সপ্তাহ শেষে রাজার প্রাসাদে আবার সভা। আপামর জনতা। আজ ভিড় করে এসেছে। খুনিকে চোখে দেখতে। অনেকে পচা ডিম এনেছে খুনির গায়ে মারবে বলে। অনেকে এনেছে ছেঁড়া চটি-জুতো। একে একে কণ্ঠাম্মা এবং কনডাপ্পান চার চার জন মানুষের দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন, এদের মধ্যেই কেউ খুনি। সমস্ত সভায় একটা চাপা বিস্ময়ের রোল ছুটে গেল। কী! এখনও খুনি স্থির হল না। চার-চারজনের মধ্যে থেকে আসল খুনি তাহলে বার করবে কে? এই চারজনের মধ্যে একটি মেয়েও আছে যার সঙ্গে রাজপুত্রের কিছুটা ভাব ভালোবাসা ছিল। তাদের মধ্যে রাজপুত্রের ছোটোবেলার বন্ধু গোপীনাথ আছে। গত আট বছর ধরে রাজকুমারের সঙ্গে তাঁর বিবাদ চলছিল। অদ্ভুত অদ্ভুত রাজনৈতিক মত পোষণ করার জন্য গোপীনাথ বেশ কিছুকাল রাজা এবং মন্ত্রীর বিরাগভাজন হয়েছেন। আর ছিল দু জন ডাকসাইটে খুনি, যারা যেকোনো কারণে যাকে-তাকে ছুরি মারতে পারে। কিন্তু তাই বলে জড়বুদ্ধি রাজকুমারকে তারা খুন করবে কেন? সকলেই কীরকম হতভম্ব হয়ে গেল। তাহলে খুনি কে? এই রকম এক বিচিত্র আবহাওয়ার মধ্যে মুসা দাঁড়িয়ে উঠে ঘোষণা করলেন যে, যে মৃতদেহটি তিনি দেখেছিলেন সেটি খুনই হয়নি! ওই মানুষটি স্বাভাবিক মৃত্যুতে মরেছেন। তাই গত সাত দিন ধরে ধ্যান করেও মুসা কোনো খুনির সন্ধান পাননি।
রাজার থেকে শুরু করে তাঁর মন্ত্রী এবং পারিষদবর্গ বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন। সমবেত জনতার সেই একই অবস্থা। অথচ মুসার মতন এক দার্শনিকের কথা তো জলে ফেলে দেওয়া যায় না! শেষে রাজাই জিজ্ঞেস করলেন, তাহলে আমার ছেলে কি খুনই হয়নি? তোমার বক্তব্য কী? তুমি কী চাও? মুসা বললেন, রাজন, আমি মৃতদেহটা ফের দেখতে চাই। তখন বাধা দিলেন মন্ত্রী। না, ওই দেহ আর দেখা যাবে না। গত পরশু আমরা শবদাহ করে এসেছি। আপনি খুনি না পেয়ে থাকলে চুপ করে কোণায় গিয়ে বসুন। আমরা অন্য দু-জন দার্শনিকের কথা শুনব।
বহু অনুনয়-বিনয়ের পর মুসা সেদিন আরো পনেরো দিন সময় পেলেন। কাম্মা এবং কনডাপ্পাও সময় পেলেন ওই সময়ের মধ্যে সন্দেহভাজন চারজনের মাঝখান থেকে খুনিকে বার করার। প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে মুসা বুঝলেন এবার তাঁর কর্মপদ্ধতি একটু অন্য রকম হবে। স্রেফ ধ্যানে বসলে চলবে না। তাঁকে রাজকুমারের আসল ধড়টা যেখান থেকে হোক বার করে আনতে হবে। তাঁর ঘোর সন্দেহ জেগেছে তাঁর দেখা মৃতদেহ সম্পর্কে। প্রথমত ওই মানুষটিকে কেউ খুনই করেনি। সম্ভবত রাজকুমারের সঙ্গে তার চেহারার প্রচুর মিল আছে। এর স্বাভাবিক মৃত্যুতে গোপন চক্রান্তকারী একটা সুযোগ পেয়েছে। সে রাজকুমারকে এই সুযোগে গুম করে এই মৃতদেহের মুখে অজস্র নীল রং মাখিয়ে এটিকে রাজকুমারের বলে চালিয়েছে। ওদিকে জড়বুদ্ধি রাজকুমারকে গুম করা বিশেষ ঝামেলার কিছুই না। এবং যেই এই কাজ করে থাকুক তার এই লাশ বদলের একটাই যুক্তি। দার্শনিক মুসা দা-কোসতার অনুসন্ধান রীতিকে ফাঁকি দেওয়া। মুহূর্তের মধ্যে নিজের পদ্ধতির ওপর মুসার অজস্র বিশ্বাস জন্মাল। তিনি জানলেন এই খুনের প্রতিশোধ নিতে একমাত্র তিনিই সাহায্য করতে পারেন। ওঁর তুলনায় কণ্ঠাম্মা এবং কনডাপ্পান স্থূল বুদ্ধির মানুষ। সঙ্গে সঙ্গে মুসার আরো একটা আতঙ্ক জন্মাল। যদি তিনি খুনিকে বের না করেন ওই অপর দুই দার্শনিকের দৌরাত্ম্যে আরো একটা নিরীহ প্রাণ নষ্ট হবে। অত্যন্ত বিচলিত বোধ করে মুসা ত্রস্ত পায়ে শ্মশানের ডোমেদের মহল্লার দিকে হাঁটলেন।
কিন্তু হায়! কোনো ডোমই রাজপুত্রের লাশ পুড়িয়েছে বলে মনে করতে পারল না। মুসা তাঁর দেখা মৃতদেহটাকে মনে করে আসল রাজপুত্রের মুখের আদলের কথা তাদের বললেন। কারণ প্রাসাদে দেখা লাশের মুখ এবং আসল রাজপুত্রের মুখ একরকম হতেই হবে। এইভাবে এক মহল্লা থেকে মুসা অন্য মহল্লায় গেলেন। তাঁর চোখে-মুখে প্রশ্ন। অবশেষে ব্যর্থ মনোরথ মুসা সমুদ্রতটে জেলেদের সঙ্গে ভাব জমালেন। পাছে খুনি লাশটাকে জলে ভাসিয়ে দিয়ে থাকে। কিন্তু কেউ কোনো হদিশ দিতে পারল না। রাত গভীর হতে মুসা গভীর চিন্তা মাথায় নিয়ে বাড়ি ফিরে এলেন। দেখলেন গুরুর ঘরে প্রদীপ জ্বলছে, কিন্তু তিনি ঘরে নেই। পরিচারিকা অনুসূয়া খবর দিল গুরু মেছুনিদের আড্ডায় তাঁর রক্ষিতা পদ্মিনীর কাছে গেছেন। ক্লান্ত, দুর্বল মুসা কিছু না খেয়েই মেঝেতে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন।
ভোরবেলা বাড়ি ফিরেই আরিয়ার চেট্টি মুসাকে ধাক্কা দিয়ে ঘুম থেকে তুললেন। বললেন, শুনছিলাম তুমি ক-দিন যাবৎ একটা মড়া খুঁজে বেড়াচ্ছিলে। কাল রাতে মেছুনি পদ্মিনীর কাছে শুনলাম ওঁদের বাড়ির পাশের জঙ্গলে একটা লাশ পচছে বেশ কিছুকাল ধরে। তুমি পারলে একবার খোঁজ নিও।
এই সংবাদে মুসা যার পর নাই খুশি হয়ে গুরুকে ঢিপ ঢিপ করে প্রণাম করতে লাগল। তিনি যতই জানতে চাইলেন মুসার কী দরকার লাশটাকে দিয়ে, মুসা কেবল কথাটা নানান রকম ভণিতা করে, মিথ্যে বলে কাটিয়ে গেলেন। সূর্য ভালোভাবে আকাশে প্রকাশ হতে মুসা হাতে একটা প্রকান্ড ছাতা নিয়ে তাই মাথার সামনে মেলে ধরে লাশের সন্ধানে বার হলেন। তাঁর ছাতার জন্য কেউ তাঁর মুখটা দেখতে পেল না। মুসার ভয় ছিল আসল খুনি নিশ্চয়ই তাঁর ওপর নজর রেখেছে। জঙ্গলের দিকে তাঁকে যেতে দেখলে আক্রমণ করতে পারে। মনে মনে মুসা জানল তাঁর এই সাফল্য অচিরেই তাঁর গুরুর গলার থেকে ঘণ্টাটা নির্বাসিত করবে। লোকেও জানবে কষ্ঠাম্মা এবং কনডাপ্পান আসলে হাতুড়ে দার্শনিক। সত্যিকারের জ্ঞানী হলেন আরিয়ার চেট্টি এবং মুসা।
