সত্যশিবের ঘরটাও প্রায় অন্ধকার; একটা ঘাড় গোঁজা টেবল ল্যাম্পের দাক্ষিণ্যে যেটুকু যা আলো সেখানে। বন্ধু অধ্যাপক অরুণ সেনের এই ফ্ল্যাটে তিনি এই প্রথমবারের মতো অতিথি নন, কিন্তু এইবারই তিনি প্রথম এর সান্ধ্য পরিবেশটা উপভোগ করছেন। ঘরের আলো নিভিয়ে রাখলে বাইরের অন্ধকারটা বড়ো অদ্ভুতভাবে একে ঘিরে রাখে, জাপটে ধরে। অরুণের স্ত্রী নিয়তি সেও অধ্যাপিকা—সেদিন অভিযোগ করেছিল তাদের ম্যানশনটার এক ভৌতিক আবহ আছে। আসলে কবরস্থান উচ্ছেদ করে রেসিডেনশিয়াল কমপ্লেক্স হয়েছে তো! অনেকদিনই সন্ধের অন্ধকারে একা একা লিফটে চড়তে গিয়ে বুকের ভিতরটা ছাৎ করে ওঠে। কখনো কখনো অনুভূতি হয় লিফটে অন্য একজনও উপস্থিত আছে যেন। শুধু দেখা দিচ্ছে না।
সত্যশিব নিজের আর অনির্বাণের গেলাসে হুইস্কি ঢালতে ঢালতে বললেন, ‘মাস্ট হি ডাই? তুলতে গিয়ে একটা শিক্ষাই হল আমার; শিক্ষা না বোধ যাই বল যে, সিনেমায় সারাক্ষণ যে বস্তুটিকে বর্জন করে করে, খন্ড করে, ধ্বংস করে করে এগোতে হয় তা হল বাস্তবতা, সত্য—রিয়্যালিটি।
সে কী! একথা কেন বলছেন স্যার? কাতরোক্তি করল অনির্বাণ। আবছা অন্ধকারে আর সিগারেটের ধোঁয়ায় স্পষ্ট নজরও করতে পারল না বহুপ্রশংসিত, বহুপুরস্কৃত, নিত্য আলোচিত চলচ্চিত্রকারের মায়াময় চোখ দুটো। সেখানে কি ক্ষোভ এখন? নাকি হতাশা? নাকি কান্না?
সত্যশিব বললেন, তুমি গল্প বানিয়ে বাস্তবের ভণিতা করে সিনেমা কর, লোকে বলবে ‘দুর্ধর্ষ! একেবারে জীবন থেকে নেওয়া। আর তুমি সরাসরি বাস্তবের সামনে ক্যামেরা বসাও, লোকে তাকে তথ্যচিত্র বলায় হাজার আপত্তি তুলবে। বলবে ডিস্টর্শন অফ রিয়্যালিটি। সত্যের বিকৃতি।
—তবে বাস্তবকেও তো গুছিয়ে দেখানো চাই সিনেমায়?
-কে স্থির করবে কতটা গোছানো দরকার, কোনটা গোছানো প্রয়োজন, কীভাবে গোছানো হয়। অথচ বাস্তব একটাই। কেবল প্রেক্ষিত অসংখ্য।
—সে তো ‘রশোমন’ দেখে বোঝা গেছিল।
—কিন্তু কুরোসাওয়া সেখানে একটা বাড়তি সুযোগ নিয়েছিলেন, যে সুযোগ আমাদের নেই।
—কোন সুযোগের কথা বলছেন, আপনি?
— কেন, প্ল্যানচেটের মাধ্যমে খুন হওয়া মেয়েটির আত্মা নামানো। তার স্মৃতিতে তার নিজের খুন! আমরা তো বাস্তবে আর চিঙ্কুকে পাচ্ছি না।
অনির্বাণ হেসে উঠল হাঃ! হাঃ! হাঃ করে। হাসতে লাগলেন সত্যশিবও। অনির্বাণ বলল, আমরা কিন্তু ডেড ম্যান ওয়াকিং’ ছবির রাস্তায় যেতে পারি। সত্যশিব বললেন, কীরকম?
–আমরা কোনো সন্ন্যাসিনীকে নিয়োগ করতে পারি অবনীর কাছাকাছি হয়ে ওর নিজের সত্যটুকু অন্তত কবুল করিয়ে নিতে।
—সেও তো এক ধরনের মেলোড্রামা, অনির্বাণ। কী প্রমাণ হয় যদি ও কবুলই করে ও খুন করেছে? বড়োজোর এটুকুই যে ও এক ধর্ষণকারী খুনে। তাতে পুলিশের অত্যাচার, বিচার বিভাগের উদাসীনতা বা নৃশংসতা, মৃত্যুদন্ডের বীভৎসতার কিছুই হেরফের হয় না। হেরফের হয় না এই সামান্য সত্যেরও যে মোটা পয়সা নিয়ে মামলা লড়তে পারলে ন্যায়কেও নিজের পক্ষে টানা যায়। আফটার অল, হোয়ট ইজ লিগ্যাল আগুমেন্ট অ্যাবাউট? ইট ইজ অ্যাবাউট লজিক, নট টুথ। আদালতের তর্ক তো লজিক, বুদ্ধির ব্যাপার; কদাচিৎ সত্যের ব্যাপার। কালো কেন কালো বা সাদা কেন সাদা এর কি সত্যিই কোনো প্রমাণ আছে? কাজেই অবনীর অপরাধ একটা উদাহরণ মাত্র, যা তথ্যচিত্রে তুলে ধরতে গিয়ে আমি বাস্তবের নানা মুখোশ, নানা ভড়ং, নানা দৌরাত্মের চেহারা দেখলাম। অবনী বা ওর মতো মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্তরা, আমি দেখলাম, কতকগুলো প্রতীক মাত্র। ওদের মৃত্যু দিয়ে অনেক কিছুকেই বাঁচিয়ে রাখতে হয়, যেমন সরাসরি বাস্তবকে মেরে বাঁচাতে হয় সিনেমাকে। তোমার মতো আমিও পরিচালক জঁলুক গোদারের ভক্ত, কিন্তু এখন আর আমি মানতে পারি না ওঁর সিনেমার সংজ্ঞা–
Cinema is the reality 24 times a second.
—সিনেমা তা হলে কী?
–আমি জানি না। হয়তো বাস্তবের ভূত, কল্পনার রক্তমাংস। অনির্বাণ ওর পকেট থেকে আস্তে আস্তে চার হাজার টাকার একটা চেক বার করে সত্যশিবকে দিল। পরিচালক জিজ্ঞেস করলেন, এটা কী অনির্বাণ?
—আপনার দেওয়া সেই চেকটা ভাঙাইনি।
–তো ফেরত দিচ্ছ কেন?
—আপনার ছবিই হল না, অত টাকা জলের মতো বয়ে গেল, কী করে ওই টাকা নিই স্যার?
-এত বেশি বিবেক দংশনের কী আছে, অনির্বাণ? যে প্রতিশ্রুতি নিয়ে মৃত্যুদন্ডের
বিরুদ্ধে ছবি করতে নামলাম তার ভগ্নাংশও পূরণ করা গেল না। আলিপুর সেন্ট্রাল জেলের অবনী, হায়দরাবাদের শম্মু খান, এলাহাবাদের রামরতন কি পানজিমের অ্যালেক ডি সা-কে কি আমরা বাঁচাতে পারলাম?
‘আলিপুর জেলের অবনী’ মানে? কথাটা জেলখানার পাগলা ঘণ্টির মতো বাজলে লাগল অনির্বাণের মাথার ভিতরে। খবরের কাগজে তো কোনো খবর ছিল না ওর ফাঁসির। এত চাঞ্চল্যকর ঘটনার এরকম নীরব পরিণতি কেন?
অনির্বাণ জিজ্ঞেস করল, অবনীকে কি হ্যাং করা হয়ে গেছে? কাগজে তো কিছু দেখিনি।
সত্যশিব চেকটা অনির্বাণকে ফেরত দিতে দিতে বললেন, যদি তেমন মনে কর তো চেকটা ভাঙিয়ে টাকাটা অবনীর বাপ-মা–বোনদের পাঠিয়ে দিতে পারো। দু-সপ্তাহ হল অবনী সলিটারি জেলে হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছে। মৃত্যুর আগে একটা ছোট্ট নোট লিখেছিল আমার নামে। আমি সেটা নিতেই কলকাতা এসেছি।
