মুনসি পাবকের থেকে একটু বড় ছিল। পাবককে দেখে তারও মুখটা চকচক করে উঠল। বলল, আমি তো কাম করব।
পাবক ধমকে দিল ওকে, কাম কীরে! আমার মতো কথা বলতে পারিস না?
সেদিন সন্ধ্যেবেলায়ই মুনসি বাবা আর পাবককে ওর পাহাড়ের কথা শুনিয়েছিল। ওর নাকি একটা লালপাহাড় আর একটা নীলপাহাড় আছে। একটার নাম লালি, আরেকটার নাম নীলি। আর ওর পরিবিবি ওই লালপাহাড় দিয়ে আসত সকালে চুনারি বাগানের ফুল তুলতে, মালা গাঁথতে। কেউ তাকে দেখতে পারত না এক মুনসি ছাড়া। ফুলের মালার একটা বিবি নিজে পরত। অন্যটা একটা ছোটো রংচটা গাছকে পরাত। বিবি রোজ তিনটি করে ফুল দিত মুনসিকে। একটা সাদা, একটা হলুদ, একটা সবুজ। তারপর বিবি রংচটা গাছটার ডালে বসে পা ঝুলিয়ে গান গাইত। নীচে থেকে মুনসি তাই শুনত।
আবার যেই সূর্য ডুবে গেল, অমনি বিবি তড়িঘড়ি করে নীল পাহাড়ের চুড়ো বেয়ে নিজের দেশে চলে যেত।
মুনসি কতবার বলেছে, বিবিজি, আমায় নিয়ে চলো তোমার সঙ্গে। পরি বলত, ছিঃ! তোর ওই নোংরা ফাটা জামা। তোকে দেখলে আমার ভাই-বোনেরা হাসবে।
মুনসি বলত, তা হলে আমায় নতুন জামা দাও। তখন বিবি খিলখিল করে হেসে ফেলত। মুনসির কোঁকড়ানো চুল ধরে আদর করে দিত। বলত, না না, তুই এইখানেই থাক। আমি রোজ তোকে দেখতে আসব।
এই সব শুনে পাবক বলত, মিথ্যুক কোথাকার। পরির দেশের মেয়ে তোকে দেখতে আসত, মিছে কথার জায়গা পাস না।
বাবা পাবককে থামিয়ে দিত। ছিঃ! পাবক। পরিবিবি আসত হয়তো। তুমি তো দেখোনি। আর মুনসি তোমায় মিথ্যে কথা বলবে কেন। কী বল মুনসি?
মুনসি ততক্ষণে কেঁদে ফেলত। এক বাবা ছাড়া কেউ কোথাও ওর কথা বিশ্বাস করে না। মুনসি তাই পাবকের দিকে ভীতু চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে বাবাকেই বলত, সত্যি বলছি বাবুজি, পরি আমায় দেখতে আসত।
বাবা বলত, সে আর তোকে দেখতে আসে না? অমনি মুনসির কথা শেষ হয়ে যেত। মাথা নীচু করে বসে থাকত। তারপর কোনো একসময় বাবার চায়ের কাপ-ডিস তুলে নিয়ে রান্নাঘরে চলে যেত।
মুনসি ঘর থেকে বেরোলেই পাবক জোরে চেঁচিয়ে উঠত, ‘মিথ্যুক!’
পাবকের ভারী রাগ হত। পাবক নিজেই কোনোদিন পরি দেখতে পেলে না। আর মুনসিকেই সব পরি দেখা দেয়।
একদিন কিন্তু পাবকের কথা শুনেও মুনসি কাঁদল না। বাবার কানের কাছে উঠে এসে ফিসফিস করে বলল, তুমি কাউকে বলবে না তো বাবুজি! কাউকে বোলো না যেন। ওই পরিবিবি না অনেকদিন আগে চলে গেছে। আর আসে না। কথাটা পাবক শুনে ফেলেছিল। কথাটা শুনে খুব মন খারাপ হয়ে গেল ওর। মাঝে মাঝে পাবক ভাবত মুনসিকে বলবে পরির সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিতে। কিন্তু লজ্জা পেত মিথ্যুকটাকে কোনো কিছু বলতে।
বাবা জিজ্ঞেস করল মুনসিকে, কেন, কী হয়েছিল তার পরির? রাগ হয়েছিল তোর ওপর?
মুনসি মাথা নাড়ল। না বাবু, বিবির বিয়ে দিয়ে দিল ওর বাবা, অন্য দেশের এক পরির ছেলের সঙ্গে।
এবার মুনসি হেসে ফেলল। বাবাকে বলল, তুমি দেখবে আমার পাহাড়?
পরের দিন সকালে পাবক, বাবা আর মুনসি পাহাড় দেখতে গেল। অনেক, অনেক হেঁটেছিল ওরা। একসময় একটা ঝোপের উপর দাঁড়িয়ে পড়ে মুনসি বলল, পাবকজি, ওই দেখো লালি।
একটা পাহাড়ের পাশ দিয়ে আর একটা মিষ্টি দেখতে পাহাড়। তার উপর সকালের লাল রোদ পড়েছে। পাহাড়টা সত্যিই লাল।
পাবক দুঃখ পেয়েছিল। তা হলে তো মুনসি মিথ্যে বলেনি। ওর পরিবিবিও সত্যি! ভীষণ রাগই হল পাবকের। বলল, তোর নীলি কোথায়?
মুনসি মাথা চুলকোচ্ছিল। বলল, সূর্য না ডুবলে তো নীলিকে দেখা যায় না পাবকজি। ভারি চিন্তায় পড়ে গেল পাবক। বাবাও দেখি কিছু বলে না।
একটু পরে ওরা হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির দিকে এল। সারা রাস্তা কী বকবক করছিল মুনসিটা। পাবকের ইচ্ছে করছিল জোরে জোরে ওর কান মুলে দেয়। যেভাবে মিঠুদি পাবকের কান চিমটে দেয় এক্কা-দোক্কা খেলার সময় ঘর চুরি করলে।
ওই মিঠুদিই আবার পাবকের নাকের ওপর ঝুলে-পড়া চশমা সোজা করে দেয় দোলনা চড়ার সময়।
পাবক চশমাটা এবার নাকের ওপর সোজা করে বসাল। বাড়ির বারান্দায় বসে মুনসি ফের ওর পরির গল্প বলবে। বাবা, পিসেমশাই সব খাওয়া-দাওয়া করে বেরোবে। পিসি সোয়েটার বুনবে। হাকিম ঘুমোবে। শুধু পাবক মন দিয়ে মুনসির গল্প শুনবে।
.
বাবা কেন মুনসির কথা বলছে? বাবার কি ওকে খুব ভালো লাগত। তা হলে আনল না কেন ওকে সঙ্গে করে এদেশে? ও তো আসবার জন্য কত কাঁদল; ব্যোমবাহাদুরও তো বলল নিয়ে যেতে ওকে। বাবাই তো কেবল আনতে চাইল না।
পাবক বাবার মুখের দিকে তাকাল। বাবা, মুনসিকে আনলে না কেন?
বাবা ফের হাসল। বলল, ওর তো শরীর খুব খারাপ ছিল। ওই দেশেই ও ভালো আছে। এখানে কি ও পাহাড় দেখতে পেত?
পাবক বলল, আমিও তো কতদিন পাহাড় দেখিনি। রোজ রোজ তো শুধু ঘুড়ি দেখি, আর গৌরীদের বাড়ির শিউলি গাছটা, আর নূপুরদের বাড়ি…
বলতে বলতে বাবা পকেট থেকে দুটো ছোট্ট ছোট্ট পাহাড় বের করল। একটা লাল, আরেকটা নীল। পাবক আনন্দে লাফিয়ে উঠল মোড়া থেকে। দাও, দাও ওগুলো আমাকে, বলে বাবার মোড়ার পাশে গিয়ে বসল।
বাবা পাহাড় দুটো পাবকের হাতে দিল। পাবক দিনের শেষ বরাদুরে পাহাড় দুটো অবাক হয়ে দেখল! যেভাবে মুনসি ওর পাহাড় দেখত। দেখতে দেখতে হাসি ফুটল পাবকের মুখে। বাবারও।
