বাবা বলল, তুমি পড়া করেছিলে আজ?
পাবক মাথা নাড়িয়ে না বলল।
বাবা বলল, যাও তা হলে তোমার সঙ্গে আড়ি। তুমি খারাপ হয়ে গেছ।
বাবাকে শান্ত করতে, বাবাকে ফের হাসাতে পাবক রাঙাকাকুর মুখে শোনা আবোল তাবোল কবিতা বলল। কবিতা বলতে গিয়ে যেই কথা আটকে গেল অমনি পাবক বলল, আচ্ছা বাবা, রামগরুড়ের ছানা কীরকম দেখতে?
বাবা মোড়া ছেড়ে উঠে মাথায় শিঙের মতো করে হাত রাখল। তারপর ব্যাঙের মতো কুঁজো হয়ে ছাতে বসল। পাবক হেসে ফেলল তাই দেখে।
একটু একটু রোদ তখনও ছিল। বাবার মুখে, বাবার চশমায় সেই রোদ পড়ল। কী সুন্দর লাগছিল তখন বাবাকে দেখতে। পাবক ভাবল কারোর বাবাকে এত সুন্দর দেখতে না। কারোর বাবা এরকম রামগরুড়ের ছানা সাজতে পারে না। ওইজন্যই তো রূপা, গৌরী, মিঠুদি, নূপুর সবাই পাবকের বাবাকে রোজ দু-বেলা দেখতে আসে। টফি চাইতে আসে।
এবার পাবক নিজেও হাট্টিমাটিমটিম সাজল ছাদের ওপর। বাবা বলল, আমাকে কি রামগরুড়ের ছানার মতো গোমড়া দেখাচ্ছে? পাবক বলল, ভীষণ! তুমি হাসো তো বাবা।
বাবা হাসল। কী মিষ্টি হাসি। চশমার রোদ আর হাসি মিশে গেছে। পাবক বলল, বাবা তুমি নাচতে জানো? বাবা বলল, তুমি নাচো পাবক।
পাবক বলল, কীরকম নাচব? আমি কি নাচ শিখেছি কোনোদিন নূপুরের মতো?
বাবা বলল, এসো, এইভাবে নাচো। বলেই বাবা আওড়াতে লাগল—
চাকবুম তাকদুম চামচিকে চাকবুম।
তাধিন্না তাধিন্না ধিন ধেই ধেই তাকদুম।
তাথৈ তাথৈ ধা হেই গিরেতুম,
বুমচাক মৌচাক চাকা নেই পাগডুম।
অল্প রোদের ছাদে বাবা আর পাবক নাচল অনেকক্ষণ। শেষকালে দু-জনেই হাঁপিয়ে গিয়ে মোড়ায় বসে পড়ল। পাবক মনে মনে বলল, গিরিবালাটা কী মিথ্যুক! বলে বাবা আসবে না হাসপাতাল থেকে।
বাবার তখনও হাঁপ উঠছিল। বলল, আমি বুড়ো হয়ে গেছি। তাই না?
পাবক মাথা নাড়ল। না বাবা তুমি বুড়ো না। তোমার চুল পাকেনি। তোমার তো দাঁত পড়েনি। তুমি তো লাঠি নিয়ে হাঁটো না। তুমি তো ইজিচেয়ারে শুয়ে শুয়ে সারাদিন ঘুমোও না গৌরীর দাদুর মতো।
বাবা কিন্তু ফের নিজে থেকেই পাবকের মনের কথাটা বলে দিল। পাবক, তুমি গিরিবালার কথা বিশ্বাস করবে না। আমি তোমায় কত ভালোবাসি। আমি কি কখনো মরতে পারি?
কাউকে ভালোবাসলে বুঝি কেউ মরে না, না বাবা, পাবক জানতে চাইল। পাবক বলল, ঠিক বলেছ। যারা ভালোবাসে তারা মরে না। ভালোবাসলে তো কাছে আসতে হয়। কথা বলতে হয়। আদর করতে হয়। চুমু দিতে হয়।
বাবা উঠে এসে পাবককে চুমু দিল একটা। পাবক বলল, কিন্তু বাবা, যারা ভালোবাসে না, তারা চুমু দেয় না। বাবা বলল, তারা হিংসুটে, তারা দুঃখ পায়। তারা কি তোমার-আমার মতো গান গাইতে পারে? কখনো না।
পাবক জিজ্ঞাসা করল, তা হলে ওরাই কি মরে যায়?
বাবা বলল, যারা ভালোবাসে না, তারা মরার মতোই বেঁচে থাকে।
তা হলে মরা কী?
ভালোবাসতে না পারা। না আসা। কাছে এসে আদর না করা।
আর গিরিবালা বলল কেন তুমি মরে গেছ? তুমি তো এখন এসে আমায় আদর করলে। দুটো পাহাড় দিলে।
গিরিবালা মিথ্যুক। ওকে আমি চাকরি থেকে তাড়িয়ে দেব। ও হিংসুটে।
বেশ হবে তা হলে। তুমি ওকে তাড়িয়ে দিয়ো না বাবা, মুনসিকে নিয়ে আসবে। ও তোমাকে চা করে দেবে আর আমাকে গল্প বলবে।
আস্তে আস্তে আলো খুব কমে গেল। পাবকের একটু ভয় ভয় করছিল। তাই উঠে এসে বাবার কোল ঘেঁষে বসল। বাবা জিজ্ঞেস করল, ‘তোমায় ভয় করছে পাবক?
ছিঃ! তুমি না পুরুষ মানুষ। তোমার আবার কীসের ভয়। ভয় পায় ভীতুরা, মেয়েরা। কখনো কিছুতেই ভয় পাবে না। ভয় পেয়ে ঠাকুরকে ডাকবে, আমাকে ডাকবে। দেখবে ভয় চলে গেছে। তুমি ঠাকুরকে ডাকার মন্ত্র জানো?
হ্যাঁ। ওই যে মন্ত্রটা পিসি শিখিয়েছিল—
ভূত আমার পুত
পেতনি আমার ঝি,
রাম-লক্ষণ সাথে আছে
করবে আমার কী!
পাবক তোমাকে আমি আরও একটা মন্ত্র শিখিয়ে দিচ্ছি। এটা রোজ বলবে। ভূত কেন, তোমার কোনো ভয়ই থাকবে না।
বিপদে মোরে রক্ষা করো
এ নহে মোর প্রার্থনা,
বিপদে আমি না করি যেন ভয়।
বারেঃ অত বড়ো কথা কি আমি বলতে জানি নাকি! আমি কি ওসব বুঝতে পারি!
ওমা, তুমি কি বোকা পাবক। মন্ত্র কখনো বড়ো-ছোটো হয় নাকি? সব মন্ত্রই সমান! তুমি বড়ো হচ্ছ, তোমার তো আরও বেশি বেশি শিখতে হবে পাবক।
আচ্ছা তুমি ফের বলল, আমি শুনব।
বাবা ফের কথাগুলো বলল। তারপরের বার দু-জনেই একসঙ্গে কথাগুলো উচ্চারণ করল। পাবক এরকম বার দুই বলার পর হাঁপিয়ে গেল। তুমি না বাবা আমাকে পড়াশুনো করাচ্ছ ছাদে বসিয়ে! আর মন্ত্র বলব না।
বাবা বলল, তোমার বলতে কষ্ট হলে মনে মনেই বলবে। মনে মনে ভাববে। যেমন তোমার মুনসি মনে মনে পরির সঙ্গে কথা বলত। পরির কথা ভাবত।
পাবকের মনে পড়ল মুনসির কথা। দিনরাত পরিবিবির চিন্তা করত। ঘুমিয়ে নাকি স্বপ্নও দেখত। বাবাকে বলেছিল ওর পাহাড় দুটো সবচেয়ে পরিষ্কার, কারণ ও স্বপ্নে বালতি বালতি জল ঢেলে ওর পাহাড়গুলোকে চান করাত।
পরিও নাকি আবির এনে লালির গায়ে ছড়াত। নীল কালির তুলি বোলাত নীলির উপর। আর যেইবার বৃষ্টিতে সব ধুয়ে গেল, পরিবিবি তিন দিন তিন রাত্তির রংচটা গাছের ডালে বসে কেঁদেছিল।
তখনই তো মুনসি খুব দুঃখ পেল। আর ঘুমিয়ে গিয়ে স্বপ্নে স্বপ্নে ফের পাহাড়গুলো রং করে দিল।
