অনির্বাণের উৎকণ্ঠা আর বাঁধ মানছে না। একটা বাক্যেই যেন নিষ্পত্তি হয়ে যাবে ভগবান আছেন কি নেই, ভূত সত্যি না মিথ্যে। ও বলল, আপনি নোটটা কালেক্ট করেছেন?
সত্যশিব বললেন, হ্যাঁ।
–কী লিখেছে তাতে?
–লিখেছে ‘আমি খুন করিনি। তাই ফাঁসিতে মরতে হল না। এখন আপনি বিশ্বাস করলেই আমার শান্তি।‘
—আপনি বিশ্বাস করলেন?
—এই বিশ্বাস করা, না-করা দুটোই অমূলক আমার কাছে। আমি কোনোটাই চাই না।
তিনজন দার্শনিক এবং একটি খুন
আমাদের কাহিনির একটা ছোট্ট ভূমিকা আছে।
১৪৯৭ খ্রিস্টাব্দের যে দিনটায় দুর্জয় নৌপর্যটক ভাসকো-ডা-গামা ভারতের অভিমুখে জলপথ আবিষ্কারের মনোবাঞ্ছা নিয়ে টেগাস নদীর উত্তাল জলে দাঁড় ফেললেন সেদিনই পৃথিবীর একটা বিরাট অংশের মানুষের জীবনে নতুন অধ্যায় শুরু হতে চলল। ভাসকো-ডা গামা উত্তমাশা দ্বীপের ভয়ংকর ঝড়ঝঞ্ঝা পেরোলেন। আফ্রিকার উপকূলকে চোখের সামনে রেখে মেলিনদা অবধি এলেন। তারপর ভারত মহাসাগরের বেড়া পেরিয়ে ১৪৯৮ সালের মে মাসে মালাবার উপকূলের কালিকটে এসে পৌঁছোলেন। সেখানকার জামোরিনের সঙ্গে তাঁর ভারি খাতির হল। ভারতের ধনসম্পদ পোর্তুগালের লিসবন শহরের বন্দরে যাবার পথ পেল। পোর্তুগিজরা তাদের ব্যাবসার আখড়া করল ভারতে। কিছু জমিও তাদের দখলে এল। ১৫০০ সালের থেকে দশ বছরের মধ্যেই দিউ শহরে একজন পোর্তুগিজ গভর্নর বসলেন। সেই মহামান্য আলফনসো আলবুকার্ক।
কিছুদিনের মধ্যেই পোর্তুগিজরা এদেশের মেয়েদের এক নাগাড়ে বিয়ে করতে শুরু করে। তাদের অধিকাংশেরই স্ত্রী ছিল পোর্তুগিজদের সঙ্গে যুদ্ধে নিহত মুসলমানদের বউরা। আলবুকার্ক এইসব বিয়েতে উৎসাহ দিয়েছিলেন অনাথা বিধবাদের মঙ্গলের জন্য। তিনি বিয়েতে স্বয়ং উপস্থিত থেকে বর-বউকে উপহার দিতেন। কখনো অর্থ, কখনো বস্ত্র, আবার কখনো ফল-ফুল গহনা। শেষে এই বিয়ের তোড় এমনই বেড়ে যায় যে, ১৫১২ সালের পয়লা এপ্রিল আলবুকার্ক পোর্তুগালের রাজা মানুয়েলকে এক মস্ত চিঠিতে তাঁর এই প্রয়াসের বিপুল সাফল্যের কথা জানান। এবং মন্তব্য করেন যে, এরপর হয়ত এত শত বিয়ের অনুরোধ মঞ্জুর করা মুশকিল হয়ে পড়বে।
এরকম এক বিবাহের সূত্রে আমাদের নায়ক মুসা ডা কোসতার জন্ম। মুসার মা ছিলেন পরমরূপসী ফৈজু বেগম। পোর্তুগিজ স্বামী রোবেরতো ফৈজুর নিহত স্বামী মুসার নামে ছেলের নামকরণ করেছিলেন। এই রকম বহু সন্তানের প্রসঙ্গ তুলে ঐতিহাসিক স্যার ডবলিউডবলিউ হান্টার লিখেছিলেন :
The lofty names of Albuauerque and De Silva and De Souza are borne by kitchen boys and cooks.’
অর্থাৎ, আলবুকার্ক, ডা সিলভা বা ডি সুজা ইত্যাদি নামধারী ছেলেদের এখন রসুইখানায় রাঁধুনের কাজ করতে দেখা যায়। বলা অনাবশ্যক যে, বক্তব্যটা হালআমলের মানুষদের ক্ষেত্রে যেমন তেমনিভাবেই যোড়শ শতাব্দীর কোনো সময়ের ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য।
আমাদের নায়ক মুসা কিন্তু ওই ছোটোখাটো কাজে জড়িয়ে পড়লেন না। আজকালকার ভাষায় যাঁদের ইনটেলেকচুয়াল বলা হয় মুসা ঠিক তাই হলেন। বাবার পরিচর্যায় তিনি ভার্জিল পড়েছিলেন, ফৈজু তাঁকে কোরান পাঠ করান। এবং (সত্যিই আমাদের আশ্চর্য করেন ফৈজু!) ওই মা-ও বাবাকে বুঝিয়ে ছেলেকে দর্শনচর্চা করতে পাঠান মহাপন্ডিত আরিয়ার চেট্টির কাছে। আরিয়ার চেট্টি যে ভারতীয় দর্শনে কোনো স্থান পাননি তার মুখ্য কারণ তিনি পনেরো বছর বয়সে শঙ্করাচার্যের বর্ণাশ্রমপ্রথাকে অবাস্তব বলে পরিত্যাগ করেছিলেন। মহাজ্ঞানী শঙ্করের বহু তর্কের সঙ্গে তিনি একমত ছিলেন। কিন্তু বর্ণভেদ ব্যাপারটাকে তিনি ‘বালখিল্যের প্রলাপ’ বলে নস্যাৎ করেন। ভার্জিল পড়া মুসাকে তিনি শিষ্য করায় দক্ষিণের আর সব পন্ডিতেরা তাঁকে বানর বলে চিহ্নিত করেন। তিনি রাস্তা দিয়ে হাঁটলে উন্নাসিক ব্রাহ্মণেরা দুদ্দাড় করে বাড়ি ঢুকে পড়তেন। পাছে তাঁদের আরিয়ার চেট্টির ছায়া মাড়াতে হয়। শেষ বয়সে আরিয়ার গলায় ঘন্টাও বেঁধেছিলেন। যাঁর আওয়াজে ব্রাহ্মণেরা, উচ্চ বর্ণের মানুষরা সিগন্যাল পেতেন।
এই আরিয়ারের কাছ থেকেই মুসা ডা কোসতা এক ভয়ংকর ধ্যানশাস্ত্র শিখেছিলেন। অবয়বহীন বস্তুর কথা তিনি চিন্তা করতে পারতেন। কোনো ঘটনার প্রকৃতি বিচার করে তিনি ঘটনার পূর্বের স্রোত, অর্থাৎ কারণ সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে পারতেন। অ্যাবস্ট্রাক্ট ফিলজফির নানান মার্গে তিনি ঘুরতেন। এবং সর্বোপরি, তিনি কোনো মৃতদেহের মুখ দেখে মৃত্যুর কারণ বলতে পারতনে। না না, আরেকটু বেশি, তিনি চেষ্টা করলে খুন হয়েছে এমন কোনো মানুষের মুখের ধ্যান করে খুনির মুখ পেতে পারতেন। বার কয়েক এরকম হওয়ার পর সাধারণ মানুষ এই বিচিত্র ধর্মের, বিচিত্র মানসিকতার, এবং বিচিত্র শাস্ত্রের মানুষ মুসাকে মনে মনে বেশ ভয়ই পেত। সম্রম করত এবং এই কারণেই দার্শনিকে জামঠাসা দক্ষিণদেশে তাঁর শত্রুরও শেষ ছিল না। মুসা কিন্তু যার-তার অনুরোধে তাঁর শাস্ত্রে ক্ষমতা কাউকে দেখাতেন না। তবে তাঁর মাঝেমধ্যেই লোভ হত স্থানীয় রাজাকে তাঁর ক্ষমতায় মুগ্ধ করে গুরুর ঘণ্টাটা সরিয়ে দেন। কিন্তু গুরুই সেদিকে তাঁকে বারণ করতেন। শাস্ত্র দিয়ে ছোটোখাটো স্বার্থোদ্ধার অন্যায়। নিজের একঘরে হয়ে থাকাটাকে তিনি দৈবের বিধান বলে ব্যাখ্যা করতেন। সম্ভবত ওই একাকীত্বকে তিনি কিছুটা ভাগ্যও মনে করতেন। কেবল প্রচন্ড কামাসক্তি জাগলে তিনি সুদূর সমুদ্রতীরে গিয়ে কোনো মেছুনিকে অর্থ দিয়ে শরীরকে শান্ত করতেন। তবে সুপুরুষ মুসার পক্ষে বড়ো বড়ো গোঁড়া ঘরের মেয়েদেরও শয্যাসঙ্গিনী করায় বিশেষ অসুবিধে হত না। তাঁর মেধার কথা এমনিতেই রটেছিল। তাতে অনেক সুন্দরীই মনে মনে শিহরিত হতেন। তা ছাড়া নিজের অন্তদৃষ্টির বলে তিনি কখনো-সখনো মেয়েদের মুখের ওপর ধ্যানচক্ষু রেখে জেনে যেতেন কে তাঁকে চায়। শোনা যায় এক পরম গোঁড়া ব্রাহ্মণের কন্যা মুসার জন্য পাগল হয়েছিল। সেই ব্রাহ্মণ তখন কন্যাকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করেন। তবে যাক সেসব অন্য কথা।
