যখন শেষ হল পড়া, অরিন্দমের চোখ টাটাচ্ছে। পর্দার ফাঁক দিয়ে নরম রোদ এসে পড়েছে ইয়েনের নিদ্রিত, বিষণ্ণ মুখে। আর ব্যথায় অবশ হয়ে আছে অরিন্দমের বুক। বহুদিন পর এত মন ভারী করা, মন ভালো করা, কষ্টের লেখা পড়া হল ওর। বালক দীপুর চোখে এক অপূর্ব, নিষিদ্ধ প্রেম। দরজার ছিদ্র দিয়ে দেখা দেহজ মিলন (সর্বনাশ, ইয়েন ও নন্দিনী তাহলে জানত ও ওদের দেখে ওই অবস্থায়।), নাটমন্দিরের বারান্দায় বসে নন্দিনীর কবুল করা, ‘আই লাভ ইউ, ইয়েন’, পড়ার ঘরে নন্দিনীকে ইয়েনের তালিম কী করে ভালো প্রেমপত্র লিখতে হয়, ভাইফোঁটার দিন ইয়েনকে ফোঁটা দিতে গিয়ে নন্দিনীর হাত থেকে থালা পড়ে যাওয়া, ইয়েনের বিবাহ প্রস্তাব জানার পর বাড়ির মা বা দাদা, কাকার হাতে নন্দিনীর প্রহার, নন্দিনীর বন্দিদশা, ইয়েনের বহিষ্কার, তারপর দিনের পর দিন দীপুর একলা-একলা গিয়ে বসা নন্দিনীদের চিলেকোঠায়, দরজার ছিদ্রে চোখ রেখে ওর বিশ্বব্রহ্মান্ড কল্পনা, বাড়ির গুরুজনদের হাতে প্রহার, তবু সুযোগ পেলেই ওর চিলেকোঠায় চড়াও হওয়া, দীপুর জ্বর, স্নায়ুর রোগ, হঠাৎ একদিন ভুল বকতে শুরু করা, এবং সেই ভুল বকার মধ্যে নন্দিনীদের চিলেকোঠায় দৃশ্যের বর্ণনা দেওয়া, ডাক্তারদের ওকে অ্যাকিউট ট্রমা কেস ঘোষণা, রোজ রোজ এসে নন্দিনীর শুশ্রুষা ওকে, সেরে উঠে যোড়শ জন্মদিনে নন্দিনীকে দীপুর প্রেম নিবেদন, নন্দিনীর প্রত্যাখ্যান এবং অবশেষে দীপুর ফের মনোরোগে তলিয়ে যাওয়া। উপন্যাসের শেষ দশ পাতা সম্পূর্ণ অসংলগ্ন, দুর্বোধ্য প্রলাপ মাত্র। ফলে রচনাটা শেষ হল কি হল না বোঝা কঠিন।
অরিন্দম পান্ডুলিপি শেষ করে বহুক্ষণ পাথরের মতো স্থির হয়ে বসে রইল। ওর ধন্ধ জেগেছে ‘আ থেফট ইন দ্য প্যালেস’-এর সুমিত আর ‘সিনজ ফ্রম দ্য বয়হুড’-এর দীপুর মধ্যে ও নিজে সত্যিকারের কোনটা। বয়হুড’-এর পরবর্তী অংশের ঘটনাগুলো ইয়েন ম্যাকলিনের কল্পনা, সেসব কোনোদিন ঘটেনি অরিন্দমের জীবনে, অথচ এই মুহূর্তে সেগুলোকে প্রগাঢ় সত্য বলে ধারণা হচ্ছে ওর। প্যালেস’-এর ঘটনাগুলো বাস্তব, কিন্তু তাতে এক মনস্তত্ত্ব ভর করেছে কঠিনভাবে। যে মনস্তত্ত্ব ও মানসিকতার অনেকটা হয়তো কল্পনা। অরিন্দম কি সত্যিই সে-ভাবে ঘৃণা করেছে ইয়েন ম্যাকলিনকে কিংবা নিজেকে কিংবা নন্দিনীকে, যাতে কি না প্রতিশোধ নেওয়ার প্রবৃত্তি হয়? সেও কি অরিন্দমের কল্পনা নয়?
ইয়েন ম্যাকলিন জেগেছেন। তখনও অরিন্দমকে বই ধরে বসে থাকতে দেখে বললেন, সে কী! তুমি ঘুমোওনি?
পান্ডুলিপিটা টেবিলে নামিয়ে রাখতে রাখতে অরিন্দম বলল, না। তবে এবার ঘুমোব। তার আগে আপনাকে সেই প্রশ্নটাই করতে চাই যা কোনো লেখককে করা যায় না। কারণ তা অপমানজনক। তবু করছি, কারণ এই প্রশ্ন আপনিও আমায় করেছেন কাল।
অধৈর্য হয়ে ইয়েন ম্যাকলিন বললে, লেখকের মান-অপমান নিয়ে আমি মাথা ঘামাই না। তুমি প্রশ্নটা করো।
অরিন্দম বলল, আপনি এই উপন্যাসটা লিখলেন কেন?
ম্যাকলিন বললেন, প্রতিশোধ নিতে!
অরিন্দম চমকে গেছে সাহেবের উত্তরে, প্রতিশোধ? কার বিরুদ্ধে?
—নিজের।
—নিজের বিরুদ্ধে? কেন?
—আমি একটা উপন্যাস লেখার বৃত্তি নিয়ে তোমাদের ওখানে গিয়েছিলাম। পরে বুঝলাম জীবন এক ভয়ংকর গবেষণাগার। ভাবিনি ভালোবাসার অ্যাসিড ছিটিয়ে এতখানি ক্ষতি করে বসব কারও।
অরিন্দম কিছুটা বিমর্ষ হয়ে জিজ্ঞেস করল, নন্দিনীর সঙ্গে ভালোবাসাও কি সেই পরিকল্পনার অঙ্গ?
ইয়েন ম্যাকলিন জড়ানো কণ্ঠস্বরে বললেন, তাও বলতে পারো। হয়তো তাই।
–তাহলে প্রকাশ করলেন না কেন কাজটা?
ম্যাকলিন ওঁর রাতের বেলা নিভিয়ে-রাখা সিগারটা ধরিয়ে একটা লম্বা টান দিলেন। তারপর ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বললেন, মাইকেল বার্নস যখন বললেন এ এক সাড়াজাগানো কাজ হতে পারে, আমি ভয় পেলাম। মনে হলে আমার দ্বিতীয় সর্বনাশ হবে। দ্বিতীয় পাপও। আমাদের প্রথম চুম্বনের প্রাকমুহূর্তে নন্দিনী একটা কথাই বারবার বলেছিল যা আমি আজও ভুলিনি, ডার্লিং, প্রমিস করো আমাদের এইসব কথা কোনোদিনও লিখবে না তোমার লেখায়। যখন জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেন? বলল, মন্দিরের বারান্দায় বসে বলছি—তাহলে আমি সত্যিই মরে যাব।
এরপর ফের নীরব হয়ে পড়ল ফ্ল্যাটটা। ম্যাকলিন উঠে সকালের কফি বানাতে গেল আর অদ্ভুত এক ক্লান্তিতে ঘুমে ঢলে পড়ল অরিন্দম।
পাবকের বাবা মুনসির পাহাড়
আজ পাবকের বাবা মারা গেছে। সবাই তাই বলছে। কিন্তু সবাই বললে কী হবে, মারা গেছে মানেটা কী? সবাই তো বলে পাবকের মা নেই। কিন্তু নেই মানে কী?
মারা গেছে, নেই এসবের কোনো মানে পাবক জানে না। সবাই তো বলেছিল পাবক গলায় ফাঁস পরিয়ে খুকসি বেড়ালটাকে মেরেছে। কিন্তু তার মানে! হ্যাঁ ঠিকই, পাবক একটা দড়ি পরিয়েছিল খুকসির গলায়। কিন্তু মরে গেছে, মেরে ফেললে—এ সমস্ত কী!
তবে একটু একটু ভয় পাবকের হয়, যখন ভাবে কই খুকসি তো আর জামবাটির দুধ চাটতে আসে না। সে-ভয়টা কিন্তু পাবকের মাকে ভাবলে হয় না। পাবক মাকে তো দেখেইনি কোনোদিন! তবু বাবা যখন মাঝে মাঝে মার ছবি নিয়ে নাড়াচাড়া করে, মুছে পরিষ্কার করে ছবিতে মালা-সিঁদুর দেয়, তখন পাবক ভাবতে চেষ্টা করে এই ছবির লোকটাকে ও নিজে কখনো দেখেছিল কি না। কিন্তু ওভাবে চিন্তা করলেও পাবকের কারোকেই মনে পড়ে না।
