‘ক্যালকাটা পোট্রেটস’-এ আপনার নায়িকা তিস্তার পিছনের রক্ত-মাংসের নন্দিনী সম্পর্কে নীরব বলে, না তিস্তার নিজের চিঠিগুলো পড়ে সুমিতের বোধোদয় হল বলে যে, প্রেমের সূক্ষ্মধারা বিষয়ে সে নিতান্তই মূখ? অর্থাৎ অরিন্দম সেনের রাগ ও অভিমান কার প্রতি? ব্রায়ান চরিত্রের পিছনে ইয়েন ম্যাকলিন, না সুমিত চরিত্রের পিছনে অরিন্দম সেন?
উপন্যাসের অংশবিশেষ পড়ার সময়ে থেকেই হাতে বই ধরে মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়েই ছিল অরিন্দম। ম্যাকলিনের শেষ প্রশ্নটা শুনতে শুনতে হাতের বইটা টেবিলে নামিয়ে রেখেছিল। এবার উত্তর দেবার মুখে ফের বইটা হাতে তুলে নিল ও এবং পাতা উলটিয়ে উলটিয়ে উৎসর্গপত্রে এসে ফের একবার নামটা দেখল—নন্দিনী মুখোপাধ্যায়, তারপর মাইকের কাছে মুখ নিয়ে পরিষ্কার গলায় বলল, না, আপনি ভুল করছেন মিস্টার ম্যাকলিন। আমার প্রতিশোধের লক্ষ্য আমি বা আপনি কেউ নই। কেবল নন্দিনী মুখোপাধ্যায়, আমার উপন্যাসের নায়িকা তিস্তা।
ফের যেন একটা বিদ্যুৎ খেলে গেল সভায়। ইনডিপেনডেন্ট পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদিকা শার্লি ডকিং ঠাট্টাচ্ছলে বললেন, তাহলে কি মি. সেন একজন মিসোজিনিস্ট? নারীবিদ্বেষী?
সঙ্গে সঙ্গে অরিন্দম উত্তর করল, নারীবিদ্বেষী নই, বলতে পারেন দুরারোগ্য রকম নারীমুগ্ধ।
তখন ফের একরোল হাসি গড়াল সভায়। দেখা গেল গার্ডিয়ান’-এর নবীন প্রতিবেদক গর্ডন সাইকস খসখস করে দ্রুত কীসব লিখছেন একটা চিরকুটে। হাসির ঢেউ স্তিমিত হতে সে পড়তে শুরু করল চিরকুটটা—মিস্টার সেন, ‘আ থেফট ইন দ্য প্যালেস’ কলকাতায় এক সাবেক পরিবারের ঘটনা। নায়ক ব্রায়ান একটা বই লিখবে বলে সেখানে ছ-মাস অতিথি ছিল। রক্ষণশীল পরিবারের সুন্দরী মেয়েটির সঙ্গে তার প্রেম হয়, যা পরিবারের কেউ কোনোদিন জানতে পারেনি। এক পাশের বাড়ির বালক সুমিত বাদে, যে চিলেকোঠায় পাহারাদারিও করেছে, যখন লুকিয়ে ওরা মিলিত হয়েছে ওখানে। প্রাসাদের চুরি কি এটাই? নাকি এর অন্য কোনো ব্যাখ্যাও হতে পারে?
অরিন্দম ফের পাতা ওলটাতে লাগল ওর হাতে-ধরা বইটার। তারপর এক জায়গায় থেমে গিয়ে পড়তে লাগল—’সুমিত ভাবতে ভালোবাসে যে তিস্তা ওকে চিঠিগুলো নিজের হাতে তুলে দিয়েছে। ও ভাবতে ভালোবাসে যে তিস্তা ওর অন্তরঙ্গ জীবন সম্পূর্ণ মেলে ধরতে চায় ওর বালক অনুরাগীর সামনে। সুমিতের তখন মনে পড়ে চিলেকোঠার দরজার ছিদ্র দিয়ে দেখা সেইসব দৃশ্য। তিস্তা তার পরিধান ত্যাগ করলে আরোই রহস্যময়ী হয়ে ওঠে। ওভাবে না দেখলে সুমিত কল্পনাও করতে পারত না তিস্তা সত্যি সত্যি কারও সামনে সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে দাঁড়াতে পারে। ভেতরে দুটো লোক—তিস্তা আর ব্রায়ান, কিন্তু সুমিত চোখ ভরে দেখে শুধু তিস্তাকেই। দেখতে দেখতে সুমিতের মনে হয় ব্রায়ান আসলে ও নিজেই, তাই ব্রায়ানের সুঠাম সুন্দর উজ্জ্বল শরীরে যখন ঢাকা পড়ে তিস্তার দেহ, সুমিত ছিদ্র থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে আকাশের দিকে মুখ করে চোখ বুজে থাকে। আর মনে মনে আবিষ্কার করে তিস্তাকে।’–এতদূর পড়ে অরিন্দম থামল এবং শ্রেতাদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, আশা করি আপনারা বুঝতে পারছেন যে, উপন্যাসের প্রেমটা ব্রায়ান-তিস্তার বাস্তব প্রেম নয়, সুমিত-তিস্তার সম্পূর্ণ কাল্পনিক, একপেশে প্রেম। বিয়ের প্রস্তাব তিস্তার পরিবারের থেকে প্রত্যাখ্যান হতে ব্রায়ান যখন সার্পেন্টাইন লেনের বাড়ি ছেড়ে চলে গেল, সেদিন সবচেয়ে বড়ো স্বস্তির শ্বাসটা ফেলেছিল সুমিত। সবচেয়ে বেদনার কান্নাটাও হয়তো কেঁদেছিল ও। কারণ ও-ই তো তিস্তার মন-চুরির একমাত্র সাক্ষী। প্রাসাদের প্রধান চুরি এটাই। আর …
উদগ্রীব গর্ডন সাইকস এবং মাইকেল বার্নস যুগ্মস্বরে বললেন, আর অন্য চুরি।
অরিন্দম বলল, এই চুরিটা উপন্যাসে নেই, আমার হৃদয়ের মণিকোঠায় আছে। প্রবীণ মাইকেল বার্নসের উৎকণ্ঠার স্বর শোনা গেল, কীরকম, সেন!
অরিন্দম বলল, দ্বিতীয় এবং সম্ভবত গৃঢ় চুরিটা হল যেদিন আমি ছাদ টপকে নন্দিনীদের চিলেকোঠায় হানা দিয়ে ওর চিঠির গোটা বাক্সটা তুলে আনলাম আমাদের চিলেকোঠায়।
এক আর্ত বিস্ময়ধ্বনি হঠাৎ ছিটকে বেরোল সভার পিছন থেকে। সবাই পিছনে ফিরে দেখল ইয়েন ম্যাকলিন দু-হাতে মুখ ঢেকে কান্নায় কাঁপছেন। কিন্তু অরিন্দমের আর থেমে পড়ার জো নেই। ও বলতেই থাকল, উপন্যাসে বালক সুমিত সাত বছর অপেক্ষায় ছিল তিস্তার চিঠি খোলার জন্য। আমার জীবনে তেমনটা হয়নি। জীবনেও আর বিয়ে করব না বলে নন্দিনী যেদিন সার্পেন্টাইন লেন ছেড়ে ওর পিসিমার কাছে চলে যায় গিরিডিতে সেদিন ওর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল ওর চিঠিগুলো সরিয়েছে বাড়ির লোকেরাই। আমায় বলল, সুমিত, মানুষটাকে তাড়াবার পর ওরা আমার চিঠিগুলোও নষ্ট করে দিল; এখানে আমি আর একটা রাতও থাকতে চাই না। তখন আমার বুক ফেটে বেরিয়ে আসতে চাইছে কথাটা, না, না, অন্য কেউ না। আমিই চুরি করেছি। তোমার চিঠিগুলো। কিন্তু বলতে পারলাম না কিছুতেই, চিঠিগুলো যে তখনও আমার পড়া হয়নি।
অরিন্দম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। দেখল ইয়েন ম্যাকলিনও সোজা হয়ে বসেছেন ওর নতুন কোনো স্বীকারোক্তির আশায়। অরিন্দম ওর স্মৃতির ভাবালুতা কিছুটা সংবরণ করে খুব
