বাবা-মার থেকে চলে এসে আরিয়ার চেট্টির সঙ্গে থেকে থেকে মুসা এক সমাজসচেতন মনোভাবের মানুষ হয়ে উঠেছিলেন। কতকগুলো নিম্ন শ্রেণির জাতির ওপর ব্রাহ্মণদের অত্যাচার তাঁকে খেপিয়ে তুলত। এই অবমাননা একটা বিশেষ পদ্ধতিতে তাঁর মা ফৈজুকেও সহ্য করতে দেখেছিলেন মুসা। তবে রোবেরতো পোর্তুগিজ সাহেব বলে সামনাসামনি ফৈজুকে কিছু বলার ধৃষ্টতা কারো হয়নি। তাই এক শীতের সকালে বাজারে তরকারি কিনতে গিয়ে একটা বড়ো বিজ্ঞাপন দেখে ভারি পুলকিত হলেন, মুসা। তাতে স্থানীয় রাজা ঘোষণা করেছেন যে, আততায়ীর হাতে নিহত তাঁর পুত্রের হত্যাকারীকে যে ধরিয়ে দিতে পারবে তাকে অজস্র উপহারে এবং সম্মানে ভূষিত করবেন রাজা। মুসার সহসা ইচ্ছে হল এই সামান্য কাজটুকু করে তিনি গুরুর গলার ঘণ্টাটি সরিয়ে দেবার বন্দোবস্ত করবেন। তিনি বাজারের দোকানিদের কাছে খোঁজ নিয়ে জানলেন রাজাই এই ছিল একমাত্র ছেলে। বয়স পঁচিশ কি ছাব্বিশ। তবে দোষের মধ্যে সে ছিল জড়বুদ্ধিসম্পন্ন। গতকাল রাত্রে তাকে তার ঘরে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। সম্ভবত বিষ প্রয়োগে তার মৃত্যু হয়েছে, কারণ তার গোটা মুখটা ভয়ংকর রকম নীল। রাজপরিবারের কেউই তার সুন্দর মুখমন্ডলের ওই ভীষণ চেহারার দিকে তাকাতে পারছেন না। এবং আজই দুপুরে রাজা রাজ্যের সমস্ত দার্শনিকদের এই খুনের কিনারা করার জন্য সভায় আহ্বান জানিয়েছেন। সব শুনে মুসা ঠিক করলেন তিনি এই অনুসন্ধানে নামবেন।
আমাদের এই অবসরে জেনে রাখা দরকার যে, যে সময়ের চৌহদ্দিতে আমরা আছি তখন জ্ঞানী বলতে দার্শনিকদেরই বোঝাত। খুনের মতন নৃশংস কাজেও দার্শনিকদের মতামত চাওয়া হত। আজকের মতন গোয়েন্দাগিরি তখন ছিল না। তবে সবাই আশ্চর্য হবেন জেনে যে, ওই সুদূর কালেও আলোচ্য অঞ্চলে কণ্ঠাম্মা নামে একজন মহিলা অঙ্কশাস্ত্রবিদ এবং দার্শনিক ছিলেন, যিনি তাঁর প্রখর বিশ্লেষণী শক্তির বলে সে-সময়ের অনেক খুনের খুনিদের ঠিক ঠিক ধরিয়ে দিতে পেরেছিলেন। কণ্ঠাম্মার অনুসন্ধানের পদ্ধতির সঙ্গে ভয়ংকর মিল পাওয়া যায় আগাথা ক্রিসটির তৈরি চরিত্র মিস জেন মারপলের অনুসন্ধান রীতির। অর্থাৎ জেন মারপলের মতন কন্ঠাম্মাও বিশ্বাস করতেন যে, যেকোনো জটিল খুনের কেসের সমান্তরাল কোনো অতীতের কেস বার করা গেলে দুটোর মিল এবং অমিলের তারতম্যের বিচারে বর্তমান খুনের সূত্র পাওয়া যেতে পারে। মিস মারপলের মতোই কষ্ঠাম্মার স্মৃতিশক্তি ছিল বিস্ময়কর। এমনিতেই ছিলেন অঙ্কের মানুষ, তার ওপর খুনের খোঁজ করা তাঁর একটা প্যাশনে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। প্রায়ই তিনি গ্রামে গ্রামে বা শহরের ভেতরে এবং আশেপাশে ঘুরে সাধারণ মানুষের সঙ্গে আড্ডা জমাতেন। কথায় কথায় খোঁজ নিতেন খুনের ব্যাপারে। অথচ নেহাতই আলাপের ঢং-এ। শোনা যায় কণ্ঠাম্মার আলাপে মুগ্ধ হয়ে একবার এক খুনি তার খুনের কাহিনি ওঁকে শোনায়। একবারও তার সন্দেহ হয়নি যে মানুষটা আসলে কে। এই কণ্ঠাম্মা সেদিন রাজার সভায় অনুসন্ধানের দায়িত্ব নেবেন বলে হাজির হন।
সেদিন দুপুরে সভায় এসেছিলেন মারকুট্টে মানুষ কনডাপ্পান থিরুমাই। বিভিন্ন সভায় ‘পাত্ৰাধার তৈল না তৈলাধার পাত্র বা ওই জাতীয় নানাবিধ বাক্যবাগীশ তর্কে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বীকে নাজেহাল করে ছাড়তেন। কাকতালীয় বিষয়াদি নিয়ে অত চিন্তা সে-যুগের খুব কম মানুষ করেছিলেন। ধর্মের ওপর দক্ষিণের মানুষের উত্তরোত্তর শ্রদ্ধা হারানোর পিছনে কনডাপ্পান থিরুমাইয়ের মতন লোকের অবদান অনেকখানি। তাঁর বিরুদ্ধে তর্কে অবতীর্ণ হয়ে অনেক পন্ডিত সভায় প্রস্রাব করে ফেলেছিলেন। কিন্তু কনডাপ্পানের একটা মস্ত ক্ষমতা ছিল কথার প্যাঁচে, কথার জালে, কথার মায়ায় এবং বহু ক্ষেত্রে ধমকানির মাধ্যমে তিনি অনেক খুনিকে খুন স্বীকারে বাধ্য করিয়েছিলেন। কখনো কখনো খুনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিংবা ব্যাপারটা জানেন এমন লোকদের জেরা করে আসল খুনির সম্পর্কে তিনি জেনে যেতেন। সেই আমলের অনেক খুনের পাপীকে ধরাতে পেরেছিলেন কনডাপ্পান। আজকের দিনের পুলিশের অনুসন্ধান রীতির সঙ্গে তাই মিল পাওয়া যায় এই দক্ষিণী পন্ডিতের কর্মধারার। সভায় তৃতীয় দার্শনিক হিসেবে সেদিন উপস্থিত হলেন যুবক মুসা। এতদিনে মুসার ক্ষমতার কথাও অনেকে জেনে গেছেন। তিনি ঢুকতেই মন্ত্রীমশাই একটু তারিফের ভঙ্গিতে তাঁকে অভিবাদন জানালেন।
মুসা তাঁর সামনে বসে অনুভব করলেন যে, সভাস্থ সকলেই শোকে মুহ্যমান হয়ে আছে। রাগে এবং দুঃখে বৃদ্ধ রাজার চোখ ফেটে জল আসার উপক্রম হয়েছে। তিনি কম্পিত কণ্ঠে ঘোষণা করলেন তাঁর নিদারুণ দুঃখের কথা। বললেন, এই আমার একমাত্র সন্তান ছিল। এর ওপরের দু-জন মহামারীতে মারা গেছে। এখন আমি সম্পূর্ণ নির্বংশ হলাম। আপনারা রাজ্যের মহামতিরা, আসল দোষীকে বার করে আমার বাধিত করুন। একটা কঠিন প্রতিশোধের জন্য আমি মুখিয়ে আছি। আপনারা আমায় সাহায্য করুন। যিনি দোষীকে ধরাতে পারবেন তাঁর যেকোনো আর্জি রাখার কথা আমি বিবেচনা করব। আপনাদের সাতদিন সময় দিলাম।
সভা ভঙ্গের পরে তিন দার্শনিক কাচের বাক্সে শোয়ানো রাজপুত্রের মুখ দেখতে গেলেন। মুসা দেখলেন রাজপুত্রের মুখ অসম্ভব রকম নীল। যেন বিষে মুখটা পুড়ে গেছে। শিরায় যেন রক্ত আর লাল নেই। মুসা আরও কাছে গিয়ে মুখটার ওপর ধ্যানে নিবদ্ধ হলেন। তারপর একসময় ঘণ্টা বাজিয়ে সকলকেই বার হবার নির্দেশ দেওয়া হল। প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে দার্শনিক মুসা দা-কোসতা গভীর চিন্তায় ডুবে গেলেন। সোনালি দুপুরের রোদ তাঁর চোখে পড়ল না। রাস্তার আশপাশে গাছগাছালি, পুকুর, বিল কিছুই তাঁর নজরে এল না। তিনি অবিন্যস্ত এক চৈতন্যে প্রবেশ করলেন। যে চেতনার কেন্দ্রে এক খুন। যে খুনের পিছনে একটি মুখের ধ্যানে দার্শনিক মগ্ন। তিনি জানলেন না তাঁর গন্তব্য কোথায়। এইভাবে চলতে চলতে একসময় তিনি সমুদ্রের তটে এসে পৌঁছোলেন। তখন সূর্য ডুবুডুবু। এই প্রথম এক খুন হওয়া মানুষের মুখ থেকে একবিন্দু ইশারা মুসা পেলেন না। ঘনায়মান সন্ধ্যার মতন তাঁর ভাবনার দিগবলয়েও অন্ধকার ঘনিয়ে এল। এক নীলাভ মৃত মুখের চিন্তায় মগ্ন মুসা ক্রমশই নিজেকে অসহায় বোধ করতে লাগলেন। তাঁর সন্দেহ জাগল নিজের পদ্ধতির ওপর। কিন্তু তিনি হাল ছাড়লেন না।
