বাড়ি ফেরার পথে অরুণ আর সুকন্যা কিছুক্ষণের জন্য চৌরঙ্গির উলটোদিকের ঝিলটায় বসল। অরুণ একটা সিগারেট ধরিয়ে সুকন্যার হাতে দিল। তারপর নিজের জন্যও একটা ধরাল। কাঠিটা নিভিয়ে জলের দিকে ছুড়ে মারল আর নাকমুখ দিয়ে গলগল করে ধোঁয়া ছাড়তে থাকল। সুকন্যা সিগারেটটা আঙুলের ফাঁকে নিয়েই বসে রইল। বেশ কিছুক্ষণ পর যখন অরুণ ওর দিকে মাথা ঘুরিয়ে সিগারেটের দীর্ঘ ছাই দেখে কিছু বলতে যাবে ও-ই তখন বলে উঠল, আচ্ছা, তুই আজকাল হঠাৎ-হঠাৎ এরকম মাথা গরম করিস কেন? কুকুরটা কী এমন দোষ করেছিল যে ওটাকে ওভাবে লাথি মারতে হল?
অরুণ চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল। খুব তো বসে বসে আঁকলি ওকে। খেয়াল করে দেখেছিলি করুণার গলা আর কাঁধের পাশে সরু দাগ দুটো? দেখেছি বইকী। তা কী হয়েছে তাতে? ওদের বররা যে বউদের ধরে পেটায়, সেটা কিছু নতুন ঘটনা নয়।
–দাগটা মারের নয়, দড়ির।
-মানে?
—মানে, করুণা গত সপ্তায় সুইসাইড করতে গিয়েছিল।
–ও মা! তাই নাকি। তা তুই বা এসব জানলি কোত্থেকে?
অরুণ একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল। বলল, জানি, কারণ তোদের চেয়ে চোখটা কানটা বেশি খোলা রাখি তাই। সুকন্যা এবার একটু টিপ্পনী কেটে বলল, সেজন্য চায়ের পয়সাও দিস দু চার আনা। অরুণ রাগতভাবে বলল, ঠিক তাই।
-কিন্তু তাতেও বুঝতে পারছি না অত খবর তুই পাচ্ছিস কী করে?
—কারণ গতকাল করুণা একটা চাকরির জন্য আমার বাড়ি গিয়েছিল।
–কিন্তু তুই তো মেসে থাকিস, সেখানে ও গেল কী ভেবে?
—গেল। কারণ দরকারটা জরুরি।
—তা তুই কী বললি?
বললাম, আমি আর কোত্থেকে চাকরি দেব। ও বলল, এই দিনে ছয়-আট টাকায় খাওয়া জুটছে না। স্বামীটা মাতাল, একটা পয়সা ছাড়ে না। উলটে নেয়। চাকরি না পেলে ওকে ফের গলায় দড়ি দিতে হবে। আর এবার আধাআধি নয়, পুরো কাজ।
সুকন্যাও এবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, হাতের পোড়া সিগারেটটা মাটিতে ছুড়ে মেরে দুই হাঁটুর ওপর হাত দুটোকে পাশাপাশি রেখে সেই হাতে থুতনি ঠেকিয়ে বোকার মতো তাকিয়ে রইল ঝিলের জলের দিকে। একটু একটু অন্ধকার নেমেছে, আশেপাশে একটু একটু করে জ্বলে উঠছে বিজলি বাতি, আর ঝিলের জল একই সঙ্গে কালো এবং চকমকে হয়ে উঠছে, আলোর অজস্র প্রতিবিম্ব জলে। সুকন্যা বুঝে উঠতে পারছিল না স্রেফ একটা নুড মডেলের জন্য অরুণ হঠাৎ এতটা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল কেন। ওদের দুঃখ দারিদ্র কি চাইলেই দূর করা যায়? ওই দারিদ্র্য চিরকাল ছিল, চিরকাল থাকবে। সুস্থ মাথায় ওসব নিয়ে ভাবার কোনো মানে হয় না। সুকন্যা অরুণকে বলল, তা তুই কী করবি ভাবছিস? বরটাকে গিয়ে পেটাবি?
ভয়ানক শঙ্কিত কণ্ঠে অরুণ বলে উঠল, পেটাব? তোর কি মাথা খারাপ? পিটিয়ে ওদের কান্ডজ্ঞান ফেরানো যায়? তাতে করুণারই গলায় দড়ি দেওয়ার পথ প্রশস্ত হবে। না, না। আমি তেমন কিছু মোটেই ভাবছি না। যেমন করে থোক করুণাকে একটা চাকরি জুটিয়ে দিতে হবে। কিন্তু জানি না চাকরিটা কোথায় আছে। কে দেবে। তোর বাবাকে একটু বলে দেখবি?
কথাটা বলেই অরুণের ভীষণ লজ্জা হল। কোনোদিনও সুকন্যার থেকে কোনো সুবিধে আদায় করার কথা ভাবেনি ও। সুকন্যার বাবা বড়ো কোম্পানির ডিরেক্টর বলে ওর সঙ্গে মেলামেশাতে বেশ সঙ্কোচ ছিল প্রথম দিকে। জানত অনেক গুঞ্জন হবে এখানে ওখানে হয়েছে। তার কিছু কিছু যে ওর কানে আসেনি তাও না। অথচ আজকে ব্যাপারটা কীরকম সত্যি হয়ে পড়ল। লজ্জার বশে কিছুটা নার্ভাস অরুণ আবার একটা সিগারেট ধরাল, সিগারেটের শেষ আগুনটার থেকে।
সুকন্যা বলল, বলতে তো পারি। কিন্তু কী কাজ পারবে করুণা? অফিসে তো আর ঝি চাকর লাগে না। অরুণের আশঙ্কাটাই সত্যি হল—অফিসে করুণাকে দিয়ে কোনো কাজ হবার নয়। আরও কীসব ভাবছিল অরুণ তখন সুকন্যা ফের বলল, তবে আমাদের পাড়ায় একটা কয়েল বাঁধার কারখানা আছে। মেয়েরাই কাজটা করে। দাদাকে দিয়ে বলে দেখতে পারি। যদি ওরা রাজি হয় তো তোকে জানাব।
এরপর বহুক্ষণ নীরবে বসে রইল দু-জন। অবশেষে সন্ধ্যে সাতটা নাগাদ আকাশ যখন বেশ অন্ধকার হয়ে গেছে অরুণ ঝট করে রোয়াক থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, চল, তোকে ট্রামে তুলে দিই। সম্ভবত এই প্রথম সুকন্যাকে নিজের থেকে বাড়ি ফেরার কথা বলল অরুণ। সাধারণত ঘটনাটা ঘটে একেবারে উলটো। সুকন্যা বাড়ি ফিরবে, বাড়ি ফিরতে হবে বাই ধরে কলেজ থেকে বেরুবার পর থেকেই, আর দাঁড়ায় না, এই তো সবে সন্ধ্যে হল, এই ট্রামটা ছেড়ে দে, ইত্যাদি বাঁধা গৎ সমানে আউড়ে যায় অরুণ। অরুণের এই অসংখ্য বাহানা দেখিয়ে দেরি করানোটা ক্রমে ক্রমে সুকন্যার এত মনে ধরে গেছে যে সেসব শোনার জন্যই একেক দিন ও ইচ্ছে করেই বেশি করে বাড়ি ফেরার তাড়া দেখায়। তবে সন্ধ্যে সাত, সাড়ে সাত, আটটার আগে ফেরা কখনোই হয় না। এমনকী, একেকদিন ট্রামে উঠে মন পড়ে থাকে অরুণের প্রতি। ছেলেটা এত উদাস, উন্মনা, অস্থির! সুকন্যার ভয় হয়, ও ঠিকঠাক বাড়ি ফিরবে তো? আর বাড়িই বা বলা যায় কী করে? থাকে তো একটা মেসে। বড়ো পরিবারের মা-হারা ছেলেটির বাপের সঙ্গে পটে না। বাবা চাইতেন ইঞ্জিনিয়ার করতে, ছেলে পড়ছে। ফাইন আর্টস। বাবার ইচ্ছে পড়িয়ে-শুনিয়ে নিজের কোম্পানিতে টানেন, ছেলের স্বপ্ন প্যারিসের রাস্তায় শিল্পী হয়ে ফ্যা ফ্যা হয়ে ঘোরা। প্রায়ই বলে অরুণ, দেখে নিস সুকন্যা আমি প্যারিসের সোন নদীর ধারে এক গাছতলায় শুয়ে শুয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করব। অথচ এই উন্মাদ করা রোমান্টিসিজম ভেদ করে মাঝে মাঝেই ধরা পড়ে ওর সুক্ষ্ম সমাজচেতনা। তাই কখনো কখনো মুখ ফসকে বলেও ফেলে, দ্যাখ, এই আর্ট-ফার্ট একধরনের নির্মম শৌখিনতা। যার পেটে ভাত নেই তার কী প্রয়োজন আর্টে? আর্ট আমাদের এই দুঃসহ জীবনের কতটুকু কী বদলাতে পারে? শিল্প তো শেষ অবধি শিল্পের জন্যই। আর্ট ফর আর্টস সেক’ কথাটা কিন্তু মিথ্যে নয়।
