অনির্বাণের তখন অদম্য কৌতূহল হল জানার, স্যার, হঠাৎ এরকম এক আকাঙ্ক্ষা হল কেন আপনার?
আর তখন-তিনদিনের আলাপে এই প্রথম সত্যশিবের মুখে একটা গাঢ় ছায়া দেখল অনির্বাণ। তিনি মুখের সিগারেটটা অ্যাশট্রেয় শুইয়ে রাখতে রাখতে বললেন, হঠাৎ নয়। এই ইচ্ছে আমাকে ছ-বছর বয়স থেকে তাড়া করে আসছে। বলতে গেলে সেই দিনটা থেকে যে দিন বাবার হাত ধরে দাঁড়িয়েছিলাম লাহোরের রেলওয়ে প্ল্যাটফর্মে। গোরু-মোষের মতো নারী-পুরুষকে ঠেসে দেওয়া হচ্ছিল ট্রেনের কামরায়। সবাই যাবে সদ্য ভাগ হয়ে যাওয়া ওপারের হিন্দুস্তানে। আর বৃদ্ধ পড়শি করিমচাচা এসে বাবার হাত ধরে কেঁদে পড়লেন, মনমোহন, দেশ তো ভাগ হয়ে গেল; আর তো আমি আমার পিয়ারে ননহে আক্রামকে লুধিয়ানার জেলখানায় দেখতে যেতে পারব না। তুমি কি মাঝে-মাঝে ওর খবর নিয়ে আমায় খত লিখবে?
বাবা তখন চোখ মুছতে মুছতে বললেন, আমি তো ভাইয়া জলন্ধরে গেরস্তি করব। মাস মাস তো পারব না, তবে তিনমাসে একবার গিয়ে আক্রামকে দেখে এসে তোমায় পত্র দেব।
খুদাকে বহুৎ মেহেরবানি কি তুমি যৈসি পঢ়োসি মুঝে মিলি থি—বলে চোখের জলে একাকার হয়ে করিমচাচা বাবাকে গালে চুমু খেতে লাগল। আমি ট্রেনে উঠে বাবাকে বললাম, পিতাজি, লুধিয়ানায় গেলে আপনি আমায় সঙ্গে করে নিয়ে যাবেন। বাবা মাথা নেড়ে বলেছিলেন, ঠিক আছে।
এরপর সত্যিই আমরা তিনমাস পর গিয়েছিলাম আক্রামকে দেখতে লুধিয়ানার। গিয়ে কী শুনলাম? তার দু-দিন আগে খুনের আসামি আক্রামের ফাঁসি হয়ে গেছে। বাবা বাড়ি ফিরে এসে প্রচুর কাঁদলেন, তারপর মিথ্যে-মিথ্যে করে একটা চিঠি লিখলেন করিমচাচাকে। লিখলেন, আক্রামের তবিয়ত ঠিক আছে। সবার খোঁজ নিয়েছে। তবে কষ্ট করে কাগজ বানিয়ে আব্বাকে হিন্দুস্তানে আসতে নিষেধ করেছে। বাবার তখন একবারও সন্দেহ হয়নি যে তার আগেই ওর ফাঁসির খবর পৌঁছে গিয়েছিল লাহোরে। করিমচাচা বাবার চিঠি পেয়ে লিখেছিল, মনমোহন, তুমি আক্ৰাম বলে কাকে দেখে এসেছ জানি না। আক্ৰাম ফাঁসির ফান্দায় গায়েব হয়ে গেল আমার জীবন থেকে। লুধিয়ানা হিন্দুস্তানে না পড়ে পাকিস্তানে পড়লে হয়তো ওকে এত কঠিন শাস্তি পেতে হত না।
শেষ বাক্যটা শুনে চমকে উঠেছিল অনির্বাণ। ওর সেই মুখবিকার দেখে সত্যশিব বললেন, তুমি অবাক হচ্ছ? এক সাধারণ মৃত্যুদন্ডেরও কী রাজনৈতিক ব্যাখ্যা হয় সে দিন প্রথম বুঝেছিলেন বাবা। সারাক্ষণ বাড়ির উঠোনে বসে একটাই কথা বলতেন তখন, ইন্তেকালসে বড়া ঝুট কুছ নহি হোতা। কিউঁকি ইয়ে জিন্দেগিকো ঝুট বনা দেতি। মৃত্যুই সেই বড়ো মিথ্যে যা জীবনকেই মিথ্যে করে দেয়। আর সেই মৃত্যুকে প্রশ্রয় দেয় মানুষের তৈরি মৃত্যু—সে খুন হোক চাই বিচারালয়ের মৃতুদন্ড। অনির্বাণ, তুমি আমার অলবিদা ছবিটা দেখেছ?
অনির্বাণ মাথা নেড়ে বোঝাল হ্যাঁ। সত্যশিব অমনি ফের শুরু করলেন, ওখানে দেশবিভাগের পাশাপাশি আমি বাবার এই সমস্যাটা নিয়েও কাজ করেছি। অনির্বাণ একটা সিগারেট ধরাতে ধরাতে বলল, এবার ওই ছবিটা আমার কাছে আরও একটু পরিষ্কার হল মনে হচ্ছে।
—আর আমার এই ডকুমেন্টারির উদ্দেশ্যটা? জিজ্ঞেস করলেন সত্যশিব।
—এর উদ্দেশ্যটা হয়তো আমি ছবিতে কাজ করতে করতে ধরতে পারব।
সত্যশিব সামান্য হেসে, অ্যাশট্রেতে শোয়ানো সিগারেটটা তুলে একটা লম্বা টান দিলেন— ইউ আর ওয়েলকাম।
এখন, এই মুহূর্তে, অনির্বাণ অবিশ্যি এক চরম ধন্ধে পড়ে গেছে, সেই চাওয়ার প্রশ্নে। যত সরল আর যত জটিলই হোক, সত্যশিবের চাওয়ার একটা চেহারা সে পেয়েছে। সামনে বসা দন্ডপ্রাপ্ত অবনীর চাওয়ারও একটা অনুমান সে করতে পারছে। অবনী চায় এই তথ্যচিত্র জনমত গড়ে ওকে মৃত্যুদন্ড থেকে রেহাই দিক। সরল চাহনিতে সেই উদগ্রীব আকাঙ্ক্ষার একটা ছোঁয়া দেখতে পাচ্ছে অনির্বাণ। যে-চাহনিতে পাপ আবিষ্কার করা যায় না, সে চাহনিতে মৃত্যুভয়ই বা নেই কেন? জীবনের মায়া আর মৃত্যুভয়ের মধ্যেও কি তা হলে সূক্ষ্ম, অলক্ষ্য ব্যবধান আছে? নাকি নির্দোষ হলে এমন পরিচ্ছন্ন দৃষ্টি জন্মায়? নাকি ষোলো আনা দোষী বলেই এমন নির্মম সত্যবরণ সম্ভব হয়? কিন্তু…কিন্তু…অনির্বাণ নিজে কী চায়?
মুহূর্তের জন্য যিশুর ছবিতে চোখ পড়ে ওর প্রশ্নগুলো ফের গুলিয়ে গেল। তথ্যচিত্রের প্রশ্ন আর নিজের হৃদয়ের প্রশ্নগুলো জড়িয়ে পিটিয়ে গেল ফের। যিশুরও তো শোনা যায় বিচার হয়েছিল, মৃত্যুদন্ডও হয়েছিল। ইশকুলের ইংরেজির মাস্টার অ্যান্টনি গোমেস বলতেন না যে ক্রাইস্ট তাঁর মৃত্যু দিয়ে সমস্ত জগবাসীর পাপের জন্য প্রায়শ্চিত্ত করে গেছেন? তার মানে অবনীর পাপ, বা ও নিরপরাধ হলে সেই খুন হওয়া সিন্ধি পরিবারের মেয়েটির আত্মীয়বর্গের ষড়যন্ত্র কিংবা পুলিশের সাঁট অথবা ভ্রান্ত তথ্যে বিচারের বিভ্রান্ত সিদ্ধান্ত সবেরই জন্য যিশু মূল্য ধরে দিয়ে গেছেন তাঁর রক্তে?
অনির্বাণ ধার্মিক নয়, আবার জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে প্রশ্ন করে করেও এগোতে পছন্দ করে। অনুভূতি মাঝে মাঝেই ওর চিন্তাকে জয় করে নেয়। এখন যেমন নিচ্ছে। মনে হচ্ছে। চুলোয় যাক সত্যশিবের মৃত্যুদন্ড আইন রদের মহৎ লক্ষ্য, আপাতত এই সাধারণ, গরিব চেহারার মানুষটাকে ফাঁসির গেরো থেকে বাঁচাতে পারলেই হয়।
