স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল, আর চিঠিগুলো পড়াই আমার কাল হল। ওই অল্প বয়সে এত ঈর্ষা আমার কোত্থেকে এল কে জানে! এত প্রেম, এত ভালোবাসা মেয়েটা ওর তন্বী শরীরের কোথায় লুকিয়ে রেখেছিল? আর তখন, সেই প্রথম, আমি প্রেমে পড়ি। নন্দিনীর ওই হাজারখানেক চিঠিই আমার নিয়তি হল, ওর মতো রোজ অন্তত একটা করে কাল্পনিক প্রেমপত্র লেখা অভ্যাস করলাম। উপন্যাসের সুমিতের মতো তিস্তার বয়ানে নয়, একান্তভাবে নিজের বয়ানে নন্দিনীকে। একসময় ক্রমে এও বুঝলাম যে, নিছক আবেগ ও অনুভূতি চিঠিকে জীবন দেয় না, দেয় লেখার স্টাইল। যে স্টাইলের কথা বারবার নন্দিনী বলেছে ওর চিঠিতে ব্রায়ানকে। এক জায়গায় যেমন লিখেছে,
ব্রায়ান, দেড় বছর হল তোমার কণ্ঠস্বর শুনিনি, তোমার ভাষা শুনিনি, তোমার লেখা একছত্র চিঠিও পাইনি। তাই মনে হয় স্টাইল জিনিসটাই যেন জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। এভাবে চললে আমি একদিন সত্যি সত্যি পাগল হয়ে যাব।
অরিন্দম একটু নীরব হয়ে দাঁড়াল এখানে, এবং এই প্রথম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রায় আনমনে বলল, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে যখন বুঝলাম মানুষ ইয়েন ম্যাকলিন আমার প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, আমার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে ওঁর স্টাইল, ওঁর ফেলে যাওয়া ব্যক্তিত্বের আবেশ। আমার চিঠি লেখা বন্ধ হল, আমার পড়াশোনা চুলোয় যেতে বসল, আমি এক শীতের দুপুরে ট্রেনে চেপে বসলাম গিরিডির পথে। যদূর মনে পড়ে তখন আমি কলেজের প্রথম কিংবা দ্বিতীয় বর্ষে। যে বয়সে মনে হয় বাল্যস্মৃতিগুলো হঠাৎ করে খুব চঞ্চল হয়ে ওঠে। আমার শরীর জুড়ে তখন নন্দিনীকে দেখার আকাঙ্ক্ষা, একটা গোপন বাসনা তাকে পাওয়ারও।
হঠাৎ সামনের সারি থেকে শার্লি ডকিং জিজ্ঞেস করলেন, এই পাওয়ার কথাটা মনে পড়ছে আপনার বইতে আছে।
অরিন্দম মাথা নাড়ল, হ্যাঁ। তবে সেইভাবে নেই। উপন্যাসে আছে সুমিত স্বীকারোক্তি করছে তিস্তার কাছে। ঘটনা হল আমি নন্দিনীকে দেখলাম সম্পূর্ণ স্মৃতিহীন অবস্থায়। আমার মুখ, আমার নাম তার কিছুই মনে নেই, তার সারাদিনের কাজ হল কুকুর, বেড়াল, পাখিদের খাওয়ানো এবং রাতে গুনগুন করে পাঁচের দশকের সিনেমার গান গাওয়া। নন্দিনী তখনও ছবির মতো সুন্দর, কিন্তু আমি ওকে ভালোবাসা নিবেদন করার সুযোগ পেলাম না। ওর চিঠির গোছাগুলো ওর কোলে চাপিয়ে দিয়ে সেই রাতেই ট্রেন ধরি কলকাতার। সারারাত ট্রেনে শুধু একটাই শব্দ মনে মনে আউড়েছি—আমার একটা প্রতিশোধ চাই। অথচ তখনও জানি না কার বিরুদ্ধে, কেন, কীভাবে।
সেই কারণ, লক্ষ্য ও ধরন আমাকে ধরিয়ে দিল সাতাশ বছর আগে ম্যাকলিনের বই ‘ক্যালকাটা পোট্রেটস’।
কথা শেষ করে পোডিয়মে রাখা জলের গ্লাসটা তুলে নিয়ে তাতে একটা বড়ো চুমুক দিল অরিন্দম।
.
পাঠসভা শেষে যে ককটেল চালু হল সেটাই সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছিল অরিন্দমের পক্ষে। শ্যাম্পেন হাতে ধরে এক একজন বুদ্ধিজীবীর এক একরকম প্রশ্ন। ওর পাবলিশার হার্পার কলিন্স ওকে আগে থেকেই সতর্ক করেছিল যে, লণ্ডনের সমালোচকরা তিরিশ গজ দূরে থাকলেই লেখক নিরাপদ। তার চেয়ে কমে এসে গেলে সমূহ বিপদ। তাঁদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে এটা মোক্ষম শিখেছেন সলমন রুশদি, অরুন্ধতী রায়, বিক্রম শেঠরা। কাজেই…
অরিন্দম ওর শ্যাম্পেন ধরে এসবই ভাবছিল যখন বুড়ো মাইকেল বার্নস বেশ ক-পেগ হুইস্কিতে চুর হয়ে টলতে টলতে এসে ধরলেন ওকে। ওর পিঠ চাপড়ে বললেন, তোমার উপন্যাসের জন্য ধন্যবাদ, সেন। আরও একটা ধন্যবাদ একটা রহস্যমোচনের জন্য।
অরিন্দম জিজ্ঞেস করল, কেন, কীসের রহস্যমোচন?
ঠোঁট থেকে গেলাস নামাতে নামাতে বার্নস বললেন, কেন, ইয়েন ম্যাকলিনের উপন্যাস না লেখার রহস্য। ওর ‘ক্যালকাটা পোট্রেটস’ পড়ে তো আমি ওকে বলেছিলাম, তুমি একটা উপন্যাসের রসদ নষ্ট করলে প্রবন্ধের বই লিখে। তাও তো তিস্তার রোমান্টিক সংসর্গের কোনো উল্লেখই ছিল না ওতে। তাতে ও কী বলেছিল জানো, সেন?
অরিন্দম যথাসম্ভব উৎকর্ণ হয়ে বলল, কী বলেছিলেন?
-বলেছিল, মিস্টার বার্নস, প্রবন্ধেই আমি রাখঢাক করে বলতে পেরেছি আমার কলকাতার গাথা। উপন্যাসে সম্পূর্ণ সত্য না বলে পারা যায় না।
অরিন্দম জিজ্ঞেস করল, তাহলে উপন্যাসই বা লিখলেন না কেন ম্যাকলিন? আপনি জিজ্ঞেস করেননি?
বার্নস বললেন, করিনি আবার! বললে, এ উপন্যাস শুধু একটাই পরিপ্রেক্ষিতে লেখা যায়। সেটা আমারও নয়, কাহিনির সম্ভাব্য নায়িকারও নয়। আমার বইয়ের ওই ছোট্ট ছেলেটি যে সারাক্ষণ দরজা-জানলার ফাঁকফোকর দিয়ে জগৎ দেখে। নিতান্তই বালক বলে সে বোঝে কম, কিন্তু জানে অনেক।
অরিন্দম বলল, তাহলে ওই ছেলের চোখেই বা কেন লিখলেন না?
বার্নস হেসে বললেন, কারণ ও বলেছিল, কথা দেওয়া আছে কাকে যেন!
অরিন্দম জিজ্ঞেস না করে পারল না, তাহলে এইজন্যই কি আপনি পোস্ট রিডিং সেশনে ‘ক্যালকাটা পোট্রেটস’ আর ‘আ থেফট ইন দ্য প্যালেস’-এর সম্পর্কের কথা তুলেছিলেন?
এবার আর বার্নস কোনো উত্তর না দিয়ে নিঃশব্দে হাসলেন। তারপর হঠাৎ একসময় অরিন্দমের পিঠে ফের এক চাপড় দিয়ে বললেন, চলি, সেন। তবে এটা মনে রেখো যে, যেটা ম্যাকলিনের ক্ষতি সেটাই আজ তোমার লাভ। তোমার প্রেক্ষিতটা ও চাইলেই আগের থেকে আত্মসাৎ করতে পারত।
