জেঠু শুনতে পায়নি, এঁকেই যাচ্ছিল। গরমের ছুটিতে দু-মাস যখন ঘাটশিলায় আসে তখন এটাই একমাত্র নেশা জেঠুর। সকালে বেড়ানো আর সারাদিন ছবি আঁকা। অরুণ পা টিপে টিপে সরে গেল বারান্দা থেকে।
কিন্তু ছবির মিন্নাকে দেখে মাথায় ভূত চেপেছে অরুণের। ওর জানতে ইচ্ছা করছে মিন্না সত্যি কীরকম। এতদিন যাকে রোজ রোজ দেখে আসছে অরুণ হঠাৎ তাকেই কেমন যেন অচেনা মনে হচ্ছে ওর। দুপুরে সবাই যখন খেয়ে ঘুমুচ্ছে আর জেঠু নিজের খাটে শুয়ে শুয়ে ড্রইং করছে অরুণ বাড়ির পিছনে ঝি-চাকরদের কলঘরের পাশে পাঁচিলের ওপর গিয়ে বসল। আর তার একটু পরেই দিনের কাজ শেষ করে মিন্না এল কলঘরে চান করতে। পাঁচিলে অরুণকে দেখে হেসে বলল, উথান থিকে পড়ো নাইকো খোকাবাবু। পা ভেইঙ্গে যাবে। তারপর নিজেদের ভাষায় কী একটা গান গাইতে গাইতে কলঘরে ঢুকে গেল। অরুণ নিশ্চিন্ত হল, না, ও ওখানে বসলে মিন্না রাগ করবে না। ও এবার আড়চোখে কলঘরের ভেতরটা দেখল। জানলা নেই বলে পাঁচিলের দিকে দেওয়ালের কিছুটা হাঁ হয়ে আছে। আর চোখ ফেলেই চমকে উঠল অরুণ। মিন্না ওর লাল-সাদা ডোরার শাড়িটা খুলে এক পাশের দড়িতে ঝুলিয়ে একেবারে খালি গায়ে দাঁড়িয়ে আছে। ও জানে অরুণ ওকে দেখছে কিন্তু তাতে ওর লজ্জা হয়নি। অরুণ এবার চোখ বড়ো বড়ো করে মিন্নাকে দেখছে। মিন্নাও অরুণের দিকে চোখ রেখে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে। হয়তো ও ভাবছে খোকাবাবুর কী হল? কিন্তু ও নড়ছে না। আর অরুণ একেবারে অবাক হয়ে দেখছে একটা বড়ো মেয়ের এই অদ্ভুত ন্যাংটো চেহারা।
এরপর মিন্না ঘুরে গিয়ে চৌবাচ্চা থেকে মগে করে জল নিয়ে ঢালতে লাগল মাথায়। অরুণ পাঁচিল থেকে নেমে বৈঠকখানায় গিয়ে চুপচাপ বসে রইল এমনি এমনি। কিন্তু এমনি এমনিও নয়, শুধুই ওর চোখে ভাসছে মিন্নার শরীরটা। খুব লজ্জা হচ্ছে ওই জিনিসটা ভাবতে অরুণের, কিন্তু ওই কথাটাই বারবার ভাবছে ও। কলতলায় মিন্নার ছবিটা বারবার ভেসে উঠছে চোখে। কপালটা ওর গরম গরম লাগল। ও হাত দিয়ে কপালটা ছুঁল। এরকমটা ওর কখনো হয়নি আগে।
অরুণের ঘোর ভাঙল রাজেনবাবুর ডাকে। ও কী? অরুণের কি শরীর খারাপ হল নাকি? অরুণ ধড়মড় করে সোজা হয়ে বসে বলল, না স্যার। কাল অনেক রাত অবধি ছবি এঁকেছিলাম। একদম ঘুম হয়নি। রাজেনবাবু এবার একটু ঠাট্টার সুরে বললেন, ফিগার স্টাডির ক্লাসে এই প্রথম কাউকে ঘুমোতে দেখলাম। তা যাক, শরীর যদি খারাপ লাগে তো এঁকো না, কিন্তু এই স্টাডি সম্পর্কে ক-দিন যাবৎ যেটা বোঝাতে চাইছিলাম সেটা শোনো। রাজেনবাবু এবার করুণার পাশে প্ল্যাটফর্মের নীচে দাঁড়িয়ে সকলের উদ্দেশে বলতে লাগলেন, একটি পরিধানহীন, নগ্ন নারী এবং একটি নুড কিন্তু এক জিনিস নয়। গায়ে কাপড় না-থাকা অবস্থায় একজন নারী বা পুরুষ যে অস্বস্তিবোধ করে, যে লজ্জা ও কুণ্ঠার দ্বারা আক্রান্ত হয় একটি নুডের মধ্যে সেই অপ্রস্তুতকর অবস্থা নেই। সাধারণ নগ্নতা এক ধরনের অভাবের কথা বলে, নুড কিন্তু এক সমৃদ্ধ, পূর্ণতার প্রতীক। নগ্ন নারী বলতে আমরা মনে মনে বস্ত্রের অভাবে জড়োসড়ো এক নারীকে বুঝি, যার মুখ আমাদের করুণার উদ্রেক করে। নুড কিন্তু একটি সুষম, প্রত্যয়ী, সমৃদ্ধ শরীর, কিংবা বলা চলে শিল্পীর সুস্থ দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা ও তুলিতে নবগঠিত এক বিস্ময়কর মূর্তি। আজ এই যে মেয়েটি তোমাদের সামনে…
রাজেনবাবু এবার নিজে উঠে করুণার পাশে দাঁড়িয়ে ওর শরীরের ভঙ্গিমাটির দিকে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইলেন। রোগা, ক্ষয়াটে চেহারার করুণার পাশে মোটাসোটা, বেঁটেখাটো রাজেনবাবু দাঁড়াতে দৃশ্যটা যে খুব হাস্যকর হয়ে দাঁড়াল তার সাক্ষী ছাত্রছাত্রীদের মুখে চাপা, নিরুচ্চার হাসিগুলি। অরুণের শুধু মনে হল এরকম দৃশ্য ব্যঙ্গাত্মক ছবির পক্ষে আদর্শ। এবং তারও একটা সোশ্যাল কনটেন্ট আছে। রাজেনবাবু তখন বোঝাচ্ছিলেন শিল্পীর পক্ষে নুড আঁকার যথার্থ অনুপ্রেরণা কী, অরুণ নিজের অদ্ভুত ভাবনাগুলোর মধ্যে ফের ডুবে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল যখন হুড়মুড় করে ক্লাসে ঢুকে পড়ল কলেজের ছাত্রদের আশকারা পেয়ে পেয়ে মাথায় চড়া নেড়ি কুকুর দামু। আশ্চর্যের ব্যাপার যে দামু ক্লাসে ঢোকার আগে মুখে একটা ঘেঁউ আওয়াজ পর্যন্ত করেনি। সম্ভবত ক্যান্টিনের বেড়ালটাকে তাড়া করে ঢুকে পড়েছিল ক্লাসে, যা আগে কখনোই করেনি। ক্লাসে ঢুকে রাজেনবাবু ও ছাত্রছাত্রীদের অবাক অবাক চোখগুলো দেখে ও নিজেই কিছুটা তাজ্জব বনে গেল। তারপর সম্ভবত ওর একটু লজ্জা হল। তখন লেজ গুটিয়ে মাথাটা এক পাশে হেলিয়ে ক্লাসের দ্বিতীয় নুড মডেল হিসেবে বসে পড়ল। রাজেনবাবু ‘হেট! হেট!’ করে দুটো আওয়াজ করলেন প্ল্যাটফর্মের ওপর থেকে। ছেলেমেয়েরা হি-হি করে হাসতে লাগল। আর প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে করুণাকে এই প্রথম সত্যিকারের লজ্জা পেতে দেখল অরুণ। হঠাৎ-ই করুণা যেন টের পেয়েছে যে খালি গায়ে ওর এই অবস্থা অনেকটা ওই কুকুরটার কাছাকাছি। কাপড় পরা মানুষের চেয়ে উলঙ্গ কুকুরটার সঙ্গেই ওর মিল বেশি। প্রচন্ড বিব্রত অবস্থায় করুণা বুঝতে পারছিল না ও ফের গায়ে কাপড় চাপিয়ে নেবে কি নেবে না। ছেলে-মেয়েদের হাসিটা তখনও বহাল আছে আর সিনেমার কমেডিয়ানদের মতো রাজেনবাবু তখনও এক বিচিত্র কণ্ঠস্বরে হেট! হেট! আওয়াজ করে যাচ্ছেন। অরুণ হঠাৎ ছিটকে বেরিয়ে গিয়ে দামুকে সজোরে এক লাথি মারল। দামু এই অভ্যর্থনার জন্য এতটুকু প্রস্তুত ছিল না, সে প্রথম লাথিটা খেয়েই কেঁউ করে এক ডাক দিল কিন্তু ততক্ষণে ওর নাকের ওপর অরুণের দ্বিতীয় লাথিটা পড়েছে। দামু এবার সমানে কেঁউ কেউ কেউ করতে করতে সিঁড়ির দিকে ছুট লাগাল। পাশের ক্লাস থেকে বীরেনবাবু বেরিয়ে এলেন কী ঘটল দেখার জন্য। রাজেনবাবু তখনও বুঝে উঠতে পারেননি কুকুরটা সত্যি সত্যি গেল কি গেল না। কী মনে করে করুণা বলল, আজ যাই বাবু, শরীরটা ভালো নেই। ছেলেটারও জ্বর জ্বর আছে। সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে তখনও রাগে ফুঁসছিল অরুণ। পারলে আরেকটা লাথি মারে দামুকে। পাশ দিয়ে যেতে গিয়ে করুণা বলল, ওকে আর মেরে কী হবে দাদা? অবলা জীব। ও আর কী বোঝে? অরুণ করুণার কথার কোনো উত্তর দিল না। করুণা যখন ওর সামনে দিয়ে নেমে যাচ্ছে ওর সস্তার শাড়িতে মোড়া শরীরটা দেখে মনে হল দামু নয়, সত্যিকারের অবলা জীব করুণাই, কাপড় থাকতেও যার কাপড় খোলার এত প্রয়োজন। ঘণ্টা ধরে, প্রতিদিন।
