ডিনার শেষ করে ল্যাংকাস্টার পোস্ট থেকে বেরিয়ে অরিন্দম ট্যাক্সির অপেক্ষায় ছিল ওয়ারিক অ্যাভেনিউ যাবে বলে। হঠাৎ অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসে ইয়েন ম্যাকলিন ওর সামনে পড়লেন—সেন, তুমি চাইলে আমার সঙ্গে একটু হাঁটতে পারো সেন্টা জনস উড-এ আমার ডেরা অব্দি। তারপর না হয় আমি ড্রাইভ করে পৌঁছে দেব যেখানে তুমি আছ।
অরিন্দম বলল, আমি আছি ওয়ারিক অ্যাভেনিউয়ের ওয়ারিংটন ক্রেসেন্টে। সেটা কী খুব দূর হবে আপনার ওখান থেকে?
ম্যাকলিন উৎফুল্ল স্বরে বলে উঠলেন, ওহ। ও তো বলতে গেলে পাশের পাড়া। তুমি নির্দ্বিধায় এখন আমার সঙ্গে পথ চলতে পারো।
আর কথা শেষ হতেই বসন্তের রাতে, চাঁদের আলোয় দু-জনে পথ চলতে লাগল ঠিক সেই রকম মুখর নৈ:শব্দে যেমনভাবে বহুকাল আগে ওরা হাঁটত পুরোনো মধ্য কলকাতার অলিগলি বেয়ে। যখন যেতে যেতে আচমকা জিজ্ঞেস করে বসতেন ম্যাকলিন, তোমার কী মনে হয় নন্দিনী আমার ভালোবাসে?
অরিন্দম বুঝতে পারত না মাঝে মাঝেই সাহেব ওকে এই প্রশ্নটা করে কেন। কাউকে না ভালোবেসে মেয়েরা কি…না! রাস্তায় যেতে যেতে রাতের বেলা দরজার ঘেঁদা দিয়ে দেখা ওইসব দৃশ্যের কথা ওর ভালো লাগত না। ও তাই জবাব না দিয়ে চুপ করে রইত। আর সাহেবও তখন নীরব হয়ে পড়ত।
আজও ইয়েন ম্যাকলিনের পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে কীরকম রোমাঞ্চ বোধ হচ্ছিল অরিন্দমের। মনে হচ্ছিল যেকোনো মুহূর্তে সাহেব বলে বসবেন, তোমার কী মনে হয় নন্দিনী আজও আমায় ভালোবাসে? কিন্তু বাস্তবে তেমন কিছুই বললেন না ম্যাকলিন, কেবল মাঝে মাঝে মুখ তুলে চাঁদের দিকে তাকিয়ে রাস্তা চলতে থাকলেন।
শেষে কথা শুরু করতে হল অরিন্দমকেই। রাস্তা পার হওয়ার জন্য ট্রাফিক লাইটে দাঁড়িয়ে হ্যালোজেনের আলোতে ঝলমল সাণ্ডারল্যাণ্ড অ্যাভিনিউয়ের ওপর অরিন্দম জিজ্ঞেস করে বসল, ইয়েন, আমার উপন্যাসটা আপনার কেমন লেগেছে জিজ্ঞেস করতে পারি?
রাস্তা পার হতে হতে প্রায় আনমনে ম্যাকলিন বললেন, ওহ, তোমার উপন্যাসটা আমার কাছে একটা আবিষ্কারের মতো হয়েছে!
আবিষ্কার!–একটু চমকেই গিয়েছিল অরিন্দম।
ম্যাকলিন বললেন, হ্যাঁ আবিষ্কারই। কারণ বালক সুমিতের দৃষ্টিভঙ্গিতে তুমি যে উপন্যাস গেঁথেছ সেটা প্রেমের উপন্যাসই, কিন্তু বড়ো রাগী।
রাগী?–ফের একটু অবার হয়েছে অরিন্দম।
-হ্যাঁ, রাগীই। কারণ যে বালকটাকে আমি চিনতাম কলকাতায় তার মধ্যে যে এত রাগ, ক্ষোভ, অভিমান তার বিন্দুবিসর্গও আমি আঁচ করতে পারিনি।
–কেন, আপনার কী ধারণা ছিল আমার সম্পর্কে তখন? ‘ক্যালকাটা পোট্রেটস’-এ তো গুটিকয়েক আঁচড়েই আমাকে খারিজ করে দিয়েছিল।
ইয়েন একটু সরে এসে হাত রাখলেন অরিন্দমের পিঠে। ঈষৎ নত সুরে বললেন, কী করতাম বলো? তোমার কথা লিখতে গেলেই অবধারিতভাবে নন্দিনীর কথা এসে যাচ্ছিল। আমাকে থামতেই হয়েছে যৎশিগগির।
—আর যদি লিখতেন সবিস্তারে তাহলে এক ভিন্ন আমি ধরা পড়তাম আপনার লেখায়? যার রাগ, অভিমান, ক্ষোভ নেই? তাহলে ওই দিনগুলোয় আপনি কী জেনেছিলেন আমায়?
ইয়েন ম্যাকলিন হঠাৎ একটা বাড়ির সামনে থেমে বললেন, এই আমার ডেরা। চলো, ভেতরে যাই।
অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংসের লিফটে উঠতে উঠতে ম্যাকলিন বললেন, তোমার উপন্যাস পড়ে হঠাৎ করে এটাই শিখলাম যে, বালক-বালিকারা চরিত্র হিসেবে অনেক জটিল। হয়তো প্রাপ্তবয়স্কদের থেকে একটু বেশিই। এবং তারা পূর্ণবয়স্কদের মতনই সমান নিষ্ঠুর।
লিফট থেকে বেরুতে বেরুতে অরিন্দম বলল, হ্যাঁ, আমার সুমিত একটু বেশি নিষ্ঠুর। তবে ব্রায়ানের মতো নয়।
ওঁর ফ্ল্যাটের দরজা খুলতে খুলতে ইয়েন ম্যাকলিন মাথা ঘুরিয়ে দেখলেন অরিন্দমকে। তারপর দু-জনে ঘরের ভেতরে ঢুকে আসতে বললেন, ভেবো না তোমার উপন্যাসের জবাব আমার কাছে নেই। হয়তো সেটা বলব বলেই এতদূর হাঁটিয়ে আনলাম। এবার জুতো-জ্যাকেট খুলে ওই সোফাটায় বসো। আমি একটু কফি বানিয়ে আনি।
চমৎকার ফ্ল্যাট ম্যাকলিনের, ব্যাচেলার্স ডেন বলতে যা বোঝায়। দেওয়ালজোড়া বই, কলকাতার কিছু ফটো-প্রিন্ট ঝুলছে এখানে-ওখানে, নানা ধরনের গান-বাজনার এল পি সিডিতে সাজানো তাক, লেখার টেবিলে ফ্রেমে বাঁধানো একটা সাদা-কালো ছবি। অরিন্দম টাই, জ্যাকেট, জুতো, মাফলার খুলতে খুলতে টেবিলের পাশে আসতেই থ’ মেরে গেল। ছবিটা নন্দিনীদের ছাদে ইয়েনের তোলা নন্দিনী আর অরিন্দমের ছবি। কালে কালে অনেকটাই ফ্যাকাশে হয়ে গেছে, কিন্তু যুবতী ও বালকের সেই উজ্জ্বল হাসি আজও অমলিন। অরিন্দম ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বেশ কিছুক্ষণ ছবিটা দেখল, আর ভাবল, এই বালকের এত অভিমান, কে আঁচ করতে পারে? তাহলে কি…
অরিন্দমের চিন্তায় ছেদ পড়ল ম্যাকলিনের কথায়—এই নাও তোমার কফি, সেন। আর এই নাও আমার জবাব। বলে টাইপস্ক্রিপ্টে প্রায় আটশো পাতার একটি পান্ডুলিপি ওর হাতে তুলে দিলেন সাহেব। অরিন্দম কফিটা টেবিলে নামিয়ে লেখাটার শিরোনামের দিকে তাকাল। টাইপ-করা পান্ডুলিপির শিরোনাম কিন্তু কলমের আঁচড়ে বাঁধা—’সিনজ ফ্রম আ বয়হুড’। বাল্যকালের দৃশ্যাবলি।
ম্যাকলিন একটা সিগার অফার করলেন অরিন্দমকে। ‘নো, থ্যাঙ্কস’ বলে লেখাটা নিয়ে ও প্রায় শুয়ে পড়ল আরামকেদারায়। আনমনে ক-টা চুমুক দিল কফিতে, আর একটু একটু করে ডুবে গেল ম্যাকলিনের অপ্রকাশিত উপন্যাসে। আরও স্পষ্ট করে বললে, ডুবে গেল নিজের বাল্যে।
