অরিন্দম একবার সরাসরি তাকাল ইয়েন ম্যাকলিনের চোখের দিকে, প্রশ্নের অপেক্ষায়। ম্যাকলিন অরিন্দমের সদ্য প্রকাশিত, সভাস্থলে সদ্য পঠিত এবং কিছুকাল যাবৎ ইংল্যাণ্ডের সাহিত্যমহলে ঝড়-তোলা উপন্যাস ‘আ থেফট ইন দ্য প্যালেস’-এর কপিটা হাতে নাড়তে নাড়তে বললেন, সেন, আমার প্রশ্ন আসলে দুটো। আপনি কি দুটোরই উত্তর দেবেন?
অরিন্দম সহজ গলায় বলল, নিশ্চয়ই। ম্যাকলিন বললেন, আমার প্রথম প্রশ্নটাকে অপমানজনক মনে করবেন না অনুগ্রহ করে, কারণ এমন প্রশ্ন কোনো লেখককে করা যায় না, তবু করছি।
অরিন্দমের আর তর সইছিল না। বলল, মান-অপমানের কথা আমি ভাবছি না। আপনি প্রশ্নটাই করুন।
ম্যাকলিন বললেন, এ উপন্যাসটা আপনি লিখলেন কেন?
ল্যাংকাস্টার পোস্ট হোটেলের সভাকক্ষের শ্রোতারা এই প্রথম একযোগে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল শেষের সারিতে দাঁড়ানো প্রশ্নকর্তাকে। সামান্য কেউ কেউ হয়তো ওঁকে চিনেও ফেলল, কিন্তু অবাক হল প্রত্যেকে। অরুন্ধতী রায়ের ‘দ্য গড অব স্মল থিংগস’-এর পর যে ভারতীয় উপন্যাসটি ইউরোপে ঢেউ তুলছে তার লেখককে কি এই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা যায়? অমন ইংরেজি গদ্য যার হাতে সে তত জন্ম-লেখক। একজন প্রবীণ সমালোচক তো প্রায় উঠে দাঁড়াচ্ছিলেন ম্যাকলিনের প্রতিবাদ জানাতে, যখন সভাস্থলকে দ্বিতীয়বার চমকে দিল অরিন্দমের সংক্ষিপ্ত জবাব।
অরিন্দম বলল, প্রতিশোধ!
ক্রমে একটা চাপা গুঞ্জন ছড়াতে থাকল হলে—প্রতিশোধ… প্রতিশোধ… কার প্রতিশোধ?…কেন? কীসের জন্য?…
মিনিটখানেক চুপ থেকে থেকে অরিন্দম ফের বলল, হ্যাঁ, ‘আ থেফট ইন দ্য প্যালেস’ কোনোদিনই লেখা হত না সাতাশ বছর আগে ইয়েন ম্যাকলিন তাঁর ‘ক্যালকাটা পোট্রেটস’ না লিখলে।
এবার লাঠিতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন ‘টাইমজ’ পত্রিকার প্রবীণ, ডাকসাইটে সমালোচক মাইকেল বার্নস : সেন, আমি ম্যাকলিনের ক্যালকাটা পোট্রেটস’-এরও সমালোচনা লিখেছিলাম সে-সময়। বইটা কোনো উপন্যাস বা কাহিনি নয়। কলকাতায় দীর্ঘ সময় থেকে সেখানকার অজস্র মানুষজনের জীবনকথা জেনে একটা চমৎকার দলিল তৈরি করেছিলেন ম্যাকলিন। কিন্তু সে-বইয়ের সঙ্গে আপনার বইয়ের কী সম্পর্ক?
অরিন্দম একটু চুপ করে রইল। শেষে বলল, প্রথম সম্পর্ক এটাই যে, দু-টি বইয়ের চরিত্র মোটামুটি এক, স্থান-কাল এক, কেবল কথক বদলে গেছে। এবং আমার যে নায়িকা সে সম্পূর্ণ বাদ পড়েছে ইয়েন ম্যাকলিনের কলকাতা মুখচ্ছবিতে।
ফের একপ্রস্থ গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল হলে, সবাই ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল পিছনের সারির প্রশ্নকর্তাকে, যিনি তখনও সেই ঠাঁয় দাঁড়িয়ে। শেষে হল নীরব হতে তিনি ফের জিজ্ঞেস করলেন, আপনার উপন্যাস নায়িকা তিস্তার চোখে দেখা হলে নায়ক ব্রায়ানের প্রতি এতটা নির্দয় হতে পারত না। যদি আপনার দাবি এটাই হয় যে, এ উপন্যাস বাস্তবের ভিত্তিতে লেখা তাহলে আমায় বলতেই হচ্ছে বালক-কথক সুমিতের তখনও বয়সই হয়নি ব্রায়ানকে বোঝার। আর ক্যালকাটা পোট্রেটস’ থেকে আপনার নায়িকা তিস্তা বাদ পড়েছিলেন ইয়েন ম্যাকলিনের কারচুপিতে নয়, তাঁর নিজের আরোপিত শর্তে। ব্যস, আমার এইটুকুই বলার। বলে ঝপ করে নিজের সিটে বসে পড়লেন ম্যাকলিন। আর সবাই বুঝল উপন্যাস পাঠের অপূর্ব সুরেলা পরিবেশটা হঠাৎ কীরকম গম্ভীর ও ব্যক্তিগত হয়ে গেছে।
সম্ভবত হাওয়াটাকে হালকা করার জন্যই অরিন্দম ফের ম্যাকলিনের উদ্দেশে বলল, আপনার দ্বিতীয় প্রশ্নটা কিন্তু এখনও করেননি, মি. ম্যাকলিন?
ইয়েন ম্যাকলিন এবার একটু কাশলেন, তারপর আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, আমি এও জানি না যে, একজন ঔপন্যাসিককে এরকম ব্যক্তিগত প্রশ্ন জনসমক্ষে করা যায় কি না, তবু এভাবেই করছি; কারণ আপনি তো একটা গভীর ব্যক্তিগত বিষয়কে বাইরেই টেনে এনেছেন আপনার উপন্যাসের মাধ্যমে।
ফের অধীর বোধ করে সাহেবের কথার মধ্যেই অরিন্দম বলে বসল, সাহিত্যজগৎ ও ব্যক্তিগত জগতের মধ্যে খুব বেশি ফারাক রাখায় আমি বিশ্বাসী নই, আপনি অক্লেশে আপনার প্রশ্ন করতে পারেন।
ইয়েন ম্যাকলিন বললেন, আপনার নায়িকা তিস্তা তিন বছর ধরে দৈনিক একটা করে চিঠি লিখেছে ব্রায়ানকে। যা সে পোস্ট করেনি কোনোদিন। চোদ্দো বছরের সুমিতকে সেই সব চিঠি তুলে দিয়ে সে কলকাতার বাড়ি ছেড়ে গিরিডি চলে যায়। তার শর্ত ছিল একুশ বছরে পা দেওয়ার আগে সুমিত যেন একটি চিঠিও না পড়ে। কিন্তু একুশে পা দেবার আগেই লুকিয়ে রাখা চিঠির বাক্সটা সত্যি সত্যি হারিয়ে ফেলে সুমিত। আর এভাবে লিখতে লিখতে তিন বছর কেটে যায় কখন জানতেও পারেনি। সে-ঘোর কেটেছিল যখন তিস্তার হারিয়ে যাওয়া চিঠির বাক্সটা দৈবাৎ খুঁজে পায় ওর কাকার সেরেস্তায়। কাগজের বস্তায়। তখন প্রথমবার সেইসব চিঠি পড়ে ও কী দেখল না, ওর নিজের লেখা তিস্তার বয়ানের চিঠি-গুলোর সঙ্গে তিস্তার চিঠিগুলোর আকাশ-পাতাল দূরত্ব। সুমিত বুঝল ও তিস্তার মনের কথা কিছুই বুঝে উঠতে পারেনি। একটা লজ্জা ও হীনম্মন্যতা পেয়ে বসল ওকে, ও সঙ্কল্প করল একদিন না একদিন ও একটা উপন্যাস লিখে ব্রায়ানের ওপর প্রতিশোধ নেবে? আমি এ পর্যন্ত যা বললাম তা ঠিক?
অরিন্দম শান্ত স্বরে বলল, বিলক্ষণ! ইয়েন ম্যাকলিন জিজ্ঞেস করলেন, তাহলে আজকের এই সাহিত্য সভায় এইটুকু অন্তত স্বচ্ছভাবে জানিয়ে যান ‘আ থেফট ইন দ্য প্যালেস’ কীসের প্রতিশোধ? ইয়েন ম্যাকলিন তাঁর
