রমা দরজা খুলেই বলল, আপনি তো সুশান্ত। দাঁড়িয়ে রইলেন কেন? সুদীপ ফোনে সব জানিয়ে দিয়েছে। ডন স্কুলে এক সঙ্গে পড়তেন। ডানপিটে ছিলেন। খুব গল্প করতে ভালোবাসেন। তাই তো? সত্যি বললাম কিনা বলুন?
রজত অ্যাও হয়, অঁও হয় আওয়াজ করে ঘরটায় ঢুকে পড়ল। আঃ! একটা বেড়া অন্তত পেরুনো গেল। রমা মেমসাহেবি কায়দায় ওর পিছনে দাঁড়িয়ে রেনকোটটা খোলায় সাহায্য করতে এল। রজত ঝাঁ করে এক পাক ঘুরে, সলজ্জভাবে বলল, নো থ্যাংকস। কোটটা আর টুপিটা ভিজে আছে। তারপর কোটটা আর টুপিটা র্যাকে ঝোলাতে গিয়ে ওর মনে হল ক্ষুরটা ওর সঙ্গে রাখাই শ্রেয়। সুযোগ কখন, কীভাবে আসে কেউ জানে না। ক্ষুরটা ট্রাউজারের পকেটে রেখে টর্চটা রেনকোটের পকেটে ঢুকিয়ে রজত যখন বসার ঘরের মাঝখানটায় এল রমা তখন অবাক হয়ে ওর দিকে চেয়ে আছে। ওর মনে না হয়ে পারল না এরকম একটা গোছানে, স্বনির্ভর বন্ধু সুদীপের আর একটাও নেই। অন্যরা সবাই হাজির হয়ে ছোটোখাটো একটা হুকুম জারি করবেই। বাড়িতে কী ড্রিংকস আছে সে-খবরটাও অন্তত এতক্ষণে নিয়ে ফেলত। অবশ্য ইনি তো সবে এই প্রথম আবির্ভূত হলেন। পরে কী মূর্তি হয় কে জানে?
আরেকটা কথা। সুদীপের আর বন্ধুরা যে স্টেটাসের এ বোধ হয় সেখানে পৌঁছোতে পারেনি। ডনের ছেলের পক্ষে অধঃপতনই একরকম। ড্রেস দেখে কি সেটাই মনে হয় না? যাকগে, মানুষটা সুবিধের হলেই হল!
রমা জিজ্ঞেস করল, ঠাণ্ডা বা গরম কিছু খাবেন তো? রজত যেন প্রশ্নটা শুনতেই পায়নি। সে উলটে প্রশ্ন করল, কর্তা ফিরছেন কখন?
সেটার কী কোনো ঠিক আছে সুশান্তবাবু? চাকরির উন্নতি, জীবনের সাকসেস না কীসব বলেন না আপনারা? সে-সব ঘটলে অফিস ছেড়ে বাড়ি যাওয়ার পাটটা চুকে যায়। ওর বোধ হয় সেই ফেজ চলছে এখন।
কথাটা শুনতে শুনতে রজতের চোখ দুটো হঠাৎ ঝিলিক দিয়ে উঠল। আর প্রায় নিজের অজান্তে একটা জিজ্ঞাসা উচ্চারিত হয়ে গেল, এই এতখানি সময় আপনার একলা লাগে না? রজত বুঝতে পারল না, ও কেন এই প্রশ্ন করেছে। রমার মনে কোনো সন্দেহ জাগিয়ে তোলার কোনো মানেই হয় না এই স্টেজে। কিন্তু ওর আরেকটা সাংঘাতিক প্রশ্ন জানতে ইচ্ছে খুব। যা জিজ্ঞেস করলে ও এক্ষুনি ধরা পড়ে যাবে, আর রমা ওকে সোজা গেট আউট করে দেবে। ওর জানার ইচ্ছে হচ্ছে ডন স্কুলের ছেলেরা সত্যি কীরকম হয়।
রমা এতক্ষণ ভাবছিল। ও ভাবছিল এই লোকটা নাকি ডন স্কুলের এক কালের চালু ছেলে। এর কাছে এসব প্রশ্ন এত রহস্যময় কেন? এদের বউরাই তো সচরাচর রূপবতী, নিঃসঙ্গ, মেন্টাল কেস হয়। পুরুষের সাকসেস স্টোরির ডার্ক সাইড। কিন্তু ও মুখে বলল, আরে ছাড়ন সে-সব কথা। ওসব নিয়ে আর ভাবি না আজকাল। বরং আপনার কিছু মজার গল্প বলুন। শুনেছি আপনি দারুণ গল্পবাজ ছিলেন।
আজ সারাটা দিনে এই প্রথম বেশ ফুর্তি ফুর্তি লাগছে রজতের। ও বলল, হ্যাঁ হ্যাঁ সেই ভালো। তা কী গল্প শুনবেন বলুন?
-আপনার নিজের গল্প।
–না, না, আমার কোনো গল্প নেই।
—সে কী? একটা জ্বলজ্যান্ত লোক আপনি! আপনার কোনো গল্প নেই মানে!
—মানে আমার কোনো অতীত নিয়ে কিছু বলতেই ভালো লাগে না।
–সুদীপ কিন্তু মোটেই তা বলেনি। তা যাকগে, তাহলে বর্তমান নিয়েই কিছু বলুন।
–বর্তমান? তাহলে আরেকটা কথা বলি আপনাকে। এই বর্তমানের ওপরও না আমার কোনো বিশ্বাস নেই। আমরা যা যা আসলে দেখি তা যে আসলে তাই তারও তো কোনো মানে নেই। আপনি আমাকে যে সুশান্ত ভেবে নিয়েছেন আমি তো ঠিক সে-সুশান্ত নাও হতে পারি।
রমার মনে সাঁ করে সেই প্রথম মুহূর্তের সন্দেহটা খেলে গেল। লোকটা তাহলে সুশান্ত নয়? যদি না হয় তাহলে ওর কী উচিত নয় ওকে এখনই বিদেয় করে দেওয়া? সুদীপ এলে পর কী বলে পরিচয় করাবে? সুদীপ সন্দেহপ্রবণ মানুষ নয়। কিন্তু এরকম অজ্ঞাত কুলশীল একটি লোকের উপস্থিতি ও কিছুতেই পছন্দ করবে না।
রমা একটু ক্ষীণভাবে জিজ্ঞেস করল, আপনি কী ভুল ফ্ল্যাটে এসে পড়েছেন?
–ভুল না, না। ভুল হবে কেন? এটাই তো কথা ছিল। আমি আসব, আপনি থাকবেন। আপনি আমায় ভুল করবেন না প্লিজ। আমি বর্তমানের কথা বলছিলুম তো। বর্তমানকে সাধারণত লোকে ধ্রুব বলে জানে। যা চোখের সামনে ঘটে তা তো মিথ্যে না। কিন্তু প্রশ্নটা অন্যখানে। প্রশ্ন, কী ঘটে আর আমরা কী দেখি। অ্যাপিয়ারেন্স অ্যাণ্ড রিয়্যালিটির প্রশ্ন যেটা। আপনি এফ এইচ ব্র্যাডলি পড়েছেন?
রমা তার সারাজীবনের বইয়ের বিষয় ঘেঁটে এফ এইচ ব্র্যাডলির নামটা মনে করতে পারল না একটু লজ্জা হল এবং বেশ কিছুটা সম্রম হল উপস্থিত মানুষটির জন্য। সুদীপের বন্ধুরা সচরাচর এসব কথা বলে না। এইটেই আসলে মধ্যবিত্তের আদত খগ, ভাবল রমা। তারা অনেক আশ্চর্য, আশ্চর্য কথা জানে। রমা বলল, শুনেছি বলে তো মনে হচ্ছে না এই নামটা।
রজত একটা সিগারেট ধরিয়ে ফেলল। দেশলাইয়ের কাঠিটা সন্তর্পণে অ্যাশট্রেতে শুইয়ে রেখে বলল, দেখুন, আমি যদি বাস্তবিকই আপনার স্বামীর বন্ধু না হতাম তাহলে আমি হতাম মাত্র একটা অ্যাপিয়ারেন্স। যেহেতু আমি তা নই তাই কথা শেষ হওয়ার আগেই ক্রি. ক্রি. ক্রি…করে সজোরে ফ্ল্যাটের বেল বেজে উঠল। রজত ভাবল, এই যাঃ! পুরো সুযোগটা আমি বেকার গল্পে নষ্ট করলাম। পকেটে হাত চালিয়ে ও ক্ষুরটাকে একবার স্পর্শ করল। দরজার দিকে হেঁটে যাওয়া রমার নধর শরীরটার দিকে চাইতেই ওর হাতটা লোভে, উৎকণ্ঠায় ঘেমে উঠল। রজতের বড়ো ভয় এই বুঝি আসল বন্ধুটি হাজির হল। রজতকে বেরিয়ে যেতেই হবে একটু বাদে, অনেক ক্ষমা ভিক্ষা করে।
