কিন্তু না। বাড়ির দরোয়ান এসে খবর দিয়ে গেল কাল সকালে পাম্পে জল আসবে না। পৌরসভার নোটিশ এসেছে।
বাঁচা গেল, বলে পকেট থেকে হাত বার করল রজত। রমা বলল, আই’ম সরি। আপনাকে এতক্ষণ কিছু না খাইয়ে বসিয়ে রেখেছি। আমাকে এক মিনিট এক্সকিউজ করুন। রমা চলে যেতে রজত সামনে পড়ে থাকা খেলার ম্যাগাজিনটা খুলে আনমনে ওলটাতে লাগল। আর হঠাৎ এসে থেমে গেল গাভাসকরের একটা ছবিতে। বিজ্ঞাপনের ছবিতে দেখাচ্ছে গালভরতি ফেনা নিয়ে সুনীল গাভাসকর দাড়ি কামাচ্ছে। গালের ওপর ক্ষুর চললে রজতের একটা অভূতপূর্ব অনুভূতি হয় ভেতরে। অনেক ক্লান্তি ঝরে যায়। রজতের জানতে ইচ্ছে হয় কে প্রথম ক্ষুর আবিষ্কার করেছিল? সে কী দাড়ি কামানোর জন্য, নাকি সব চেয়ে নিটোলভাবে গলা কাটার জন্য?
এ কি পুরুষ হয়েও গাভাসকরের ভক্ত? আমার তো ধারণা মেয়েরাই ওর সেরা ভক্ত আজকাল। রমা বেশ আওয়াজ করেই চায়ের ট্রে-টা সেনটার টেবিলে রাখল। দু-কাপ চা বানিয়ে একটা বাড়িয়ে দিল রজতের দিকে। নিজেরটায় চিনির বদলে গুলি গুলি স্যাকারিন মেশাল। বলল, আমার, জানেন ব্লাডে চড়া সুগার। চিনি খাওয়াও বন্ধ।
চায়ে একটা ছোট্ট চুমুক দিয়ে রজত বলল, একেকজন দৈববাণী শুনতে পায়। কিন্তু তারা জানে না সেটা সত্যি কি মিথ্যে। এই ধরুন না খবরের কাগজের খবরটাই। ইয়র্কশায়ার রিপার তো সমানে দাবি করছে সে দৈববাণী শুনতে পায়। তাও আবার কবরখানায়।
ওঃ গড! প্লিজ ওর কথা বলবেন না, আমার গায়ে জ্বর আসে। কথাগুলো প্রচন্ড ঘৃণা আর রাগের সঙ্গে বলে উঠল রমা। মুখটাকে যৎপরোনাস্তি ব্যাজার করে চা-টা পাশে ঠেলে দিল। যেন চাটুকু পাওয়ায়ও ওর ঘেন্না ধরে গেছে। রজত ওকে আশ্বস্ত করার জন্য খুব শান্ত গলায় বলল, রিপার কিন্তু একটা সৎ কাজ করছে, আপনাকে মানতেই হবে। সে দেশের সমস্ত বেশ্যাদের নিপাত ঘটাচ্ছে। তাই না?
রমার মনে হল ওর মাথায় রগ ছিড়ে রক্ত ছিটকে বেরিয়ে আসবে। এমনিতেই প্রেসারের রুগী সে। রাগে থর থর কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়াল রমা। একটু হেঁটে গিয়ে হল-ল্যাম্পের ডাঁটিটা শক্ত করে চেপে ধরল। তারপর প্রাণপণে চেঁচিয়ে উঠল গেট আউট অব হিয়ার, ইউ রেচেড মেল শভিনিস্ট পিগ। আই সে গেট আউট। অ্যাণ্ড রাইট নাও।
এবার ধীরভাবে সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়াল রজত। এবং সেরকম ধীর ‘উচ্চারণে’ বলল, আপনি বন্ধুর স্ত্রী। আমার প্রথম পদক্ষেপ আপনাদের বাড়িতে। একটা ছোট্ট উপহার এনেছিলাম। ধীর পদে এগিয়ে এসে পকেট থেকে বার করল ওর ক্ষুরটা, তারপর কবজির এক ঝটকায় খুলে ফেলল যন্ত্রটা। রমা তার সম্পূর্ণ রকম গোল হয়ে ওঠা চোখ দিয়ে দেখল ক্ষুরের ব্লেডে চাপ চাপ শুকনো রক্ত।
রমার মনে হল একটা সাপের ছোবলের মতন জ্বালা হচ্ছে ওর গলায়। ওর চোখের সামনে মানুষটা ক্রমশ ঘোলাটে হয়ে উঠছে। কিন্তু সে স্পষ্ট শুনতে পেল উপস্থিত মানুষটির কথা। সে বলছে, ক্ষুরের আঘাতচকিত, শার্প। বেদনা অপেক্ষাকৃত কম। তবে দাগ থেকে যাবে। পরপুরুষের সামনে অতখানি বুক খুলে বসতে পারবেন না। রমার এবার চৈতন্য হল ক্ষুরটা উড়ে গেছে তার স্তনের পাশ দিয়ে। এবং এটা মনে হতেই সে নিজের রক্তের ফোঁটাগুলোর ওপর আছড়ে পড়ে জ্ঞান হারাল।
ইয়েল লকের দরজা ঘড়াম করে বাইরে থেকে টেনে দিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগল রজত। একটা লম্বা-চওড়া সুবেশ যুবক শিস দিতে দিতে ওপরে উঠে গেল। রজতের ধারণা হল এই ছেলেটাই সুশান্ত। যার হয়ে এতক্ষণ প্রক্সি দিয়ে নেমে যাচ্ছে রজত। মরুকগে শালা ! এইটুকুই মুখ দিয়ে বেরুল ওর। ওর একবার গোনার ইচ্ছে হল রমা কত নম্বর, দুই না তিন চার? কিন্তু ওর ওসমস্ত একেবারেই ভালো লাগছে না এখন।
রজত চারটে একশো টাকার নোট সরিয়েছে রমার দেরাজ থেকে। চাকরি ছাড়ার পর এই প্রথম এতগুলো টাকা ওর হাতে। এত এত টাকা খরচ করার বেশি জায়গা ওর জানা নেই। এক সোনাগাছি ছাড়া। কিন্তু সোনাগাছিতে ওর খুব ভয়। গেলেই মাথায় খুন চাপবে, ক্ষুরটা খাই খাই করবে। এই ক্ষুরটাই ওর মস্ত লায়াবিলিটি আজকাল। কিছুতেই সঙ্গ ছাড়ে না। যখন-তখন গরম হয়ে ওঠে। রজতের ভারি করুণা জন্মাল ইয়র্কশায়ার রিপারের ওপর। হয়ত বেচারির কোনোই দোষ নেই। সব দোষ শালা…।
রজতের মুখ দিয়ে একটা শালা’ আওয়াজ শুনে একটা ট্যাক্সি ওর পাশে এসে খাড়া হয়ে গেল। বেসামাল সওয়ারি তুলতে ট্যাক্সিদের ভীষণ আহ্লাদ। বাবু, কিস তরফ যাইয়েগা? জানতে চাইল ড্রাইভার। রজত কিছুটা মাতালের ঢং-এ বলল, বঁহা জানা হ্যায় চলো। ড্রাইভার বুঝে নিল বাকিটা।
গাড়িটা যেখানে ছাড়ল ওকে সে-জায়গাটা ওর আবছা আবছা চেনা। পার্ক স্ট্রিটের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে দু-গলি পেরিয়ে একটা বেখাপ্পা এলাকা। ওই বাড়িটাও ওর আবছা আবছা চেনা। দিল্লি-আগ্রা থেকে ধরে আনা মেয়েদের আড়ত। কয়েকটা বাঙালিও আছে। তত ভালো কিছু না। ফিরিঙ্গি ফিরিঙ্গি ভাব, কিন্তু মোটেই তা নয়। পুরো ভেতো বাঙালি। অফিসের বসের এক বন্ধুকে একবার যেমন-তেমন ঢুকিয়ে বহুক্ষণ বাইরে দাঁড়িয়ে সিগারেট খেয়েছিল রজত। খুব গা ঘিনঘিন করছিল। যেমন আজও করছে। কিন্তু আজকে ওর মনে দারুণ বল এসেছে। পকেটে পয়সাও আছে, ক্ষুরও আছে। আর একটু নেশা করার ইচ্ছে।
