পরমুহূর্তেই একটা খটকা বাজল বুকে; এই মাল যদি হয় যোলো আনার উপর আঠারো আনা ধূর্ত? যুবতীর ধর্ষণকারী, নির্মম খুনি? নিজের ধন্ধে নিজেই চমকে গেল অনির্বাণ। আর ঠিক সেইমুহূর্তে মাথার পিছন থেকে পরিচালকের জলদগম্ভীর কণ্ঠে ভেসে এল নির্দেশ : সাউণ্ড! রোল!! অ্যাকশন!!!!
২.
আলো ঝলমলিয়ে উঠতেই অবনী একটু সামনে ঝুঁকে সরল চোখ দুটো তুলে ধরল অনির্বাণের দিকে। অবনী দক্ষিণ কলকাতায় এক মাল্টিস্টোরিড ফ্ল্যাটবাড়ির দারোয়ান ছিল। পোশাকি ভাষায় বলা হত সিকিউরিটি পার্সোনেল। দুই দারোয়ানের এক দারোয়ান সে। তার উপর সম্ভাব্য খুনি। ইংরেজি সংবাদপত্রের আইনি প্রতিবেদনে একটা প্রথা আছে অভিযুক্ত পুরুষ ও নারীর উল্লেখ করার সময় ‘মিস্টার’ ও ‘মিস’ বা ‘মিসেস’ জাতীয় সম্মানসূচক শব্দ পরিহার করা হয়। অবনীকেও কি তা হলে আপনি’ না বলে ‘তুমি’ করে সম্বোধন করলে হয়?
কিন্তু প্রশ্ন করার সময় মুখ ফুটে বেরিয়ে এল ‘আপনি।
—আপনার পুরো নাম?
–অবনী চক্রবর্তী।
-বয়স?
–সাতাশ।
—বিবাহিত?
—হ্যাঁ।
–কদ্দিন?
-দেড় বছর।
—এর মধ্যে তো তেরোমাসই আপনি জেলে?
—হ্যাঁ।
–তা হলে ক-দিন সংসার করতে পারলেন?
‘সংসার?’ বলে বিষণ্ণ হাসল অবনী। অভিমানের হাসি। ব্যঙ্গের হাসিও। সংসার আর কবে করলাম, স্যার? তার পরেই তো ছুটি নেই দেখে কলকাতায় এসে গেলাম। আর তারপরই
তো…অবনীর কথা ফুরিয়ে গেল।
সাময়িকভাবে প্রসঙ্গ বদলাতে অনির্বাণ জিজ্ঞেস করল, আপনি তো বাঁকুড়ার লোক? কী গ্রাম?
–খেড়োশোল।
–সেখানে কারা আছেন?
–বাবা, মা, তিন বোন…
–বোনদের কীরকম বয়স?
-সব্বাই ছোটো। একজনের সতেরো। একজনের কুড়ি। আরেকজনের বাইশ। আমিই বড়ো।
—আর স্ত্রী?
—সে চলে গেছে।
চমকে উঠে অনির্বাণ বলল, চলে গেছে? কোথায়?
–ছাতনায় এক আশ্রমে।
–কারণ?
–আমিও তো সেই কারণগুলো ভাবি।
—কী ভাবেন?
–ও হয়তো ভেবেছিল সিন্ধি মেয়েটাকে আমি সত্যি…
–ধর্ষণ করেছেন?
–হুঁ।
-খুনও করেছেন?
–জানি না। হয়তো।
—তা আপনার স্ত্রী তার স্বামীর উপর ভরসা রাখলেন না?
অবনীর ঠোঁট কাঁপছিল, স্বর অস্পষ্ট হয়ে এল। কিছুটা স্বগতোক্তির মতোই আওড়াল, কতটুকু আর চিনতে পারল আমাকে!
অনির্বাণ জিজ্ঞেস করল, আর আপনি কতটুকু চিনতেন ওঁকে? এবার একটু সপ্রতিভ হল অবনী, চিনতে তো সময় লাগে, তাই না? তবে ভালোবেসেছিলাম।
-কেন, খুনের ঘটনার পর তো পুলিশ আপনাকে আপনাদের গ্রামের বাড়ির গোয়াল থেকে অ্যারেস্ট করেছিল। তখন তো…
—তখন আর সে কোথায়? পুলিশের হাত এড়াতে যখন বাড়ি গেছি ততক্ষণে খবর পৌঁছেছে আমি খুনি। যুবতী মেয়েছেলেকে কী না কী করেছি। বউ পায়ে হেঁটে বাপের বাড়ি রঘুনাথপুর চলে গেছে। বাবা, বোনরা কেউ যায়নি সঙ্গে। দুপুরে চান সেরে, না খেয়ে, এক কাপড়ে…
–বাড়ি গিয়ে ওকে ফিরিয়ে আনার কথা ভাবেননি তখন?
–ফিরিয়ে আনব? আমি নিজেই তখন গোয়ালে খড় চাপা দিয়ে পড়ে আছি। দিন-রাতের হিসেব চলে গেছে। সারাক্ষণ গোবর আর চোনার গন্ধ শুকে এঁকে ছাতি জ্বালা করছে। হঠাৎ দমাদ্দম বাড়ি পড়তে শুনলাম দরমার বেড়ায়, তারপর গোয়ালে ভাঙচুর, তছনছ। শুনলাম একজন অফিসার হাঁকছে। শালা, বেরিয়ে আয়, নয়তো গুলি চালাব। আমি তো মানুষ; তখন গাইবাছুররাই ভয়ে ডাকছে। আমি কাঁপতে কাঁপতে উঠতেই ওরা রড মেরে সোজা করে দিল। বউকে কী আনব, স্যার? পুলিশই আমায় নিয়ে এল কলকাতায়। তারপর আর কী স্যার? আমার টাকা কোথায় যে পুলিশকে হাত করব?
-কেন, পুলিশকে হাত কেন?
—ওই পুলিশই তো সব করল?
—কীরকম?
–যা করার।
—যা করার মানে?
–ঘটনা সাজিয়ে দিল। বলি তা হলে? একটা সিগারেট খেতে পারি, স্যার? অনির্বাণ একটা ফিল্টার উইলস বাড়িয়ে দিল। অবনী নিজের বালিশের তলা থেকে একটা চারমিনারের প্যাকেট বার করে বলল, আছে স্যার। এখানে সিগারেট খেতে দেয় আমাদের। অনির্বাণ আর অবনী দুজনে দুটো সিগারেট ধরাল। অবনী ফের শুরু করল, আপনারা তো জানেনই চিঙ্কু ঝাভেরিয়া হিরের মার্চেন্ট।
অনির্বাণ মাথা নাড়ল, জানি।
—কত টাকার ব্যাবসা ওদের তা জানেন?
–দেড়-দু কোটি।
–মোটে? চল্লিশ-বেয়াল্লিশ কোটি!
—তো তার সবটাই চিঙ্কুর বাবার নয়। ভাগ ছিল আর দু-ভাইয়ের।
–আপনি এসব জানলেন কোত্থেকে?
—কোত্থেকে আর? ওদেরই মুখ থেকে। পনেরো দিন অন্তর তো ভাইরা এসে শাসাত।
-কেন?
—বলত চিঙ্কুর বাবা ধর্মদাস ওদের শেয়ার লুটে নিয়েছে। ওদের একজন বিঠলদাসের ছেলে কাঞ্চন তো সাফ বলল চিঙ্কুকে দেখিয়ে একদিন, পয়সা মেটাও, নয়তো মেয়েকে তুলে নিয়ে যাব।
—তার মানে আপনি বলছেন এটা ফ্যামিলির ব্যাপার?
–হ্যাঁ। আর তার মধ্যে ফাঁসিয়ে দিয়েছে আমাকে।
–ধরা যাক তা-ই। সে ক্ষেত্রে এটাও তো হতে পারে যে এই ভাইরা আপনাকে দিয়ে ওই কাজ করিয়েছে টাকা খাইয়ে।
—টাকা? আমার নিজের জমিটুকুও তো বিক্রি হয়ে গেছে এই মামলা লড়তে গিয়ে। আমি একমাত্র রোজগেরে লোক ফ্যামিলিতে। আজ তো বোনরা নিজেরা একবেলা খেয়ে বাবাকে দু-বার ভাত দিচ্ছে দিনে। আমার আটষটি টাকা সম্বল। পোস্ট অফিসে। জেল খাটছি বলে দু বেলা খেতে পাচ্ছি।
—আমরা অন্য কথায় চলে যাচ্ছি। অবনীবাবু, আপনি আপনার কথা বলুন।
অনির্বাণ আব অবনী একসঙ্গে সিগারেট নেভাল। দ্বিতীয়জন বলল, তা হলে আমার কথাটা মন দিয়ে শুনুন? অনির্বাণ বলল, হ্যাঁ। বলুন…।
