৩.
বসুন্ধরা অ্যাপার্টমেন্টসে আমরা দু-জন সিকিউরিটির লোক। পবন মোহান্ত আর আমি। পবন উড়িষ্যার লোক, আমি বাঁকুড়ার। আটতলা বাড়িতে বত্রিশটা ফ্ল্যাট, দুটো লিফট, ষোলোটা গাড়ি রাখার প্লেস, কিন্তু সিকিউরিটির জন্য একখানা ঘরও নেই। আমাদের মাইনে দুশো টাকা করে। ডিউটি আটঘণ্টা করে। ছুটি তিনমাস কাজ করলে টানা একসপ্তাহ। সারাবছরে একমাস। বিয়ের পর তিন রাত্তিরের বেশি থাকতে পারিনি কারণ ছুটি ছিল না। চেষ্টায় ছিলাম তিনমাস টেনে দিয়ে একহপ্তা গিয়ে বাড়ি পড়ে থাকব। বউ বলেছিল, এরপর এলে তিনদিনের মাথায় ফিরতে দেব না।
যেদিন ঘটনা ঘটল সেদিন দুপুর দুটো অবধি ডিউটি চালিয়ে আমি ঘরে যাই। পবন আর আমি দুজনে ষাট টাকা করে দিয়ে বসুন্ধরার কাছেই একটা ঘর নিয়েছিলাম। ছটা-দুটোর কাজ সেরে আমি পবনের জন্য অপেক্ষায় ছিলাম, দেখি পবন আসে না। অথচ আধঘণ্টা চলার জন্য আমি জলের পাম্প চালিয়ে দিয়েছি। ভাবছিলাম, কী করি। পাম্প বন্ধ করে পবনকে খুঁজতে বেরুব, না আরেকটু অপেক্ষায় থাকব।
ভবানীপুর পাড়ায় জানেনই তো জলের বেশ ক্রাইসিস। ভাবলাম জল বন্ধ করে রাখলে না জানি হাঁকডাক শুরু হয়ে যাবে বাবুদের। তখন ঠিক করলাম একটা ফ্ল্যাটের কাউকে অন্তত বলে যাই যে পাম্প চালু আছে, আমি পবনকে খুঁজতে বেরুচ্ছি মেনগেটে তালা দিয়ে। দশ মিনিটের মধ্যেই ফিরে আসছি। কিন্তু কাকে খবর দোব? দুপুর দুটোয় পুরুষরা সব কাজে বাইরে, মহিলারা ঘুমুচ্ছেন; বেল দেবার মতো একটাই ফ্ল্যাট—চিঙ্কু ঝাভেরিদের। কিন্তু সেখানেও ভয় চিঙ্কু ঝাভেরিকে নিয়ে। সে এ সময় জেগে থাকবে ঠিকই, বেল দিলে খুলবেও, কিন্তু আমায় দেখে কী মূর্তি ধারণ করবে জানি না।
এই জিভ কেটে বলছি স্যার, ওরকম মেয়ে যেচে পড়ে আমার কাছে এলেও ছোঁওয়ার বাসনা নেই। যুবতী মেয়ে, দেখতে সুন্দরী, দুধের মত রং, কিন্তু ব্যবহার? ও সহ্য করা যায় না। সারাক্ষণ মুখ দিয়ে বুলেট ছুটছে। পুজোর সিজনে একদিন দলবল নিয়ে রাত বারোটায় এসে গাড়ির হর্ন লাগানো শুরু করল। আমি সিঁড়ির আলোয় বসে একটা গল্পের বই পড়ছিলাম। দেড়-দু মিনিট পরে খুলেছিলাম। সে কী তোড়ফোড় স্যার রাত-বিরেতে। বলে, তুমি ঘুমুচ্ছিলে। ওদের মধ্যে একটা ছেলে তো বলেই দিল, তুম শালা কিসিকো লক তোড় রহে থে। বুঝুন কথাবার্তা। নেহাত পেটের দায়ে আছি, একটা ডিগ্রি নেই দেখেই তো এই অবস্থা! চুপ করে গেলাম। এরপরও ওদের ফ্ল্যাটে হইহুল্লা চলল, রাত দুটোয় বাবুবিবিরা বিদেয় হলেন দল করে। পরদিনই আমি নতুন যে ম্যানশন উঠছে পাশের পাড়ায় সেখানে গিয়ে চাকরির খোঁজ নিলাম। শুনলাম আরও আট-দশ মাস যাবে বাড়ি শেষ হতে।
পরদিন দুপুরে পবনের কাছে আরও চমৎকার খবর পেলাম—চিঙ্কু জানিয়েছে কাকে কাকে যেন, যে আমার চাউনি-টাউনি সুবিধের না। আমি ওর শরীরকে নাকি চোখ দিয়ে চাটি। কথাটা শুনে এইসা রক্ত চড়েছিল মাথায় সেদিন যে পবনের সামনে উগরে দিই—এইসব কথাবার্তার আসল উত্তর হল ধরে রেপ করে দেওয়া। এরকম তো আমরা হামেশাই বলি, বলি না কি? পরে রেপ আর খুনের ঘটনার জেরা জবানবন্দিতে পবনকে দিয়ে এই কথাটা বলিয়ে কেস সাজাল পুলিশ। বলল, তুই তো পবনকে তোর প্ল্যানের কথা আগেই বলেছিলি। চিঙ্কুকে রেপ করবি।
এরপরও চিঙ্কুকে দেখে এড়িয়ে যাইনি; হাজার হোক ওদেরই মাইনে খাচ্ছি। শুধু একদিন খটকা লাগল, একদিন লিফটে আমায় একলা দেখে সে লিফটে উঠলই না। ভাবছেন ভয়ে? ভয় কাকে? আমাকে? ধুস! আমার সম্পর্কে বাজে কথা বলে আমার চোখের দিকে তাকাতে পারত না। আমি কিন্তু তাকাতাম, চাইতাম দেখুক আমার চোখের দিকে। ওকে গিলে খাচ্ছি কি না। সে সাহস ছিল না ওর। বাজে কথা অনেক বলা যায়, প্রমাণ করা যায় না।
এইসব ভেবেই অনেক দোনামোনার পরেও আমি তিনতলায় চিক্কদের ফ্ল্যাটে গিয়ে বেল দিলাম। দরজা খুললেন চিক্কুর মা, আমরা বলি ভাবিজি।
জিজ্ঞেস করলেন, কী ব্যাপার?
বললাম পবন আসেনি। পাম্প চলছে। আমি গেট বন্ধ করে ওকে দেখে আসছি। গরম মেজাজে ভাবি বললেন, তো এ কথা আমায় বলতে এসেছ কেন? আমি কী করব?
বললাম, এইজন্য যে যদি এর মধ্যেই কেউ এসে আটকে যায় তো এক-দু মিনিট সবুর করতে বলবেন।
ভাবি ঝাঁপিয়ে উঠলেন, তার মানে তোমার জন্য আমি এখন বারান্দায় গিয়ে টহল দেব?
আমি আর কিছু না বলে পাম্প বন্ধ করে মেন গেট আটকে পবনকে খুঁজতে বেরোলাম। পথেই দেখি বাবু আসছেন, ভাবলাম যাক বাঁচা গেল। কিন্তু পবন যা শোনাল তাতে শরীরটা প্রায় কাহিল হয়ে যাওয়ার জোগাড় আমার। বলে বিষম জ্বর ধরেছে গায়ে, পায়ের উপর দাঁড়াতে পারছে না। গায়ে হাত দিয়ে দেখি ছ্যাঁকা মারছে। আমি বললাম, তুই একটু গিয়ে বোস ডিউটিতে, আমি ভাতটা খেয়ে গিয়ে তোকে রিলিফ করব। একবারটি শুধু ছাদে উঠে পাম্পটা চালু করে দে। বাকি যা করার আমি করব। ও চলে গেল। আমি ঘরে বসে বোধ হয় জীবনের শেষ ভদ্র খাওয়া খেলাম।
কতক্ষণ আর হবে? মেরেকেটে বিশ-বাইশ মিনিট। ফের ছুটে গিয়ে পবনকে বললাম, যা। আমি আছি। বেচারার মাথা তখন সামনে ঝুঁকে পড়েছে। গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। নির্ঘাত ম্যালেরিয়া। বললাম, দেয়ালে ঝোলানো আমার প্যান্টের পকেটে একটা ম্যালেরিয়ার বড়ি আছে। চাস তো খেয়ে নিস। এখন তো ডাক্তার-ফাত্তার পাবি না কোথাও। বিকেলে না হয় বার হোস।
