আমি আস্তে আস্তে ইন্দুর পাশে সরে এসে ওর হাতটা চেপে ধরলাম। কিন্তু মুখের দিকে চাইলাম না। বাইরে আকাশে আলোর খেলা দেখতে দেখতে বললাম, চলো, আজ রাতে আমরাও ঘুমোব না। ওই ডাইনির চকে যাব। আর ঠিক তেমনিভাবেই বাইরে আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকেই একটা গা শিরশিরে নৈর্ব্যক্তিক কণ্ঠে ইন্দু জবাব দিল, আর ডাইনির ভস্ম এনে ছড়িয়ে দিয়ে আসব তোমার বাবার সমাধির পাশে।
আমি চমকে উঠেছিলাম। যখন ইন্দুর কথার পুরো অর্থ আমার মনে প্রবেশ করল। ইন্দুর মনে আছে মায়ের সেই শেষ আকাঙ্ক্ষা বাবার সমাধির পাশে শোওয়ার। যা আর সম্ভব হয়নি। আর ওর মনেও গেঁথে গেছে যে, আজ রাতেও ডাইনি হত্যার এক যাত্রা আছে। সেখানে ডাইনির চিতায় আগুন লাগানো হবে। তারপর সেই চিতার ভস্ম হয়তো নিয়ে ছড়িয়ে দেওয়া হবে কারানের আবাদভূমির খেতে খেতে।
হ্যাঁ, ঠিক তেমন—তেমনই ঘটল সব চোখের সামনে। রাত যখন দুটো তখন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল ডাইনির নকল চিতা। আর সেই চিতা ঘিরে শুরু হল ওয়াইন—হুইস্কি বিয়ারে মাতাল কারোনের আবালবৃদ্ধবনিতা। উচ্চৈঃস্বরে মাতাল কন্ঠে গান। এ ঢলে পড়ছে ওর ওপর, সে ঢলে পড়ছে তার গায়ে। এ জড়াচ্ছে ওকে, সে তাকে। এক ডাইনির স্মৃতি ঘিরে দুই শতাব্দী পরেও উত্তাল হয়ে উঠেছে এক ঘুমন্ত নগরী। সবাই যখন এভাবে উন্মাদ আমি আর ইন্দু ভিড় ঠেলে চিতার কিছু ভস্ম নিয়ে বেরিয়ে এলাম চক থেকে। তারপর এক অপরিচিত নগরীর রাস্তা ও গলি অত্যন্ত অভ্যস্ত পারে পার হয়ে পৌঁছে গেলাম কারোন গির্জার পিছনের সমাধিক্ষেত্রে। যেন দু-বেলা এই পথেই হেঁটে চলে-বেড়ানো আমাদের অভ্যাস। মনের গহনে একটা আবছা মানচিত্র দেখে দেখে যেন যাবতীয় ঘোরাফেরা আমাদের। কলকাতার রাস্তাঘাটও আমাদের কাছে এতটা পরিচিত নয়।
অবশেষে সেই বিস্তীর্ণ অন্ধকারের মধ্যে এসে পৌঁছোলাম বাবার সমাধির পাশে। দু-জনের হাতে আমাদের দু-আঁজলা ছাই। ঠিক মায়ের চিতাভস্ম নয়, তবে তারই প্রতীক গোছের কিছু একটা। আমরা হাতের ভস্ম সমাধির এক প্রান্তে রাখতে যাব এমন সময় এক অলৌকিক দৃশ্যে উজ্জ্বল হয়ে উঠল সারা সমাধিক্ষেত্র। আমি আর ইন্দু দেখলাম যে, সমস্ত দেহে আগুন জ্বলছে দাউ দাউ করে, কিন্তু সরবে আমার বাবার নাম ‘শার্ল! শার্ল!’ করে ডাকতে ডাকতে আমার মা ছুটে এসে আছড়ে পড়লেন বাবার কবরে। মুহূর্তের এই দৃশ্যের পর সারা কবরস্থান আবার পূর্ববৎ ঘোর অন্ধকার। আমি আর ইন্দু নিশ্চিত হলাম যে, শেষ অবধি মা বাবার সমাধিতে এসে আশ্রয় পেয়েছিলেন। কিন্তু ইতিহাস যার কিছুই জানেনি। কাজেই মেকি ভস্ম দিয়ে বাসনা পূরণের প্রয়োজন নেই জেনে হাতের ছাই আমরা ছুড়ে ফেললাম দূরে।
কারোনে ছুটি আর কাটানো হয়নি আমাদের। সারারাত জেগে কাটিয়ে পরের দিন সকালের ট্রেনে আমরা ফিরে আসি প্যারিস। আর তার পরের দিন দেখা করে ধন্যবাদ জানাতে যাই বন্ধু মার্গেরিৎকে। শুধু ওর জন্যই এই সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতাটা আমাদের হতে পারল। বেল টিপে ওর ঘরে ঢুকতেই ও রীতিমতো হকচকিয়ে গেল। সাতসকালে দেবা দেবী কী মনে করে! আমরা ধীরে ধীরে সমস্ত ঘটনা ওকে খুলে বললাম এবং ও আমাদের কোনো বর্ণনাতেই অবাক হল না। সবটাই যেন ওর নিজের চোখে আগে থেকেই দেখা। জানা। বোঝা।
কিন্তু আমার মনে হঠাৎ যেন একটা আলোর ঝলকানি। মার্গেরিতের এই মুখটা যেন কার সঙ্গে বড় বেশি মিলে যাচ্ছে! কার সঙ্গে? কার?…হ্যাঁ, হ্যাঁ, এই মুখটাই তো প্রথমে সেদিন হোটেলের দেওয়ালের চারকোল ড্রয়িং-এ দেখেছি। পরে ডাইনির রাতের মিছিলের ট্যাবলোতে। হ্যাঁ, হ্যাঁ এই মুখই তো ছিল মাদার জোয়ানার। তা হলে কি পূর্বজন্মে ও-ই ঘটা করে হত্যা করেছিল আমার মাকে?…না, না, তা কি সম্ভব; নাকি সবটাই…
সবই কীরকম আমার গুলিয়ে যেতে বসল। মার্গেরিৎ উদবিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করল, শংকর, তোমার কী হয়েছে; তোমার কি শরীর খারাপ? আমি ভেতরের কথা চাপা দেওয়ার জন্য শশব্যস্ত হয়ে বললাম, না, না, আমার কিছু হয়নি মার্গেরিৎ। আমাকে একটু জল খাওয়াতে পারো? ও জল আনতে পাশের ঘরে যেতেই আমি ইন্দুর হাত ধরে টান মেরে বললাম, চলো এখান থেকে পালাই। এই মেয়েটা একটা ডাইনি।
তথ্যচিত্র
আট ফুট বাই পাঁচ ফুট ঘরটার বড়ো অংশ জুড়ে লোহার খাটটা। যেটার সাইজ পাঁচ ফুট বাই দু-ফুট। তাতে সরু তোশকের ওপর সাদা চাদর বিছোনো। মাথার কাছে পাতলা বালিশ। খাটের এককোণে সাদা টি-শার্ট আর সাদা জমিতে নীল-নীল ঘরকাটা লুঙি পরে বসে অবনী চক্রবর্তী।
অবনী উচ্চতায় বড়োজোর পাঁচ-ছয়। রোগাটে শরীর, পুরু গোঁফ, ভরাট ভুরু। চুলে ছাঁট পড়লেও অনেকখানি ফেঁপে আছে। চোখের কালো মণিদুটোয় বিভ্রান্তি আছে; সরল চোখ। কিন্তু অনর্থক কম্পন নেই দৃষ্টিতে। এই চোখে ও মাথার কাছে রাখা ছোট্ট ফ্রেমে বাঁধানো কালীর ছবি দেখে। ওর ওই নির্মেদ হাতে গোলাপি ক্রেয়নে সাদা দেয়ালে মা কালীর ছবিও এঁকেছে একটা। ঘরের সাদা দেয়ালে যিশুর ছবি দেওয়া একটা বাংলা ক্যালেণ্ডারও ঝুলছে। তাতে একেকটা দিন পার হলে ও একেকটা তারিখ পেনসিলে কেটে বাতিল করে দেয়। কারণ ওই দিনটা ওর জীবনের শেষ কয়েকটা দিনের ঝুলি থেকে ঝরে পড়ল।
যতক্ষণ না দেশের রাষ্ট্রপতির সই নিয়ে ফাঁসি রদের নির্দেশ আসছে, অবনীর পরমায়ু বলতে ক্যালেণ্ডারের ওই বাকি ক-টা দিন। খুনের দায়ে দন্ডিত আসামির জন্য প্রাণভিক্ষার আবেদন তিনমাস সাতদিন পুরোনো হয়েছে। রোজই ভোর হলে আশা জাগে আজ বুঝি সে চিঠি এল। সন্ধ্যে নামলে যখন গরাদের ফাঁক দিয়ে রাতের খাবার গলিয়ে দেওয়া হয় অবনীর জন্য, তখন সে দিনের মতো আশা নিভে যায়। তারপর আহার শেষ করে অবনী যখন বিমল মিত্রের আসামি হাজির উপন্যাসটা নিয়ে আরামে শোয় তখন গড়িয়ে যাওয়া দিনটাকে বড়ো মূল্যবান মনে হয় ওর।
