আচ্ছা, মনে না পড়লেই কি লোকে বলে, ও লোকটা নেই, কিংবা সেই মেয়েটা নেই? ওই বুড়ো ধোপাটা, মানে পরসাদী, ওকে তো পাবকের ভীষণ মনে পড়ে। কিন্তু লোকে যে বলে পরসাদী নেই? অবশ্য পরসাদীও আজকাল পাবকের প্যান্টুলুন কি বাবার লুঙ্গি পায়জামা নিতে বা দিতে আসে না। ওর মেয়েটা আসে। আবার খুকসিকে নাকি পাবক মেরেছে। খুকসি নাকি মরে গেছে। কিন্তু খুকসিকেও তো পাবক ভুলতে পারে না।
তা হলে হলটা কী? বাবা মারা গেছে মানে?
পাবক চুপি চুপি ছাদে উঠল। ছাদে একলা উঠলে বাবা রাগ করে। নিশ্চয় হাসপাতাল থেকে এসেই হাঁক দেবে, পাবক, তুমি কোথায় গেছ? ছাদে? আবার ছাদে! তোমার টফি বন্ধ।
পাবকদের ছাদে আলসে নেই। তাই তো বাবার অত ভয়। কিন্তু বাবা কি জানে না সন্ধ্যেবেলা পাবক নিজেও ছাদটাকে ভীষণ ভয় পায়। চাকর রঙ বলে ছাদে ভূত নাচে রাত্তির বেলা। ছেলেপুলের ঘাড় মটকে দেয় যে ভূতগুলো। তার ওপর পাবকদের ছাদের ভূতগুলো নাকি চাকরভূত। মানে যেগুলো বড়ো ভূতদের ফাইফরমাশ খাটে। রঙ বলে, রূপাদের ছাদে একটা জমিদার-ভূত থাকে। রাত দশটায় ধিকিম ধিকিম আলো ছড়িয়ে হুঁকো খায়।
কিন্তু বাবা এখনও ডাকেনি। এখন থেকে ছাদে বসতে পাবকের একটু একটু ভয় করে। এমন দেরি করার কথা তো ছিল না। বাবা! তুমি মিছিমিছি দেরি করলে। এখন আমার কীরকম ভয় করছে?
অবিশ্যি বাবা গেল দু-দিন বাড়িতেই নেই। পাবকের কাকা-কাকি পাবককে খাওয়ায় পরায়, গল্প শোনায়। মাঝে মাঝে অবাক করে পাবকের মা-র কথা বলে। রাঙাকাকি জানে না পাবকের কিছুই মনে হয় না মা-র কথা বললে। বাবা তাই তো মা-র কথা পাবকের সামনে তোলেই না।
এমনিতেও বাবা হাসপাতালে রোজ যায়। বাবা নাকি ডাক্তারবাবু। রূপার বাবা মাঝে মাঝে এসে পাবককে আদর করে। তারপর বাবাকে দেখতে পেলেই বলে, আচ্ছা ডাক্তারবাবু, কানটা এরকম কটকট করছে কেন? আর বাবা তখন ইংরেজিতে কী সব হাবিজাবি বলে। পাবক জানে ইংরেজি মানে গলাটা গম্ভীর করে ফিসফিস করে কথা বলা। যেভাবে বাবা বাইরের লোকের সঙ্গে কথা বলে।
দেখো কী মুশকিল; বাবা এখনও ডাকছে না। এক্ষুনি সূর্য ডুববে; আর ভূতগুলো জুটবে কোত্থেকে এসে।
.
এবার সত্যি সত্যি বাবা ডাক দিল। কিন্তু নীচের তলা থেকে নয়, একদম পাশ থেকেই। এই যাঃ! বাবা কখন গুটিগুটি পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।
—পাবক তুমি দুপুরে ঘুমোলে না?
ভীষণ রাগ হয়েছে পাবকের। পাশের বাড়ির ডাকুর মুখপোড়া ঘুড়িটার লাট দেখতে দেখতে পাবক বলল, ‘আমার ঘুম নেই।
-তুমি আমার ওপর রাগ করেছ?
–হ্যাঁ করেছি। তুমি কাল এলে না কেন?
–বারে! আমি যে হাসপাতালে গেলাম। ওখানে অনেক রোগী এসেছে।
–যাও মিথ্যুক! রোগী এসেছে!
বাবা খুব হাসছিল। পাবক নিজের থেকেই বলল, দেখো না, আমি ছাদ থেকে নামব না। বাবাও বেশ সুর করেই বলল, বেশ তো! আমিও নামব না! চলো, ওই মোড়ায় বসে গল্প করি।
কী সর্বনাশ! পাবকের বিশ্বাস হয় না ছাদের ছেড়া মোড়াটায় বসে বাবা ওর সঙ্গে গল্প করছে। কি, বাবা তো কোনোদিন ছাদে এসে বসত না? তাও আবার এই সূর্য ডোবার সময়।
বাবা বলল, পাবক তুমি সূর্য ডোবা দেখছিলে?
পাবক বলল, না গো, আমি এমনিই বসেছিলাম তুমি দেরি করছিলে বলে। আর জানেনা বাবা, ওই গিরিবালা বলছিল তুমি নাকি মরে গেছ।
বাবা রেগেমেগে বলল, আমি দেখছি গিরিবালাকে। ও বলেছে আমি মরে গেছি। এই তো আমি তোমার সঙ্গে গল্প করছি। এবার হঠাৎ করে পাবক জানতে চাইল, বাবা, মরে গেছে মানে কী?
বাবার মুখটা কীরকম হয়ে গেল। কালো কালো। কিন্তু বাবা দুম করে হেসে ফেলে বলল, না না। ওটা বাজে কথা। গিরিবালা ওই বলে ছোটোদের ভয় দেখায়। কেউ আবার মরে নাকি! সবাই বেঁচে থাকে। সবাই বাঁচতে চায়। যেমন মনে আছে তোমার মুনসিকে।
পাবকের সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ল মুনসিকে। দার্জিলিঙে পাবকদের ঘরের কাজ করত। ওর নাকি কী অসুখ করেছিল। কোনো কাজ করতে পারত না শেষের দিকে। তাই বাবা ওকে খাটাত না। পাবকের মতো ওকেও রোজ টফি কিনে দিত। আর টফি পেলেই ওর চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে উঠত। তখন ওর গল্প বলার মেজাজ আসত। ওর নিজের পাহাড় দুটোর আর পরিবিবির গল্প শোনাত। বাবা আর পাবক একদিন ওর সঙ্গে পাহাড় দেখতে গিয়েছিল।
পাবক বাবাকে বলল, হ্যাঁ, বলো না, বলো না মুনসির কথা।
দার্জিলিঙে ন-পিসির বাড়িতে বছরে এক-একবার বাবা পাবককে নিয়ে গিয়ে থাকে। খুব বড়ো বাড়ি ন-পিসির। সারাদিন দাপিয়েও পাবক শেষ করতে পারে না। জানালা খুলে ঘরে মেঘ ঢুকিয়ে পাবক আলমারি, চেয়ার-টেবিল, দেওয়ালের ছবিগুলোকে চান করায়। বুড়ো অ্যালসেশিয়ান হাকিমকেও মধ্যে মধ্যে উত্ত্যক্ত করে পাবক। পিসি তখন সোয়েটার বুনতে বুনতে জোরে জোরে চেঁচায়, এই পাবকটাই আমার জীবন নেবে। পাবক, পাবক, তুমি হাকিমকে আবার মারছ!
বাঃ মারব না, অত বড়ো ঢাউস কুকুরটা শুধু পড়ে পড়ে মাংস আর ডগ বিস্কিট খাবে। কিন্তু কোনোদিন পাবকের সঙ্গে খেলবে না। বাড়িতে চোর এলেও চোখ মেলে দেখবে না।
পিসেমশাই আর বাবা বেরিয়ে গেলে পিসি আর পাবকের এই রকম ঝগড়া চলত রোজদিন। ওইরকম এক ঝগড়ার সময় ব্যোমবাহাদুর একদিন মুনসিকে নিয়ে এসেছিল। ওকে দেখামাত্রই পাবকের রাগ চলে গেল। সাঁ করে ওকে পাশে টেনে নিয়ে বলল, তোর নাম কীরে? তুই আমার সঙ্গে বল খেলতে পারবি?
