-কিন্তু আপনি মানেননি?
—এটা মানা যায় না, স্যার। জানেনই তো কোনো বোলোকের বাড়ির পুত্রবধূ খুন হল; টাকা খাইয়ে মৃত্যুদন্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন হল। আমার বেলায় বড়োলোক কাউকে বাঁচাতে আমাকে মুরগি করা হল।
-আপনি কার কথা বলছেন?
—চিঙ্কুদের আত্মীয়ই কেউ হবে। হয়তো খুড়তুতো ভাই কেউ।
–কেন ভাবছেন সেটা?
— না হলে মা, মানে ভাবিজি, বাড়িতে ওদের রেখে চলে যায়?
–কী করে জানলেন তখন ঘরে কেউ ছিল?
–না হলে বেরুল কী করে?
–ওদের বক্তব্য আপনিই কাজ সেরে ভেগেছেন।
-বটে? তা হলে আড়াইটে থেকে তিনটের মধ্যে খুন হল, ভাবি তক্ষুনি ফোন করলেন চিঙ্কুর বাবাকে অফিসে। সেখানে ওর নিজের দুই ভাইও হাজির। অথচ ওঁরা বাড়ি ফিরলেন পুরোদিনের ব্যাবসা চুকিয়ে সন্ধে আটটায়। এটা জানেন কি?
-জানি, কোর্ট প্রোসিডিংসে তেমনটাই দেখেছি।
–দেখুন স্যার, একটা কথা বলব?
—নিশ্চয়ই! আপনার কথা শুনতেই তো আসা।
—ওরা হিরের ব্যাবসা করতে পারে, কিন্তু ওদের ভিতরটা কয়লার চেয়েও কালো।
—আর পুলিশও বলতে চান..?
—পুলিশকে নিয়ে তো আমি কিছুই বলতে চাই না। চিঙ্কুর দেহে পাওয়া শুক্র আর আমার শরীরের শুক্র মিলল না বলে বলল বেশি দেরিতে টেস্ট হলে
ফল ধরে না।
–সেটা তো মেডিক্যালি ঠিকই।
–কেন, সন্দেহভাজন খুড়তুতো ভাইদের শরীরের শুক্র তো তখনই পরীক্ষা করা যেত। করেছে কি?
—ওরা তো কেউ সন্দেহের তালিকাতেই ছিল না।
—থাকবে কেন স্যার? সারাসন্ধে বসে তো সেটাই রফা হল নিজেদের মধ্যে। ওরা যাকে বলে ‘জাতি মামলা’, নিজেদের সমস্যা, সেটা অফিসে বসে মেটানো হল। বলি হলাম আমি। পুলিশ, আদালত, নারী সংগঠন কেউই তো আমার কথায় কান দিল না। কেউ জানল না আমার রিটায়ার করা বুড়ো বাপটার কী হাল হল। আমার বোনদের জন্মের মতো বিয়ে কেটে গেল। মা হার্টের রুগি, ফিটের ব্যামোয় পড়ল। শুধু আমি ঠিক ঠিক টিকে রইলাম নিজের পায়ে হেঁটে ফাঁসি ঘরে যাব বলে। তাই না? এত কিছুর পর একটা জঘন্য মিথ্যে স্বীকার করে নিয়ে বাঁচতে হবে তা হলে?
—শেষ অবধি রাষ্ট্রপতির ক্ষমা না এলে কী করবেন?
–তাই বা কী করে বলি বলুন। যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণই তো আশ।
-আপনি এখনও তা হলে বাঁচার আশ দেখেন?
অবনী চুপ করে মাথা নীচু করে বসে রইল। সত্যশিবের ধারণা হল অনির্বাণের প্রশ্ন আর অবনীর উত্তর সব ফুরিয়ে গেছে। তিনি প্যাকআপ অর্ডার দেবেন বলে সময় গুনছিলেন। হঠাৎ মাথা তুলে সেই সরল, নির্ভয় দৃষ্টি হেনে অবনী বলল, কত জন্তু, কত কীটপতঙ্গ। সেখানে একটা সামান্য মানুষের বাঁচার জায়গা হয় না?
অনির্বাণ বলল, সেই প্রশ্নটাই তো আজ আমরা তুলতে চাইছি জগতের সামনে। আপনি দোষী কি নির্দোষ আমরা জানি না। আমি অন্তত জানতেও চাই না। কিন্তু আমরা চাই না আপনার বাঁচার অধিকারটুকু কেউ কেড়ে নিক।
৫.
সূর্য ঢলে পড়েছে শুশুনিয়া পাহাড়ের গায়ে। শীতের গোধূলিতে দৃশ্যটা একটা ছবির চেহারা নিয়েছে। দুটো ভাঙাচোরা মোড়ায় বসে সত্যশিব আর অনির্বাণ সারাদিনের কাজের কথা ভাবছিল।
অদূরে একটা গাছে হেলান গিয়ে বসেছিলেন ক্যামেরাম্যান নীরেন্দ্র সেন, তাঁর গা ঘেঁষে স্টিল ফটোগ্রাফার সৌম্য ঘোষ। দুটো দিনই বড় হ্যাপা গেছে নীরেন্দু আর সৌম্যর। গতকাল তো কোনো মতে ঢিল আর পাথরের বৃষ্টি থেকে বাঁচানো গেছে ক্যামেরাটা। একটা ঢিল সাঁ করে এসে জমেছিল নীরেন্দুর চশমার ডাঁটিতে। তখন কী হচ্ছে কী! আপনারা কি পশু হয়ে গেলেন?’ বলে অবনীদের ভিটের দিকে তেড়ে গেছিলেন দশাসই সৌম্য।
তাতে কাজ হয়েছিল। অবনীর বোনেদের বোধহয় সংবিৎ ফিরল। এতক্ষণ ভূতে পাওয়া তিন ভৈরবীর মততা ওরা মাটির থেকে পাথর কুড়োচ্ছিল আর শুটিংয়ের দলটির দিকে ছুড়ছিল। সৌম্যকে ধেয়ে আসতে দেখে একটু ক্ষান্তি দিল। ক্রমে সৌম্য গতি সামলে নিয়ে প্রথমে থামলেন, পরে একটু একটু করে হেঁটে কুয়োটার ধারে এসে দাঁড়ালেন। বললেন, আমরা আপনাদের ভাইয়ের প্রাণ বাঁচানোর জন্য লড়ছি আর আপনারা এসব কী করছেন?
বোনদের মধ্যে থেকে মিনতি এগিয়ে গিয়ে বলল, আমাদের অনেক উপকার করেছেন আপনারা। আর উপকারে কাজ নেই। আপনারা আসুন। আমাদের কথা বলা বারণ।
সৌম্য ছাড়ার পাত্র নন–কাদের বারণ? মিনতি দর দর করে ঘামছিল, তাই আঁচল দিয়ে মুখ মোছা শুরু করল। সৌম্য ফের জিজ্ঞেস করলেন, কার বারণ?
—চ্যাঁচাতে পারছি না। কাছে আসুন। সৌম্য কুয়োতলা ছেড়ে মিনতির দিকে এগোলেন। মিনতি বলল, প্রতিবেশীদের বারণ?
সৌম্য চমকে উঠে হেসে ফেললেন। প্রতিবেশী? প্রতিবেশী কোথায়? তিন মাইলের মধ্যে তো আরেকখানা বাড়িও নেই!
মিনতি বলল, খেড়োশোলে এইরকম ছাড়া ছাড়া করে বাড়ি বসে।
-তা হলে বারণটা কে করলে? মিনতি ধপ করে একটা পাথরের উপর বসে পড়ে বলল, পার্টির বারণ।
সৌম্য বললেন, ও তাই বলুন! গতকাল এই ঘটনার পর সত্যশিব ইউনিট নিয়ে ফিরে গেছিলেন দুর্গাপুর। তারপর ফোন লাগালেন তথ্যমন্ত্রীকে, স্যার, ভালো ছবির জন্য এত করছে আপনাদের সরকার, আর আমার এই ডকুমেন্টারির জন্য ক-টা ইনটারভিউ পাওয়া যাবে না? এখানে শুনেছি দলের বারণ।
মন্ত্রী জটিল সমস্যার মধ্যে সৌজন্যবোধ বা ধৈর্য হারাননি। তিনি আবার সত্যশিবের চলচ্চিত্রকর্মের একনিষ্ঠ ভক্ত। তিনি বললেন, আপনারা কাল ফের একটা ট্রিপ করুন। আমি এর মধ্যে যা করার করছি। ফোন নামিয়ে সত্যশিব বলেছিলেন অনির্বাণকে, মনে হচ্ছে কাজটা কাল হবে। তবে কতটা কী জানা যাবে আই ডোন্ট নো।
