অরুণের সব চেয়ে বড়ো গ্লানি যে বাবার সঙ্গে বিরোধ করেও তাকে বাবার টাকায় চলতে হয়। সে কারণে বিমল, অমিত, রবীনের টিপ্পনীও ওকে শুনতে হয়। ওরা ওকে বলে শখের বিপ্লবী। কথাটা হয়তো সত্যি বলেই অরুণ তাতে মর্মে মর্মে দগ্ধে মরে। একদিন দুঃখ করে সুকন্যাকে বলেছিল ও, জানিস তো, আমাকে যা ওরা বলে আমি আসলে তাই। আমার প্রতিবাদগুলোর মধ্যেও অভিসন্ধি থাকে। আমি ঘর ছেড়েছি তিরিশটা আত্মীয়ের সঙ্গে এক ছাদের তলায় থাকতে পারব না বলে। আমি আর্ট পড়ছি ঠিক শিল্পী হওয়ার জন্যও নয়। শিল্পীদের ওই জীবনধারা আমাকে টানে বলে। সে-কথা বাবাও বলেন। বলেন, যখন পেটে টান পড়বে তখন আর জীবন ফিরে পাবার সুযোগ থাকবে না। কিন্তু সুকন্যা জানে অরুণ জাত শিল্পী। ওর রেখায়, রঙে, তুলিতে বুলিতে একটা শিল্পীমন কাজ করে। ক্লাসের একমাত্র ওর কাজেই একটা যথার্থ বেদনা আছে। যা খুশি চাইলেই ও আঁকতে পারে না। ও তাই আঁকে যা ওর ভেতর থেকে আসে। যে কারণে শুধু একটা নুড ফর্ম হিসেবে ও কিছুতেই করুণাকে এঁকে উঠতে পারছে না। সামান্য ক-টা টাকার জন্য মেয়েটা দিনের পর দিন এসে বিবস্ত্র হয়ে দাঁড়ায় ভাবলেই ওর মনটা বিকল হয়ে যায়। ব্যাপারটা এমনিতে খুব যে গুরুত্বপূর্ণ তা নয়। কিন্তু অরুণের রোমান্টিক মনের কাছে এই সামান্য ঘটনার যন্ত্রণাই অনেক।
সুকন্যা উঠে পড়ে ট্রাম স্টপের দিকে যেতে লাগল। সামান্য একটু অভিমান হয়েছে ওর। অরুণ আজ ওকে বাড়ি ফেরার তাগিদ দিল। ও ট্রামে ওঠার সময় এই প্রথম মাথা ঘুরিয়ে রাস্তায় দাঁড়ানো অরুণকে দেখল না। কিন্তু ভাগ্যিস দেখেনি। দেখলে ও মোটেই দেখত না নবীন যুবক উদাসনেত্রে প্রেয়সীর দিকে চেয়ে আছে, যেন আরও কত কিছু বলার ছিল। এই প্রথম অরুণও সুকন্যার ট্রামে ওঠা নির্নিমেষে দেখল না। বস্তুত ও সুকন্যা বা ট্রাম কোনোদিকেই তাকিয়ে থাকেনি। আচমকা ওর নজর কেড়েছে করুণা ময়দানের অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছে। সাপে যেন ছোবল মেরেছে অরুণের কপালে। এক তীব্র, তীক্ষ্ণজ্বালা ঘঘারাফেরা করছে অরুণের মগজের ভেতর। ক্রমে সে জ্বালা ওর বুকে নামছে। এক অজ্ঞাত কুলশীল নারী যে কিনা রোজ কলেজের ক্লাসরুমে এসে উদোম হয়ে দাঁড়ায় তারজন্য এই ব্যথা যে ওর কোত্থেকে এল ভগবানই জানেন। ওর মনে হল স্বামীর হাতে নিত্যদিন ঠ্যাঙানি তো এসব মেয়েছেলের ঘোর প্রাপ্য। এ আবার ভদ্র চাকরি কীভাবে করবে? দেহ বেচে খাওয়ার মতো সুখের চাকরি ভূভারতে কোথায়? থোঃ থোঃ!
অরুণ একবার ভাবল, করুণার পিছনে ধিকিধিকি আগুন জ্বলছে যেন।
গঙ্গার পাড়ে একটা গাছের নীচে গিয়ে হেলান দিয়ে বসল অরুণ। ওর মনে পড়ল জীবনের মহত্তম শখটার কথা। প্যারিসের সোন নদীর ধারে একটা গাছের তলায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করছে। শেষ নিঃশ্বাসটা কি দীর্ঘ, প্রলম্বিত শ্বাস? আস্তে আস্তে অরুণ গাছেরতলায় শুয়েই পড়ল। প্যারিস কিংবা কলকাতার আকাশের মধ্যে তো কোনো ফারাক নেই। সেই এক চাঁদ, একই তারা, একধরনের মেঘ এবং অন্ধকার। অরুণের মনে হল গঙ্গার পাড়েও মরলে কিছু মন্দ হয় না। নদীর ওপর দিয়ে বয়ে আসা এই ঝিরঝিরে বাতাস, এই ঈষৎ চন্দ্রালোক, আর দূরে ওই জলে নৌকোর দাঁড়ের ছলাৎ ছলাৎ…
হঠাৎ সেই নির্ভুল, নির্লজ্জ হাসি। সেরকম হাসি এক বিশেষ ধরনের মেয়েরাই হাসে। তন্দ্রার ঘোর ভেঙে উঠে বসতে পাশ থেকে ডেকে উঠল মেয়েটি, অরুণদা। এখানে এসে শুলেন কেন? সুকন্যাদির সঙ্গে ঝগড়া করলেন বুঝি?
অরুণ কিছুতেই বিশ্বাস করে উঠতে পারছিল না এই ডাক করুণার, এই হাসি করুণার, এই অন্তরঙ্গ প্রশ্নটাও করুণার। ও শুধু বলল, তুমি…তুমি এখানে কেন করুণা?
বুঝতে পারছেন না অরুণদা?
অরুণ কিছু বোঝার চেষ্টা করছিল না। ও শুধু দেখতে চাইছিল করুণার গলার সেই দাগটা। যা নাকি দড়ির চাপে হয়েছে। কিন্তু সামান্য একটু চাঁদের আলোয় অত সূক্ষ্ম কোনো দৃশ্য ধরা পড়ে না। অরুণ জিজ্ঞেস করল, তোমার সেই লোকটি কোথায় গেল? গলার স্বরে কোথায় যেন এটা অভিমান মিশে রইল। করুণা নাক কুঁচকে বলল, বাজে লোক। শুধু দরাদরি করে। বিস্ময়ের ভণিতা করে অরুণ বলল, তাই নাকি? কত দিতে চাইছিল?
২.
-কত নাও তুমি?
-নিই তো পাঁচ। এরপর অরুণের মুখ ফুটে আর কথা বেরোল না। ও পকেট হাতড়ে পাঁচটা টাকা বার করে করুণার হাতে দিল। তারপর কিছুক্ষণ থেমে বলল, চলো, ওই দিকে, মাঠের ভেতর। এদিকে বড় লোক।
এখন যখন নিজের হাতে বুকের কাপড়টা সরিয়ে দিল করুণা কোনো রাগ, লজ্জা বা প্রতিরোধ গড়ে উঠল না অরুণের মনের ভিতর। ওর শুধু মনে পড়ল ছোটোবেলায় দেখা জানলার পাশ থেকে উলঙ্গ মিন্নাকে। বিখ্যাত কোনো নুড ছবি নয়, শুধু মিন্নাকে। কিশোরের নিষ্পাপ চোখে দেখা সেই নগ্ন, রহস্যময় মিন্না।
দৈববাণী
ফ্ল্যাটের দরজা খুলতেই ওরকম বেশভূষোর একটা মানুষকে দেখে রমার ভয় পাওয়া উচিত ছিল। ঢাউস একটা কালো রেনকোট। মাথায় সেইরকমই একটা টুপি যা গল্পের গোয়েন্দারা পরে। ভারী কালো জুতো, হাতে আবার তিন-ব্যাটারির টর্চলাইট! ফ্ল্যাটে একলা থাকা কোনো মেয়েকে ভয় পাওয়ানোর পক্ষে এরকম চেহারা খুবই যথেষ্ট। রমা কিন্তু মোটেই ভয় পায়নি। অফিস থেকেই সুদীপ ফোনে জানিয়েছে বিকেলে ওর বন্ধু সুশান্ত আসছে। হয়ত ওর আগেই পৌঁছে যাবে ওখানে?
