দালালটা বাইরের ঘরেই সব মেয়েদের এনে দাঁড় করাচ্ছিল। বিরক্তির স্বরে রজত বলল, শান্তিতে মদটাও খেতে দেবে না হারামজাদা? তখন দালালটাই উঠে দাঁড়িয়ে ‘ভাগে ভাগো’ করে মেয়েগুলোকে ভাগিয়ে দিল ওপরে। পুরো পাঁইট একাই মেরে দিয়ে রজত বলল, নিয়ে চলো এবার। কীরকম কালেকশন দেখি তোমার। দালাল ওকে সিঁড়ি বেয়ে একটা সরু বারান্দায় নিয়ে দাঁড় করাল। তারপর ওর কানের কাছে মুখটা এনে ফিসফিস করে বলল, সোজা চার নম্বর ঘরে চলে যান সাহেব। বেলা আছে, দারুণ জিনিস।
রজতের পা একটু টলছিল। কিন্তু দৃষ্টি খুব পরিষ্কার। গুণে গুণে চার নম্বরে এসে পলকা দরজাটা পায়ে ঠেলে ঢুকল। ঘরে ডিম লাইট। কিন্তু সেই আলোতেও স্পষ্ট দেখল একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে দূরের কোণটায়। ছবির মতন চাহনি, মুখে দজ্জালের হাসি। ওকে দেখেই বলল, বেশ টেনেছ, না? না-হলে সাহস হয় না বুঝি?
রজতের বেদম হাসি পেল ওর কথায়। অপূর্ব অভ্যর্থনা বলতে হবে এটিকে। সামাল দেবার জন্য রোয়াবের মাথায় বলল, চল, চল, বেশি ফিকির করিসনে। মেয়েটাও বাঁই বাঁই পাক দিয়ে শাড়ি খুলতে খুলতে বলল, তোমার কাপড়চোপড় কী গায়েই থাকবে?
—হ্যাঁ থাকবে। তাতে তোমার কী?
–ক-দিন কাচোনি জামা-প্যান্ট?
–অ্যাই দ্যাখ, বেশি বকবি না।
রজত রেনকোটটা খুলে টাঙাবার জায়গা খুঁজছিল। পা টলমল করছিল বলে দেয়ালের পেরেকটাকে যুতে পাচ্ছিল না। কিন্তু অযথা হাঁটাচলা করতেও ওর ইচ্ছে হচ্ছিল না। শরীরটা ক্লান্ত, কিন্তু দেহের বাসনা ষোলো আনা। হুড়মুড়ি করলে শরীরটা বেঁকে বসবে। ওর এখন মনে পড়ে, রমার রক্তমাখা ক্ষুরটা ওর রেনকোটের পকেটে। ওটাকে যত্ন করে প্যানটুলুনের পকেটে চালান দিতে হবে। কিন্তু মাগিটা টেরিয়ে টেরিয়ে সব দেখছে দেখে ও ধমকে উঠল, অ্যাই মেয়ে। ওদিকে তাকা। দেখছিস না জামাকাপড় ছাড়চি?
ভারি লজ্জা রে আমার। তা এসেচো কেন কলির কেষ্ট? নাকি ভাবছ আমি তোমার মানিব্যাগ হাপিশ করব?
নাঃ! এই মেয়েটাকে নিয়ে কিসসু করা সম্ভব না। যা মুখ খারাপ না এদের। এদের জন্য রিপারই ঠিক আছে, ভাবল রজত। হঠাৎ ঝাঁ করে ক্ষুরটা বার করল সে। দেখছিস কী জিনিস? বেশি তেড়িবেড়ি করবি তো এক কোপে শালা কোপ্তা বানিয়ে দেব।
কিন্তু আশ্চর্য! মেয়েটা এখনও হেসে যাচ্ছে মিটিমিটি। হাসতে হাসতেই বলল, তুই শালা গাঁটকাটা আছিস, না?
—অ্যাই চোপ!
—তোর ওটাতে কি মুরগির খুন?
এবার স্বল্প আলোয় রজত নাপিতের মতন নাচাতে লাগল ওর রক্তমাখা ক্ষুরটা। মেয়েটার এখনও বিশ্বাস হয়নি রক্তটা মানুষের। ঘা পড়লে বিশ্বাস হবে। মেয়েটা চট করে ওর ব্লাউজের একটা তরফ খুলে বলল, দ্যাখো, এই যে দাগ না, এটা আমার লাভার রসুল ব্লেড দিয়ে করে দিয়েছিল? বিশ্বাস হয়?
নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে রজতের মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, রসুল কে? মেয়েটিও খুব একটা গা-ছাড়া ভাব করে বলল, লাভার ছিল। বিয়ে করতে চাইত।
—তা করলি না কেন?
–করব কী? ব্যাটা চাকরিই করে না। খাওয়াবে কী?
—কিছুই করত না?
—ওই আর কি তোমার মতন। ক্ষুর দিয়ে গাঁট কেটে বেড়াত। ওসব লোককে বিশ্বাস আছে। তার চেয়ে লাইনে নেমে যাও।
মেয়েটার শেষ কথাগুলো ঠিক কথা ছিল না। বিলকুল ক্ষুরের টান। রজতের সামনে সমস্ত ঘরটা, ওই খুদে জানালা, ওই ডিম লাইট, ওই মেয়েটা দোলনার মতন দুলতে লাগল। রজতের রগ বেয়ে প্রচন্ড ব্যথা চাড়া দিতে লাগল। সুস্থ থাকলে যেটাকে মনে হতে পারত মাইগ্রেন পেন! কিন্তু ও জানে এটা কীসের তাড়না। ও নিজেকে বোঝাতে চায় এটা দৈববাণী। বিশেষ করে ওরই জন্য উচ্চারিত। কিন্তু এই মুহূর্তে ওকে স্থির থাকতেই হবে। এ মেয়েকে ও জান থাকতে আঘাত করতে পারবে না। মুখপুড়ির বুকে দাগ দেখেছে রজত। বড়ো কষ্টের জীবন মেয়েটার। কিন্তু রজতের ক্ষুরের হাতও ধুকপুক করছে। ও খোলা ক্ষুরের ওপর ওর পাঞ্জা বসিয়ে প্রাণপণ চাপ দিল, যেন কী আরাম ওই চাপে।
একই সঙ্গে চিৎকার করে রজত ও বেলা যখন অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ল গোটা বাড়ির জানতে বাকি রইল না বাড়িতে দারুণ অনর্থ ঘটে গেছে। নীচে দাওয়ায় বসে বৃদ্ধমাসি বলল, এইসব বদ মাতালদের হাতে এইজন্য কচি মেয়েগুলোকে ছাড়তে নেই। যা বাবা দ্যাখ কী হল।
পাঠসভা
‘তাহলে আমারও একটা প্রশ্ন আছে’ বলে হলের একেবারে পিছনে তর্জনী তুলে উঠে দাঁড়ালেন এক ভদ্রলোক। শুধু সিট থেকে নয়, মানুষটি যেন ভেসে উঠলেন অরিন্দমের স্মৃতির সমুদ্র থেকে। অরিন্দম খুব নজর করে দেখল ওঁকে, দেওয়ালে ঝোলানো পোট্রেট দেখার স্টাইলে। ফলে ‘হ্যাঁ, কী প্রশ্ন? এইটুকু বলতেই ওর বিশ সেকেণ্ড সময় লেগে গেল। ভদ্রলোকও মনে হল ওই অনুমতির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকাটা খুবই স্বাভাবিক মনে করছেন। লেখক অরিন্দম সেনের সামনে নিজেকে মেলে ধরাটাও যেন ওঁর প্রশ্নের অঙ্গ।
‘হ্যাঁ, কী প্রশ্ন?’ বলেই অরিন্দম ফের স্মৃতির মধ্যে ডুবে খুঁজতে শুরু করল বাল্যের দেখা সেই ইয়েন ম্যাকলিনকে। হলের শেষ সারিতে বসা—আর এইমাত্র উঠে দাঁড়ানো–প্রৌঢ় ইয়েন ম্যাকলিনের সঙ্গে যাঁর সাদৃশ্য একবারে মুছে যায়নি। সাদা শার্টের ওপর ছাই ছাই টুইডের জ্যাকেট। আর গলায় নীল মাফলার—ইয়েন ম্যাকলিন এখনও যৌবনের সেই বাবুটিই। শুধু কোঁকড়া সোনালি চুল আর গোঁফ-দাড়িগুলো ঝলমলে রুপোলি হয়ে গেছে। আর নীলমণি চোখ দুটোর ওপর একজোড়া খয়েরি চশমা বসেছে। ক্যালকাটা পোট্রেটস’ নামের এককালের নামকরা বইয়ের লেখক ইয়েন ম্যাকলিনকে ওর বুক রিডিং সেশনের শ্রোতারা বিশেষ একটা চিনল বলে মনে হল না, কিন্তু অরিন্দমের একটা স্বস্তি ঘটল। যাক, প্রকাশক তাহলে ইয়েনকে একটা সৌজন্য কপি পাঠাতে ভুল করেনি।
