৪.
শ্যুটিং ব্রেকে বাইরে এসে দাঁড়াল অনির্বাণ। ওদের বার করে দিয়ে ফের গরাদে তালা ঝুলিয়ে দিল গার্ড এসে। অনির্বাণ দেখল পর পর তিনটে সলিটারি সেল, তাতে তিন বন্দি মৃত্যুর ঘণ্টার জন্য অপেক্ষা করছে। বাকি দু-জন জুলজুল করে দেখছে তৃতীয় সেলের ভিজিটারদের যাতায়াত। ওদের মধ্যে একজনের বিহ্বল দৃষ্টি দেখে অনির্বাণের ছেলেবেলায় দেখা একটা বাংলা ছবির দৃশ্য মনে পড়ল।
জরাসন্ধের লৌহকপাট উপন্যাস অবলম্বনে তপন সিংহের ছবি। তাতে একজন কয়েদির আত্মহত্যায় পাগলা ঘণ্টি বেজে উঠেছে জেলখানাময়। তখন বৃদ্ধ আরেক কয়েদি সম্ভবত ছবি বিশ্বাসের রোলটাই, গরাদ ধরে বিস্ময়ের সঙ্গে ভাবছে, আবার কী সর্বনাশ হল কোথায়? ভাবছে অবাক হচ্ছে। মন খারাপ হচ্ছে, তারপর অকারণ হাসতে লেগেছে শেষে।
অনির্বাণের পিঠে হাত রাখলেন সত্যশিব, লুক হিয়র মাই বয়, অবনীর ভার্সান একটা আমরা পেয়েছি। টু অর ফলস। এখন তুমি সরাসরি ইন্টেরোগেশনে যাও।
—কিন্তু স্যার, আমি তো আদালত নই?
এবার অনির্বাণের পিঠটা সামনে দাবালেন সত্যশিব, আরে ভাই, হোয়ট ইজ আ কোর্ট আফটার অল? কমন সেন্স, কালেক্টিভ ইন্টেলিজেন্স, সোশ্যাল উইজডম, নয় কি?
–এক-শো বার।
–তা হলে সেই সম্মিলিত শুভবুদ্ধির সঙ্গে ওকে ইন্টার্যাক্ট করতে দাও। একটা সংলাপ চলুক। জনগণ দেখুক লোকটাকে কতখানি অপরাধী ঠাওরানো যায়। ওর বাঁচা উচিত কি অনুচিত।
-তা হলে ওকে কী জিজ্ঞেস করব?
—সে আমি জানি না। তুমি সাংবাদিক, সেসব তুমি ভাবো।
অনির্বাণ চিন্তিত মুখে প্রায় স্বগতোক্তির মতো বলল, দেখি!
ব্রেক শেষে অবনীর ঘরে ঢুকে অনির্বাণের মনে হল লোকটা সেই সকালের প্রথম দর্শনের মানুষটাই হয়ে পড়েছে। সেই সরল, গোবেচারা চাহনি। তাতে প্রাণ ভিক্ষার আর্তি আছে কিন্তু প্রাণ হারানোর ভয় নেই। সাধারণ মানুষের মতো ওর নিজেরও যেন একটা কৌতূহল আছে নিজের সম্পর্কে। কিংবা ওই খুনটা সম্পর্কে, যদি সেটা ও নিজে না করে থাকে। করে থাকলেও কৌতূহল মেটেনি; ও বুঝে পাচ্ছে না পুলিশ, আদালত, নারী সংগঠনগুলো কেন ভাবতেই চাইছে না ও খুন নাও করে থাকতে পারে তো! একটা লোক যখন পৃথিবীর সমস্ত অভিযোগের মুখেও অবিরত বলে আসতে পারল, আমি খুন করিনি!
সত্যশিব ‘অ্যাকশন!’ কথাটা উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গেই অনির্বাণ প্রশ্ন করল, অবনীবাবু, আপনি কি খুন করেছেন?
স্পষ্ট জবাব এল অবনীর, না!
–কেন বলছেন না?
–করিনি বলে স্যার।
—কোনো খুনি কি কখনো খুন করে বলে করেছি?
—আমি তো খুনি নই! এই স্পষ্ট উচ্চারণে অনির্বাণ মনে মনে তারিফের স্বরে বলল, বিউটিফুল! মুখে বলল, তা হলে আপনি কী?
—পরিস্থিতির ফেরে পড়া এক গরিব চাকুরে।
–আপনার এ সবের থেকে রেহাই পেতে কখনো মরে যেতে ইচ্ছে করেনি?
–করেছে।
–কখন?
—যখন শুনেছি চন্দনার পেটে আমার ছেলেকে আমার নয় বলে কুৎসা করেছে।
মুহূর্তের মধ্যে অনির্বাণের গলা ঠাণ্ডা মেরে গেল। অবান্তর কাশি এল। সত্যশিব নির্দেশ দিলেন ‘স্টপ’! কাজ বন্ধ হল সাময়িক। অবনী মিনতি করল, একটা সিগারেট খাই, স্যার? অনির্বাণ বলল, প্লিজ! আর আপনারই একটা চারমিনার আমায় দিন। একটা কড়া ফ্লেভার চাই। অবনী ওকে একটা চারমিনার দিয়ে আরেকটা বাড়াল সত্যশিবের দিকে। সত্যশিব ততক্ষণে ওঁর ক্ল্যাসিকটা ধরিয়ে ফেলেছেন। বললেন থ্যাঙ্কস!
ফের ‘লাইটস!’ ‘সাউণ্ড!’, ‘রোল!’, ‘অ্যাকশন! হল এক প্রস্ত। অনির্বাণ জিজ্ঞেস করল, আপনার ছেলেটা যে আপনার নয় এটা রটল কেন? অবনী বলল, কারণ বিয়ের পরের ওই তিনদিন ছাড়া আমি তো থাকিনি ওর সঙ্গে।
—তাতে কী হল?
—গ্রামের মূর্খ লোকদের মধ্যে যা হয়। ওদের মধ্যে অনেক বউই তো সারাজীবন হত্যে দিয়েও বাঁজা থেকে যায়। তারাই করে এসব।
—তা হলে আপনি মানেন যে ছেলে আপনার?
—নিশ্চয়ই! বাবা তো ছেলেকে এনে দেখিয়েও গেছেন জেলে।
–বাজে কথা রটার আর কারণ?
—আমার কেসের কথা শুনে বউ যে বাড়ি ছেড়ে চলে গেল।
-তারপর?
-তারপর কুৎসামন্দ শুনে বাপের বাড়ি ছেড়ে ও আশ্রমে চলে গেল।
—এটাই তা হলে সব চেয়ে বড়ো কষ্ট আপনার জীবনে?
-না।
–বড়ো কষ্টটা কী, অবনীবাবু?
–বড়ো কষ্ট হল…
অবনীর চোখই প্রথম ছলছল করে উঠল।
…বড় কষ্ট হল বউও ভাবে আমি চিঙ্কুকে ধর্ষণ করেছি।
-কোথায় জানলেন সেটা?
–বোন মিনতিকে বলেছিল চলে যাওয়ার দিন।
–কেন বলেছিল বলে মনে হয়?
এবার সর্বপ্রথম লজ্জাও পেল মনে হল অবনী। ফুক ফুক করে সিগারেটে টান দিল দুটো। অনির্বাণ ফের জিজ্ঞেস করল, কেন মনে হয় ওকথা ও বলেছিল?
—কারণ ওই তিনদিনে ওর ধারণা হয়েছিল আমার দেহের খিদে বড্ড বেশি।
অবনী ওর সিগারেটটায় শেষ টান দিয়ে ছুড়ে ফেলল গরাদের বাইরে।
অনির্বাণ বলল, আপনার খুব বাঁচতে ইচ্ছে করে?
অবনী হাসল, কার না ইচ্ছে করে, স্যার?
অনির্বাণ বলল, ধরুন যদি আদালত বলে যে দোষ স্বীকার করলে মৃত্যুদন্ড রেয়াত হবে; করবেন?
খুব দৃঢ়ভাবে অবনী বলল, না, পারব না।
-কেন, এই যে বললেন খুব বাঁচতে ইচ্ছে করে।
-তাই বলে যা করিনি তাই স্বীকার করতে হবে? আমি বাঁচতে চাই, আমি গরিব, আমার পরিবারের আমাকে প্রয়োজন আছে, সব মানছি। কিন্তু আমি তো মানুষ!
অনির্বাণ ফের কথা হারিয়ে ফেলে হাসল। অবনী বলতে থাকল, আপনি কি জানেন প্রায় এই প্রস্তাব ওরা আমায় দিয়েছিল? আমাকে পুলিশ, আমার উকিলকে ওদের উকিল।
