পবন চলে গেল, আমি গেট বন্ধ করে ছাদে যাওয়ার জন্য ফ্ল্যাটে লিফটের কাছে দাঁড়িয়েছি, দেখি ভাবি নামছেন। এইসময় হপ্তায় একদিন করে উনি পুজো দিতে যান। বললেন, তুমি নাকি চলে যাচ্ছ? পবন কোথায়? বললাম, জ্বরে পড়েছে। আমাকেই চালিয়ে যেতে হবে। ভাবিজি গজর গজর শুরু করলেন, বিমারিমে গিরনা তুমলোগোকো আদত হো গিয়া। সমঝ নহি পাতে ইয়ে সব। চলো, গেট খুলা করো।
গেট খুলে ভাবিকে বার করে আর গেট লাগালাম না। পাটে পাটে লাগিয়ে হুড়কো গুঁজে ছাদে গেলাম পাম্প অফ করতে। দেখি তখনও একটু ওভারফ্লো হয়নি। বোধ হয় আরও পাঁচ-সাত মিনিট যাবে। ভাবলাম ফুল ট্যাঙ্ক করি, পবন আবার কবে আসে কে জানে!
একটা সিগারেট ধরিয়ে বসলাম। আটতলার ছাদে শীতের মরা রোদে গোটা শহরটাকে বড়ো ভালো লাগছিল স্যার। যেমন রোদে দেশে আমাদের দাওয়ায় বসে পিছনের শুশুনিয়া পাহাড় দেখে আরাম হত। খুব ভালো লাগছিল। বড় মন টনটন করছিল বউটার জন্য। আসার আগে বলেছিলাম, পরের বার তোমাকে ওই পাহাড়ের মাথায় নিয়ে বসব।
হঠাৎ খেয়াল হল ওভারফ্লো করছে। আমি পাম্প বন্ধ করলাম। ফের একবার ঘুরে দেখলাম শহরের শোভা। তারপর লিফটে এসে বেতাম টিপে দেখি কোনো লিফটেরই সাড়াশব্দ নেই। আশ্চর্য! এই অবেলায় দু-দুটো লিফট কোথায় গিয়ে রুখে গেল? ইশকুলের বাচ্চাগুলোও তো নেই যে বোতাম টিপে টিপে শুধু ওঠানামা করবে। আমি আর না দাঁড়িয়ে নামা শুরু করলাম।
সাততলায় নামলাম। লিফট নেই। ছ-তলায় নামলাম। এক ব্যাপার। পাঁচে। কোথায় লিফট! চারে ধুস! কী বলব স্যার, তিনে নামছি যখন বুকটা লাফাচ্ছে। এই বুঝি চিক্কর খপ্পরে পড়লাম। কী হচ্ছিল কী!’ বলে খিচিয়েই উঠল হয়তো। গরিব মানুষের তো সবেতেই দোষ স্যার। বললেই হল, ছাদে দাঁড়িয়ে ঘুড়ি ওড়াচ্ছিলে!
কিন্তু তিনিও বড়ো শান্ত দেখলাম, স্যার। কিন্তু হায়, ও কী? দুটো লিফটই হাট করে খোলা। তাজ্জব ব্যাপার! এ সময়ে এসব ইয়ার্কি কে করছে? ঘুরে দেখি চিঙ্কুদের ফ্ল্যাটের দরজা হাট করে খোলা। পরিষ্কার বুঝলাম স্যার এ এক চাল মেয়েছেলেটার আমাকে অপদস্থ করার। এর সরাসরি মোকাবিলা করাই ভালো।
গিয়ে দরজার সামনে দাঁড়ালাম, কিন্তু ঢুকলাম না। তিন তিনবার বেল দিলাম। কোনো সাড়াশব্দ নেই। ফের দু-বার বাজালাম, নো রিপ্লাই। তখন এক পা দু পা করে ঢুকে ঘাড় ঘুরিয়ে চিঙ্কুর ঘরের দিকে চোখ মেলে আমি পাথর হয়ে গেলাম। ভয়ানক একটা তাপ বিদ্যুতের মতো খেলে গিয়ে শরীরটা বরফ হয়ে গেল।
চিক্কর ঘরে খাটের নীচে মেয়েটি ছিন্নভিন্ন হয়ে শুয়ে আছে। চোখ দুটো ঠিকরে বেরিয়ে আসছে, মুখে হাতে রক্ত। পরনের হাফহাতা শার্ট আর জিনস অবশ্য পরাই আছে। একরাশ রাগ নিয়ে ঢুকেছিলাম ওর প্রতি, বেরিয়ে এলাম একরাশ কান্না নিয়ে। বুঝতে পারলাম না কী
করা কর্তব্য আমার, কাকে ডাকব, কাকে কী বলব। আমি বোবা মেরে গেছি ততক্ষণে। এক নিঃশ্বাসে ছুটলাম আমাদের ডেরার দিকে। রাস্তায় দেখলাম ভাবি পুজো সেরে ফিরছেন। ওঁকে দেখে বুকের সব দমই যেন ফুস হয়ে গেল।
ঘরে ফিরে দেখি পবন দেয়ালে পিঠ দিয়ে চৌকির উপর বসে। আমার চেহারায় কী দেখল কে জানে, তড়াক করে জমিতে নেমে পড়ে বলল, তুই ঠিক আছিস তো অবনী?
কিন্তু আমার কথা ফোটে না। বলতে চাইছি চিকু, কিন্তু চি-চি করে থেমে যাচ্ছি। পবন ধমকে বলল শেষে, চিঙ্কু তোকে অপমান করেছে?
—ন ন ন ন না! ও…ও…ও…ও ম মরে গে গেছে!
–মরে গেছে চিঙ্কু?
–খুন!
পবন তড়াক করে লাফিয়ে গিয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করে দিল। আমায় বলল, কে করল? কাঁপতে কাঁপতে বললাম, জানি না।
-জানিস না?
–না।
-ঘুমাচ্ছিলি?
–ছাদে ছিলাম।
—আওয়াজ পাসনি?
-না।
—কাউকে আসতে যেতে দেখলি?
-না।
—কাউকে সন্দেহ হয়?
–কাকে করব বল?
–তা হলে তুই গেলি।
–কেন রে?
–তার মানে তুই করলি।
–কী বলছিস পবন?
–আমি কী বলছি? পুলিশ বলবে।
–বললেই হল?
–পুলিশ বললেই তো সব হয়, জানিস না? উ শালারা কোনোদিন সত্যি বলেছে?
—তালে যাই ভাবির কাছে? দেখি?
–খবরদার না! এক্ষুনি খানিকটা রক্ত তুলে তোর গালে মাখিয়ে বলবে, তু কিয়া!
–তা হলে কী করব আমি পবনা?
—জামাকাপড় নে, টাকাকড়ি নে, এই নে তোর বাক্স আর যেখানে খুশি ভেগে যা। হারিয়ে যা। আর ফিরে আসিস না। তুই আমি তো গরিব রে শালা, আমাদের পালিয়ে পালিয়ে বাঁচতে হয়। বড়োলোক হলে পুলিশের থানায় গিয়ে বসে থাকতিস।
যখন সব নিয়েটিয়ে বেরিয়ে আসছি পবন হঠাৎ হাত চেপে ধরল, অবনী, একটা কথা বলবি মাইরি?
–কী কথা বল?
-তুই করিসনি তো?
–মা কী কসম পবনা। কিন্তু কেন বললি একথা?
-কী জানি, কেমন একটা ভয় করত। তোর এত রাগ, মাথা গরম, সত্যিই হয়তো চিঙ্কুকে একদিন ধর্ষণ করে ফেলবি।
—আর খুনও করে দোব, তাই তো?
–না না না না। এ আমি কী বলছি! তুই পালা।
–আর তুই?
—কী জানি কী পিটানি আছে পুলিশের।
—যদি আসল খুনি ধরা পড়ে তো আমায় খবর দিবি তো?
–কোথায় দেব?
—বাড়িতেই দিস। এখনও তো জানি না কোথায় গিয়ে ঠেকব?
—সে ভয় নেই, অবন। ধরা পড়লে তুই-ই পড়বি, বড়োলোকরা আবার কবে ধরা পড়ে? তুই এখন ভাগ এখান থেকে–
পবন আমাকে জোর করে একধাক্কায় রাস্তায় নামিয়ে দিল। আমার তখন ডাইনে-বাঁয়ে গুলিয়ে গেছে। চৌরঙ্গির দিকে যাব বলে বেরিয়ে হাঁটতে লাগলাম কালীঘাটের দিকে।
