যখন ঘুমে জড়িয়ে আসে মাথা, জেগে থাকা কষ্টকর, অবনী চট করে মাথার কাছে রাখা পেনসিলটা তুলে দিনটাকে ক্যালেণ্ডার থেকে বাতিল করে দেয়। যে-দিনটা গেল গেল, ক্যালেণ্ডারের বাকি তারিখগুলোর দিকে অবাক চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে অবনী ভাবে—এই তা হলে আমার জীবন! মিনিট… ঘণ্টা… মাস.. সবই তখন ওর কাছে একটা জিনিসই হয়ে ওঠে—-জীবন!
যেকোনো দিন চলে যেতে পারে বলেই হয়তো জীবনটাকে বড়ো মধুর বলে মনে হয় অবনীর। মাঝে-মাঝে চলে যাওয়া দিনটাকে ক্যালেণ্ডারে কাটতে গিয়ে হাতটা কেঁপেও যায়। কোনো একটা উপন্যাসে কদিন আগে পড়েছিল অবনী—চলে যাওয়া দিনের জন্য ব্যথাও নাকি ভালোবাসা।
কোন বইয়ে পড়েছিল? অবনী শুয়ে শুয়ে ওর বইগুলোর দিকে তাকায়—বিমল মিত্রের বেগম মেরী বিশ্বাস, মনোজ বসুর সেই সব গ্রাম, সেই সব মানুষ, তারাশঙ্করের না, শংকরের যোগ বিয়োগ গুণ ভাগ, সমরেশ বসুর গঙ্গা, শক্তিপদ রাজগুরুর মেঘে ঢাকা তারা, নীহাররঞ্জন গুপ্তের মাধবী ভিলা, জরাসন্ধের লৌহকপাট….. এই ক-মাসে কম বই তো জমেনি! কিন্তু ঠিক কোথায়, কোন বইয়ে কথাটা ছিল? নাকি কোথাও নেই কথাটা, ওটা ওর নিজের আবিষ্কার? কেন আজকাল এমন হয় অবনীর—আগে পরের দিনগুলো সব তালগোল পাকিয়ে যায়? বহু আগের দিনগুলো বার বার মনে পড়ে আর আগামী কটা দিন কয়েকটা মুহূর্ত হয়ে বুকে এসে আছড়ে পড়ে?
অবনীর সলিটারি সেলের গরাদ দিয়ে একটা দেয়ালই শুধু দেখা যায়। সেই দেয়ালের মাথার উপরে ফুটখানেক আকাশ। ওই একচিলতে আকাশকেই ওর স্বাধীনতা বলে মনে হয় আজকাল। ওই আকাশে রোদ থাকলেও ভালো, মেঘ করলেও ভালো। বৃষ্টির কটা দিন আকাশটাকে ওর নদী বলে মনে হচ্ছিল।
এখন ঠিক ওই একমুঠো আকাশের আলোটাকে কীভাবে ছবিতে ধরে রাখা যায় তারই হিসেবনিকেশ করছিলেন ভারতবিখ্যাত চিত্রপরিচালক সত্যশিব। একবার ক্যামেরাম্যানদের দিকে তাকিয়ে একগাল সাদা দাড়ি চুলকোতে চুলকোতে বললেন সত্যশিব রাঠোর, ক্যাট বিট অফ স্কাই ইজ অবনী’জ ফ্রিডম ফিল্ড। উই মাস্ট ইউজ ইটস অ্যারোমা।
সাদা দেয়ালে আকাশ আর রোদের নির্মল সাঁতার, অদৃশ্য প্রতিফলন। ক্যামেরাম্যান নীরেন্দ্র সেন সেইভাবেই চাইছিলেন ছোট্ট, ন্যাড়াঘরের মুক্ত ফ্রেম। নড়া, সরা এমনকী মরার মতোও জায়গা নেই যে-ঘরে, তারই টাইট ফ্রেমে ধরা দৃশ্যে জেলখানার মৃত্যুঘোষণা।
সেই ফ্রেমে, অবনীর খাটের এক পাশে গুটিগুটি গিয়ে বসল অনির্বাণ। একমাথা উশকোখুশকো কোঁকড়া চুল আর গলা অবধি নেমে আসা দাড়িতে অনির্বাণের প্রোফাইলটা দাঁড়ায় কিছুটা ছবির যিশুখ্রিস্ট আর কিছুটা এককালের নকশাল ছেলেটির আইডল চে গুয়েভারার মতন। সে নিজেও আজ বড়ো বিপন্ন ভিতরে ভিতরে কারণ সত্যশিব ওকে সোজাসাপটা বলে দিয়েছেন, তুমি অ্যাকটিভ জার্নালিস্ট, তোমাকে আবার ব্রিফ দেব কী? মৃত্যুর অপেক্ষায় থাকা এক মানুষের সামনে তোমার সাংবাদিক হিসেবে যা-যা প্রশ্ন তুমি তাই তাই করবে। আমার দায়িত্ব এক বাস্তব ঘটনাকে যথাসম্ভব বাস্তবভাবে তোলা! তুমি তো আমার অ্যাকটর নও, তুমি তথ্যচিত্রের দ্বারা প্রক্ষিপ্ত বাস্তবের একটা অংশ। তোমাকে প্রশ্ন দিয়ে সাহায্য করা আমার কাজ নয়।
সাংবাদিকতা আর জীবন এত ঘনিষ্ঠভাবে কখনো মেলামেশা করেনি ওর জীবনে। কখনো কোনো প্রতিবেদন তৈরি করতে গিয়ে ওর এই প্রশ্ন জাগেনি মনে : আমি কী জানাতে চাই?
সত্যশিবের চাওয়াটা অবশ্য একই সঙ্গে সরল এবং জটিল। অনির্বাণকে তিনি বলেছেন, আমার তথ্যচিত্রের লক্ষ্য খুব স্পষ্ট। যে-সব ফাঁসির মামলা ঝুলে আছে সারাদেশে এমন আটটা ঘটনা নিয়ে আমি ছবি করছি। এই আটটা মামলার একটাই সাদৃশ্য : এদের সবকিছুতেই ফাঁসির হুকুম জারি হয়েছে, কিন্তু এদের কোনোটিরই অপরাধ নিঃসন্দিগ্ধভাবে প্রমাণিত হয়নি বলে ধারণা হয়েছে কারও কারও। এ ক্ষেত্রে ক্রিকেটের নিয়মে কি দোষীকে বেনিফিট অফ দ্য ডাউট দেওয়া যায় না?
অনির্বাণ প্রশ্ন করেছিল, সে তো তা হলে বিচারবিভাগের চিন্তা আর সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করার শামিল হচ্ছে।
সত্যশিব একমুখ দাড়ির ফাঁক দিয়ে হেসে বলেছিলেন এগজ্যাক্টলি। আর সেটাই আমার চাওয়া ও লক্ষ্যের জটিল দিক। আমি আদালতের বিচারে প্রশ্ন তুলছি না; বস্তুত অবনী সত্যিই খুন করেছে কি করেনি সেই তদন্তেও যেতে চাইছি না। আমি শুধু মৃত্যুদন্ডের মৃত্যুদন্ড ভিক্ষা করছি বিচারবিভাগের কাছে।
চমকে উঠেছিল অনির্বাণ—তার মানে? আপনি ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট অ্যাবলিশ করতে চান? অর্থাৎ দোষীর দোষ যাই হোক তাকে মেরে ফেলা যাবে না?
সত্যশিব অনির্বাণের কাঁধে মৃদু চাপড় দিয়ে বলেছিলেন, ইউ হ্যাভ গট মি। দ্যাট ইজ মাই টার্গেট। বিচারের দায়িত্ব, আমি বলতে চাই, শাস্তিদান ও যথাসম্ভব সংশোধন। একটি মানুষের বাঁচার অধিকার কেড়ে নেওয়ার অধিকার তার থাকা উচিত নয়।
অনির্বাণ হেসে বলেছিল, তার মানে আপনি আদালতকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছেন? সত্যশিবের মুখের প্রসন্নতা কেটে গেল। তিনি ঝাঁঝের সঙ্গে বললেন, না, এইটাই আমি করছি না। আদালত যা করবে সেটা আদালতের কাজ। আদালতের সেই কাজের পথে পাথর ছড়াচ্ছি না আমি। কিন্তু আদালতকে চলতে হয় অসংখ্য ধারাবিচার, সূত্র ও মতের ভিত্তিতে। এমনই কিছু কিছু ধারা আদালতকে মৃত্যুদন্ড বিধানের ক্ষমতা দিয়েছে। আমি সেই ক্ষমতার সামান্য সঙ্কোচন চাইছি। বলছি, মৃত্যুদন্ড দিয়ে কাউকে সংশোধনের পরপারে পাঠিয়ো না।
