠিক হয়েছে! বেশ হয়েছে। কাকুরা কী বোকা! তা বাবা মুনসি তোমায় আমার কথা কিছু বলল না?
—বললই তো। কত কথা বলল। ও-ই তো আমায় পাহাড় দুটো দিল তোমায় দেখাতে। আবার ওগুলো ফিরিয়ে দেব ওকে। ও শুয়ে শুয়ে দেখবে।
-কেন বাবা, ও কি আর ঘুরে-বেড়ায় না?
—পাবক যখন চলে আসে মুনসি তখন ঘুমোচ্ছিল। বোধ হয় পরিকেই দেখছিল চোখ বুজে। তার আগের রাত্তিরটা ও ঘুমোতেই পারেনি। শুধু কাশছিল। পাবক ওর গরম দুধটা মুনসিকে দিয়েছিল। কিন্তু মুনসি খাবে কি! ওর খুব ঠাণ্ডা লাগছিল।
পরদিন পাবকদের চলে আসার কথা। বাবা মুনসিকে আপেল, নাসপাতি কিনে দিল। ব্যোমবাহাদুরকে টাকা দিল। বলল, মুনসিকে ভালো ভালো খাবার দেবে।
কিন্তু সেদিন পাবকের যাওয়া হল না। কোত্থেকে একটা গাড়ি এল মুনসিকে নিতে। মুনসির যে গাড়ি আছে আগে কখনো পাবক জানত না। বাবা বলল, ওটা পরিবিবির গাড়ি। মুনসিকে নিতে এসেছে ওরা।
মুনসিকে যখন গাড়িতে শুইয়ে দিল, তখন সবাই খুব চুপ ছিল। বাবা কেন কাঁদল? কই পাবক তো কাঁদেনি! মুনসি তো চাইত পরির কাছে যেতে। তবে ওর বাবাকেও খুব ভালো লাগত। বলেছিল, বাবুজি, আমাকে তোমায় দেশে নিয়ে চলো। আমি পাবকজির সঙ্গে থাকব।
বাবা কিন্তু তাকে নেয়নি। তা হলে ও যখন পরির কাছে চলে গেল বাবা তখন কাঁদল কেন?
পাবক কান্নাটান্নাও পছন্দ করে না। শুধু বাবা বকলে কি বাড়ি ফিরতে দেরি করলে ওর বুকে কীরকম একটা ব্যথা হয়। চোখে জল আসে। তবে ও বুঝেই পায় না নূপুর, মিঠুদি, গৌরী ওই রকম ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে দিনরাত কাঁদে কী করে?
আবার আজ দু-দিন ধরে কাকু-কাকি গিরিবালাও একটু-আধটু কাঁদে। ওদের কী হয়েছে গো?
পাবক পাহাড় দুটো বাবাকে ফেরত দিল। মুনসি ঠিকই বলেছিল—এখন যখন সূর্য ডুবে গেছে ওই একটা পাহাড় কীরকম নীল লাগছে। ও পাহাড়টা সেবার দেখা হয়নি ওদের।
ছাদে আর আলো নেই। কিন্তু পাবকের একটুও ভয় করছে না। বাবার হাঁটুতে থুতনি ঘষতে ঘসতে বলল, বাবা, আমার কি কোনোদিন মা ছিল না? আমার কেন মাকে মনে পড়ে না?
কিন্তু বাবা কথা বলার আগেই নীচে কীরকম একটা চেঁচামেচির আওয়াজ। নিশ্চয়ই কাকি জোরে জোরে কাঁদছে। হ্যাঁ, তাই তো! গিরিবালাও কাঁদছে। কাকু বোধ হয় ‘পাবক পাবক’ করে ডাকছেও।
পাবক বলল, বাবা চলো নীচে যাই। আমার আর ছাদে ভালো লাগছে না।
অন্ধকার সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে পাবক জিজ্ঞেস করল, বাবা ওরা সব কাঁদছে না? বাবা বলল, হ্যাঁ, তাই তো!
-কেন ওরা কাঁদছে কেন?
—ওরা তো বোকা। ওরা ভাবছে আমি মরে গেছি।
–কেন বাবা, তুমি কেন ওদের কাছে যাও না? ওদের কারোকে আদর দাও না?
-–ওরা যে বোকা, পাবক। ওদের কি আমি আদর করতে পারি! ওরা শুধু বলে ‘টাকা দাও, টাকা দাও। তোমার মতো ওরা কি আমায় ভালোবাসে?
পাবক এবার পুরো ব্যাপারটা বুঝে ফেলেছে। তাই বাবার হাত শক্ত করে ধরে সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগল। ভাবল ওরা এখন ‘মরে গেছে, মরে গেছে’ করলেও পাবক আর অবাক হবে না।
সিঁড়ির শেষ ধাপেতে এসে বাবা পাবককে জাপটে ধরে জোরে জোরে চুমু দিল। ওর চুলে হাত বোলাল। নাকের ওপর গোল গোল চশমাটা সোজা করে দিল। তারপর বলল, পাবক, একটু লুকোচুরি খেলবে? পাবক বলল, কীরকম?
তুমি নীচের ঘরে গেলে দেখবে আমি চোখ বুজে খাটে শুয়ে আছি। যেরকম মুনসি শুয়েছিল সেদিন। কিন্তু কাউকে বলবে না-ওটা কিন্তু আমি না। আমি এইখানে তোমার পাশে…বাবা তার উষ্ণ হাতটা পাবকের গালে রাখল। তারপর বলল—ওরা কিন্তু ভাবছে আমি ওটাই। আসলে আমি ওদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলছি। ওটা নকল খেলা। আসল খেলা আমার তোমার সঙ্গে। মুনসির সঙ্গে।
তারপর বাবা আরও কাছে এসে পাবকের কানে কানে বলল, ওরা কাঁদছে কাঁদুক। ওরা বোকা। তুমি কিন্তু একটুও কাঁদবে না। তুমি কাঁদলে আমারও কান্না পাবে। আর এই খেলাটা নষ্ট হয়ে যাবে।
পাবককে একতলার বৈঠকখানার কাছে এনে বাবা হঠাৎ-ই মিলিয়ে গেল। পাবক মাথার কাছে গিয়ে চুপটি করে বসলে ওর সঙ্গে কথা কইবে। আর কেউ ওই সব কথা শুনতেই পাবে না। ওরা শুধু কাঁদবে।
