শাড়িটা কোনোমতে সবে গায়ে জড়িয়েছে করুণা যখন অরুণ একটা আধুলি ওর হাতে দিয়ে বলল, ক্যান্টিনে গিয়ে এক কাপ চা খেয়ে এসো। করুণা আধুলিটা নিয়ে বলল, আমার কাছে ভাঙানি নেই। অরুণ বলল, দরকার নেই, খুচরোটা রেখে দিয়ে। তারপর চারমিনারের প্যাকেটটা জিনসের পকেট থেকে দু-আঙ্গুলে টেনে বার করতে করতে ক্লাসের বাইরে পা বাড়াল।
করুণাকে আঁকতে আঁকতে আজকাল প্রায়ই মনে হয় অরুণের যে কোথাও যেন একটা অন্যায় আছে এই ব্যাপারটায়। করুণাকে আঁকলে কোনো ফর্ম আঁকা হয় না, একটা কঠিন, কুৎসিত বাস্তবকেই আঁকা হয়। কিন্তু মুখ ফুটে কেউ সেকথা কবুল করে না। অরুণ ক্যান্টিনে এসে কোণের টেবিলটায় বসে একটা চা চাইল। একটু বাদেই ওর সামনে এসে সুকন্যা বলল, তোর স্টাডিটা কেমন এগোচ্ছে রে অরুণ? অরুণ অনিচ্ছা সত্ত্বেও দাড়িতে হাত বুলোতে লাগল। কোনোভাবে বিব্রত হলে যেটা করে থাকে ও। তারপর প্রায় নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল, কিছুই হচ্ছে না রে। বডি একটা আঁকছি বটে তবে সেটা কিছু দাঁড়াচ্ছে বলে মনে হয় না। স্যার আবার আজ বললেন, একটা সোশ্যাল কনটেন্ট নাকি ঢুকে পড়েছে ছবিতে। কী জানি বাপু। সুকন্যা ঠোঁট থেকে চায়ের কাপটা নামিয়ে রাখতে রাখতে বলল, দ্যাখ, এই দু-তিন টাকা ঘণ্টার মডেলদের থেকে আর কী বেশি পাব আমরা বল? এবার একটা দুষ্টুমি ভর করল অরুণের মাথায়। ও একটা মুচকি হাসি ঠোঁটে মাখিয়ে বলল, শান্তিনিকেতনে তো ছাত্রছাত্রীরাই নিজেদের মধ্যে মডেলিং করে। এখানে কেন যে চালু করে না সেটা। করলে কী দোষ ছিল জানি না।
সুকন্যা বেশ বিব্রত হয়েছিল অরুণের কথায়। ও সঙ্গেসঙ্গে অনুযযাগের সুরে বলল, শান্তিনিকেতন আর আমাদের এখানকার পরিবেশ এক নয় তুই জানিস, সব জিনিস সব জায়গায় চলে না। সুকন্যাকে আরও খানিকটা বিব্রত করার সুযোগটা ছাড়তে ইচ্ছে করল না অরুণের। ও ফের বলল, কলেজের পরিবেশ তো কলেজের পরিবেশ। সেখানে শান্তিনিকেতন, কলকাতা এত সব ভাবার কী আছে? সব জিনিসকেই বেলেল্লা চিন্তা করা হবেই বা কেন? একশো দেড়শো মাইলের মধ্যে সমাজ কি এতখানি বদলে গেছে? এবার কিন্তু ততটা বিব্রত হল না সুকন্যা। ওর মনে হল অরুণের কথাটারও কিছু যুক্তি আছে। সব সময় কিছুটা উলটো কথা বলার স্বভাব হলেও অরুণ মাঝেমধ্যেই সুকন্যারও মনের কথাটা ব্যক্ত করে দেয়। তবু ওর ভয় হল পরপর না জানি ছেলেটা কী বলে বসে। তাই কথাটা ধামাচাপা দেওয়ার জন্য বলল, এখানে সে পরিবেশ থাকলেও ভাবিস না তোর সামনে আমি জামা খুলে পোজ দিতাম। তারপর কাপে শেষ চুমুকটা দিয়ে হুটহাট করে ক্যান্টিন ছেড়ে বেরিয়ে গেল সুকন্যা।
ক্লাসে ফিরতেই অরুণ দেখল করুণা ফের ওর পোজ মতন দাঁড়িয়ে গেছে। টেবিলের পাশে মুখটাকে ঈষৎ ডান কাঁধের ওপর হেলিয়ে। রাজেনবাবু পিছনের দেওয়ালের দিকে দাঁড়িয়ে মুখে বলে বলে ওকে সেই পূর্বের ঢং-এ ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করছিলেন। কাগজ পেন্সিল নিয়ে নিজের জায়গায় বসতে বসতে অরুণ অনুভব করল ওর চোখ দুটো আর মগজটা ক্রমশ অবশ হয়ে আসছে। ওর কি জ্বর আসছে? কিন্তু হঠাৎ এভাবে জ্বরই বা আসবে কেন? তবু বসল অরুণ ওর বেঞ্চিতে, আর নুড স্কেচটার দিকে গভীর মনোযোগ দিয়ে দৃষ্টিও ফেলল। কিন্তু দেখতে থাকল সম্পূর্ণ অন্য এক দৃশ্য।
ঘাটশিলার সীতানাথ জেই বাড়ির বারান্দায় ইজিচেয়ারে বসে চেয়ারের হাতল দুটির ওপর বড়োসড়ো একটা ড্রইং বোর্ড ছড়িয়ে তাতে সাদা কাগজ ফেলে সবুজ খেত, টিলা আর নদীর দৃশ্য আঁকছে। পাশে একটা ছোট্ট টুলে বসে ছোট্ট অরুণ। অরুণ মনে মনে জেঠুর ছবি আর বাইরের দৃশ্য মেলাচ্ছে, কিন্তু মিলছে না বিশেষ কিছু। খেত আর টিলা অরুণও দেখতে পাচ্ছে, কিন্তু সুবর্ণরেখা তো সামনের খেতের পাশ দিয়ে বয়ে যায়নি। নদী দেখতে হলে ওই খেত পেরিয়ে আরও দশ মিনিট হাঁটতে হবে উত্তরে। জেঠু অবশ্য ভোরবেলায় সূর্য ওঠার আগেই একবার করে হেঁটে আসে নদীর পাড় ধরে। বার কয়েক অরুণও গিয়েছিল সঙ্গে। মাঝেমধ্যে জেঠু জলের পাশে পাথরের চাঁইয়ের ওপর পায়ের ওপর পা তুলে বসে এক মনে তাকিয়ে থাকে জলের দিকে। তখন যে জেঠু কী হাতিঘোড়া ভাবে তা এক জেঠুই জানে। অরুণ এও বুঝতে পারছে, যে নদীটা জেঠু আঁকল এখন সেটা ঠিক ওর দেখা নদীটার মতন নয়, তবে আদলটা একই। নদীর পাশের পাথরগুলো জেঠু আঁকেনি, সবুজ ঘাসই গড়িয়ে গেছে জল অব্দি। টিলাগুলো অবশ্য যেমন দেখা যায় তেমনই আছে। কিন্তু আর যেটা জেঠু এঁকেছে এইমাত্র সেটা নিয়েই অরুণের যা কিছু চিন্তা আর দুর্ভাবনা। জেঠু ছবির সামনের দিকে ডান পাশে একটা মস্ত গাছ এঁকেছে, যা দূরের টিলাগুলোর চেয়েও আকারে বড়। আর সেই গাছের নীচে হেলান দিয়ে বসে একটা সাঁওতাল মেয়ে। মেয়েটার শাড়িটা গা থেকে খসে গিয়ে একটা অসভ্য ব্যাপার হয়েছে। অরুণ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে মেয়েটার বুক। সাঁওতাল মেয়েরা প্রায়ই রাস্তা দিয়ে খালি গায়ে যায়, অরুণ সেসব ঢের দেখেছে। কিন্তু আজ ছবিতে মেয়েটিকে ওভাবে দেখে ওর লজ্জা হচ্ছে। আর দুর্ভাবনা হচ্ছে মেয়েটির মুখ দেখে। মুখটা একেবারে মিন্নার মুখ, যে সাঁওতাল মেয়েটা দুপুরে ঠিকে কাজ করতে আসে জেঠুদের বাড়িতে। মিন্নার হাসিটাও অবিকল ওরকম। হাসলে গালে টোল পড়ে। অরুণ অফুটে একবার বলেও ফেলল, জেঠু, এটা কি মিন্না?
