বহু মেঠো পথঘাট পেরিয়ে, ডোবা-বিল ডিঙিয়ে শেষে যখন মুসা এসে পৌঁছোলেন তাঁকে বেশ ক্লান্ত ঠেকছিল। কিন্তু নষ্ট করার মতন সময় তাঁর নেই। এখনও যদি তিনি আসল রাজকুমারের মুখটা দেখতে পান তবে বাকি ক-টা দিনে তিনি ধ্যান করে খুনিকে ঠাওর করতে পারবেন। গভীর জঙ্গলে এবার মুসা তার নাকটা কাজে লাগালেন। পচা লাশের গন্ধ তাঁর পাওয়া চাই।
লাশের গন্ধ তিনি পেলেন। তারপর লাশও পেলেন। তারপর গভীর মনোনিবেশ করে লাশের মুখ পরখ করার পর মুসা মাথা তুলে দেখলেন একটা খোলা তরোয়াল হাতে তাঁর মাথার অদূরে দাঁড়িয়ে আছেন স্বয়ং মন্ত্রীমশাই! মুসার চোখে চোখ পড়তে তিনি হাসলেন। বাঃ! বাঃ! চমৎকার! মুসাভাই চমৎকার! আমি জানতাম আমার আদত শত্রু তুমিই। তুমিই পায়রা সত্যিকারের অনুসন্ধান করতে। এবং স্রেফ তোমার জন্যই গত পাঁচ বছর ধরে ক্রমাগত চেষ্টা করেও এই গর্দভ রাজকুমারকে আমি কোতল করতে পারিনি। আমার দরকার ছিল ওর মতোই একটা মানুষ যে খুন হয়নি। যার লাশ দিয়ে আমি কেবল তোমার চোখে ধূলো দেব। কিন্তু হায়! তাও পারলাম না।
মন্ত্রীর কথায় মুসা টের পেলেন এই সন্ধান চালিয়ে যাওয়ার অর্থ মৃত্যু। এবং এখনই। তিনি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কিন্তু আপনি একে মারলেন কেন? মন্ত্রী হাসলেন। কারণ তো খুব স্পষ্ট। আমি রাজা হতে চাই। এই ছেলের আগের দু-জনকেও আমি বিষ খাইয়ে মেরেছি। কিন্তু সে-সময় দেশে তোমার মতন ধূর্ত কোনো দার্শনিক ছিল না। তোমার অদ্ভুত ক্ষমতার প্রচার শুনে আমি এই তৃতীয় খুনের জন্য এতখানি অপেক্ষা করেছি। আজ তোমার জন্যই আমি এখানে অপেক্ষায় ছিলাম। এবার বলো তুমি বাকিটা জীবন এই ব্যাপারে চুপ থাকতে পারবে কি না। যদি পারো আমি তোমাকে সর্বতোভাবে পুরস্কৃত করব। তোমার গুরুর গলার ঘণ্টা আমি কাবেরীর জলে ছুড়ে ফেলে দেব। তোমার শাস্ত্রের বহুমুখী প্রচার করাব ভারতের প্রান্তে প্রান্তে। আর যদি মূখের মতো, দাম্ভিকের মতো সত্যানুসন্ধী হতে চাও তাহলে এই তরোয়াল তোমার গর্দানে পড়বে। তোমার গুরুর গর্দানে পড়বে। সব সত্যই জানার প্রয়োজন হয় না দার্শনিক!
নিজের প্রাণভয়ে, গুরুর প্রাণের কথা চিন্তা করে মুসা দা-কোসতা সেদিন মন্ত্রীর শর্ত মেনে নিলেন। যথাসময়ে রাজসভায় মহাত্মা গ্যালিলিওর মতন ঘোষণা করলেন, আমার পদ্ধতি ভুল। আমি লজ্জিত। সভাস্থ সকলেই একবাক্যে ধিক্কার দিল আরিয়ার চেট্টির মহান শিষ্যকে। কণ্ঠাম্মার তথ্য মেনে নিরীহ গোপীনাথকে রাজা মৃত্যুদন্ড দিলেন। একটা নতুন রাজনৈতিক চিন্তা লুপ্ত হল গোপীনাথের সঙ্গে সঙ্গে। মাথা হেঁট করে বাড়ি ফিরে এসে মুসা ঘরের কোণে লজ্জায় মুখ ঢাকলেন। আরিয়ার চেট্টি রাগে-দুঃখে-অভিমানে অকথ্য গালিগালাজ করলেন শিষ্যকে। বললেন, বারবার আমি বলেছিলাম তুমি ক্ষুদ্র স্বার্থের জন্য নিজের শাস্ত্রজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ো না। তুমি তাই করলে। আমি পরে জেনেছিলাম সব। কিন্তু কেন তুমি প্রতিদ্বন্দ্বিতার সামনে পড়ে নিজের শাস্ত্রকে ভ্রান্ত বললে? একবার শাস্ত্র প্রয়োগ করলে তার শেষ দেখতে হয়, তুমি না আরিয়ার চেট্টির ছাত্র ! আমার গলার ঘণ্টা তুমি ঘোচাবে বলে আমি লাশের হদিশ দিইনি। দিয়েছিলাম সত্যের সম্মানে। তাও তুমি পারলে না। তুমি আমার শিষ্য বলে আর পরিচয় দিও না।
এরপর আত্মাভিমানী আরিয়ার চেট্টি কাবেরীর জলে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণ বিসর্জন দিলেন। সেই রাতেই মুসা বাড়ি ছেড়ে গভীর অরণ্যের দিকে রওনা হলেন। তাঁর কথা আর কেউ কোনোদিন শোনেনি এবং তাঁরই সঙ্গে তাঁর অভিনব গোয়েন্দাশাস্ত্র অবলুপ্ত হয়। তবে বিচক্ষণ কণ্ঠাম্মা তাঁর একমাত্র পুত্রের নাম রেখেছিলেন মুসা। সমাজের কোনো বিরোধ তিনি মানেননি তখন। এত আশ্চর্য শ্রদ্ধা তার জন্মেছিল মুসা দা-কোসতার ওপর। তবে তাঁর এই সন্তান ছিল জড়বুদ্ধি। অনেকে এই নামের ধাঁধায় একে অন্যকে গুলিয়ে ফেলে।
দেহ
প্রায় এক ঘণ্টা, ক্লাসের ছয় ইঞ্চি উঁচু প্ল্যাটফর্মটার ওপর মস্ত টিচার্স টেবিলে আলতো করে হাত ঠেকিয়ে ওর এক প্রিয় পোজে নিরাবরণ দাঁড়িয়েছিল করুণা। এবার সামান্য একটু বিরতি হতে ও ঝটপট নেমে পড়ে ঘরের কোণে এক চেয়ারে টাঙিয়ে রাখা শাড়িটা দেড় পাকে জড়িয়ে ফেলল শরীরে। ক্লাসভরতি ছাত্র-ছাত্রীর সামনে খোলামেলা দেহে পোজ করায় এতটুকু সঙ্কোচ নেই করুণার। কিন্তু কাঠের পাটাতনটার থেকে নেমে মাটিতে পা রাখলেই কী করে, কী করেই জানি লজ্জার ভাবটা ফিরে আসে ওর। ওর তখন প্রথমেই হাত যায় শাড়িটার দিকে। অল্প একটু বিশ্রাম, তাই সায়া বা ব্লাউজ পরার আদিখ্যেতার মধ্যে যায় না ও। গায়ে শাড়িটা জড়াতে পারলেই শান্তি না হলে গা শিরশির করে।
সামনে বেঞ্চিতে বসে থার্ড ইয়ারের অরুণ ওকে আঁকছিল। আসলে আঁকার থেকে ভাবছিল বেশি। এই গরিব না খেতে পাওয়া শরীরটার থেকে একটা ফর্ম বা আকার ও পায় ঠিকই, কিন্তু কোনো রোমাঞ্চ পায় না, যা ছবির নুডে সঞ্চারিত করা যায়। মাঝেমধ্যে স্যার এসে পাশে দাঁড়ান, একটু ঘাড় নুইয়ে অরুণের কাজ দেখেন। দুটো একটা মন্তব্য করেন তারপর পাশের ছেলেটির দিকে চলে যান। আজ ওর স্কেচের ঢং দেখে স্যার বলছিলেন, অরুণ দেখছি একটা সোশ্যাল কন্টেন্ট আনতে চেষ্টা করছে নুডে। অরুণ নিজেও খুব নিশ্চিত ছিল না ব্যাপারটা সম্পর্কে, তাই তড়িঘড়ি বলে উঠল, তাই মনে হচ্ছে নাকি স্যার? রাজেনবাবু আর কিছু না বলে পাশে সরে গিয়েছিলেন।
