আর আজ সারাদিনের শুটিং সেরে গোধূলির আলোয় সত্যশিব আর অনির্বাণ ভাবতে বসেছে। শেষ অবধি সত্যিই কী জানা গেল!
অনির্বাণ বলল, এটুকু জানলাম যে অবনীর পরিবার বাস্তবিকই একঘরে হয়ে গেল খেড়োশোলে।
সত্যশিব বললেন, মেয়েগুলোর কালকের হিংস্র আক্রমণ যতখানি ভাইকে বাঁচানোর ততখানিই অভিমান ও আক্রোশে। ওরা জেনে গেছে ওদের আর বিয়ে হওয়া কপালে নেই।
-খুন সম্পর্কে ওদের কৌতূহলের বেশ অভাব দেখলাম মনে হচ্ছে?
—এটা আমারও মনে হয়েছে, অনির্বাণ।
–তার কারণ?
–ওদের বোধ হয় একটা ছোট্ট যুক্তি আছে ভিতরে-ভিতরে।
–কীরকম?
—ওদের দাদা খুন করে থাকলেও সেটা সে নিজের কারণে করেনি। কেউ না কেউ ওকে দিয়ে করিয়েছে।
অনির্বাণ এই ব্যাখ্যাটায় কিঞ্চিৎ অবাকই হল যেন। দাদা যেখানে ক্রমাগত বলে আসছে। সে খুন করেনি সেখানে বোনেরা কোন আক্কেলে ভাবতে বসবে সে করলেও করে থাকতে পারে? ও বলল, তার মানে, স্যার, আপনি বলতে চান বোনদের মনে দাদার খুন নিয়ে সন্দেহ আছে?
সত্যশিব বললেন, না মোটেও তা বলছি না। ওরা বিশ্বাস করতে চায় তাদের দাদা খুন করেনি। কিন্তু ওদের এই শঙ্কাও আছে যে সমাজে সারাক্ষণ বহু কিছুই মানুষের ইচ্ছের বিরুদ্ধে ঘটে। খুব সাধারণ স্তরে এমন ঘটনা হল ওদের বউদিকে নিয়ে কেচ্ছা। খুব জটিল স্তরে এমন ঘটনা হল হঠাৎ এক সকালে খবর পাওয়া যে দাদা একজন সুন্দরী যুবতীকে খুন করে পালিয়ে এসেছে। কোনো কাজটাই হয়তো বউদি বা দাদার অপকর্ম নয়। কিন্তু হয়েছে। সারাক্ষণই এসবই ওদের জীবনে হয়, হতেই তাকে। এগুলোর ব্যাখ্যা ওরা জানে না, এসব নিয়ে গভীর কৌতূহলও ওদের কোনোদিনই গড়ে ওঠে না।
অনির্বাণ প্রশ্ন করল, আপনি বলছেন ওরা জানতেও চায় না ওদের দাদা এই খুনটা করেছে কি করেনি?
সত্যশিব এবার একটা অদ্ভুত কণ্ঠস্বরে বললেন, যেন তথ্যচিত্রের ন্যারেশন লাইন পড়ছেন —দুঃস্থ। হতদরিদ্র মানুষের খুব বেশি সত্য জানার আগ্রহ বা অভ্যেস থাকে না, অনির্বাণ। সত্যের উলটো দিকে মিথ্যে, মিথ্যের বিপরীতে সত্য। অর্থাৎ সত্য বা মিথ্যের দুটো দিক, পক্ষ আর বিপক্ষ। মিনতিদের শুধু একটাই পক্ষ—দাদার পক্ষ। দাদাকে বাঁচাতে হবে, না হলে ওরা নিজেরাও মরে যাবে। সেখানে দাদা খুনি কি খুনি নয়, এই কৌতূহলের বিলাস ওদের থাকতে পারে না।
অনির্বাণ বলল, সত্যমিথ্যার কৌতূহলও কি তা হলে একটা ক্লাস প্রিভিলেজ, শ্রেণি সুবিধা স্যার?
সত্যশিব বললেন, অতখানি সরলীকরণ করা বুঝি ঠিক নয়, অনির্বাণ। তবে হ্যাঁ, যখন দেখি বর্তমান পুলিশি ব্যবস্থা, বিচার ব্যবস্থায় ন্যায়বিচার পেতে কী পরিমাণ কাঠখড়, টাকাপয়সা পোড়াতে হয় তখন তো মনে হয়ই সত্যের মুখ শুধু হিরন্ময় পাত্রের দ্বারা অবগুণ্ঠিত নয়, শুধু সূর্যের প্রখরতায় ঢাকা নয়, সোনার টাকার দ্বারাও আড়াল। তুমি তো কুরোসাওয়ার ‘রশোমন’ দেখেছ; বলো তো একই ঘটনার কত বিচিত্র বয়ান, ভার্শান। টাকা ওড়ালে এই ভার্শানগুলো হাজার হাজার গুণ বেড়ে যায়। নয় কি?
অনির্বাণ মাথা নেড়ে বলল, রাইট!
সূর্য পাহাড়ের পিছনে ঢলে পড়েছিল, আর ঝপ করে প্রায় একই সঙ্গে অন্ধকার আর শীত পড়ল। অনির্বাণ ফের তাকাল রুখু প্রান্তরের মধ্যে নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে থাকা অবনীদের ভিটেটার দিকে। বুড়ো বাপ, মা, বোনেরা সব ঢুকে পড়েছে খড়ের ছাউনির ঘরে, কিন্তু একটাও পিদিম, হ্যারিকেন বা কুপি জ্বলে ওঠেনি। একটা নেড়ি কুকুর ছোঁক ছোঁক করছে ফেলা ছড়ানো খাবারের টুকরোর জন্য। অবনীর ছোটোবোন জয়াকে যে টিফিনকেকটা দিয়েছিলেন নীরেন্দু সেটা অবহেলায় পড়ে আছে রিফ্লেক্টরের পাশে। মোড়কটাও ছাড়ায়নি জয়া। কেকটা হাতে নিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল অনির্বাণকে, দাদাকে কীরকম দেখলেন সেলে? তারপর যেন আপন মনেই বলল আবছাভাবে হেসে, একেক দিন রাতে মনে হয় দাদা এসে কড়া নেড়ে ডাকছে, জয়া! জয়া! দোর খোল। আমি এসেছি।
অন্ধকার আরও ঘন হতে অবনীদের ভিটেটাকে মনে হল ভূতে পাওয়া। অবনীর ভূতে পাওয়া। ফাঁসির ঝুলে থাকা আসামিও নিশ্চয়ই ভূত হয়, ওরা তো জীবন-মৃত্যুর মধ্যেকার সত্তা। ভূতও তো প্রায় তাই, না জীবনের, না পুরোপুরি মৃত্যুর। এই সবই ভাবতে ভাবতে নিজের মনে কখন অনির্বাণ আবৃত্তি করা শুরু করল ওর প্রিয় কবির এক প্রিয় কবিতা থেকে–
দুয়ার এঁটে ঘুমিয়ে আছে পাড়া,
কেবলই শুনি রাতের কড়া নাড়া,
অবনী, বাড়ি আছ?
৬.
দু-দুটো বছর কেটে গেল ফিলমের কয়েকটা রিলের মতো। সত্যশিবের ডকুমেন্টারি শেষ হল না। দূরদর্শনে দেখানোর সুযোগ করে দেয় এমন একটা স্পনসরও জুটল না। ভদ্রলোকের ব্যাঙ্ক ব্যালান্স নিঃশেষ হয়েছে খান চারেক এপিসোড তুলতেই। মৃত্যুদন্ড রদের পক্ষে কোনো সওয়ালই করা গেল না টিভির পর্দায়। পরিচালক কিছুতেই আর ফিরে যেতে পারছেন না ফিচার ছবিতে। মাস্ট হি ডাই?’ তথ্যচিত্রের জন্য যে দেশজোড়া চাঞ্চল্য দেখা দিয়েছিল এক সময় এখন তার সবটুকুকেই ফাঁকা বুলি আর পরিহাস বলে জ্ঞান হয় ওঁর।
পার্ক সার্কাসে যে-ফ্ল্যাটে বসে কথা হচ্ছিল সত্যশিব আর অনির্বাণের তার জানলা দিয়ে দূরে চার নম্বর পোলটা চোখে পড়ে। গাড়ির হেডলাইট আর টেল লাইটের মেলা যেন। আর তার পিছনে ঘন নীল অন্ধকার।
