কীরকম যন্ত্রচালিতের মতো, সমস্ত বাস্তববোধকে প্রায় এককথায় নস্যাৎ করে, আমি ওর সংশয় দূর করার জন্য বলে বসলাম, আমরা এই বাড়িতে শেষ থেকেছি এগজ্যাক্টলি দুশো কুড়ি বছর আগে। ১৭৬০ সালে।
তারপর?
তারপর আমরা দুজনেই একদিন সন্ধ্যেয় পিছনের ওই টিলার ওপারের নদী বেয়ে পালিয়ে গিয়েছিলাম কারোন থেকে।
একথা বলতে বলতে আমি এক লাফে জানালার পাশে গিয়ে এক ঝটকায় সরিয়ে দিলাম বিরাট, ভারী পর্দাটা। সূর্য তখন সবে অস্ত গেছে টিলার ওপারে নদীর কিনারে। কিন্তু আকাশে তখনও ছেয়ে আছে একটা রক্তিম আভা। আমি ওই টিলার দিকে আঙুল তুলে বললাম, ইন্দু মনে পড়ে ওই টিলা? তুমি নামতে ভয় পাচ্ছিলে। শেষে আমি পাঁজাকোলা করে তোমায় নিয়ে নামলাম একটা ছোট্ট বাইচে। আর তারপর ফ্রাঁসোয়া আর আমি সমানে দাঁড় বেয়ে সারারাত ধরে এগিয়ে চললাম ফ্রান্সের আরও দক্ষিণে। আমাদের তখন শুধু লক্ষ্য যেমন-তেমন করে মার্সেই পৌঁছানো। তারপর সেখান থেকে জাহাজ ধরে ল্যাঁদ। ইণ্ডিয়া।
আমার এই কথাগুলো নাটকের প্রম্পট করা সংলাপের মতো কাজ করল ইন্দুর ওপর। ওর চোখ উদাস, ঘোলাটে হয়ে উঠল। ও মুখস্থ করা ডায়ালগের মতোই এবার বলে উঠল, না, শংকর না। তুমি একটা দৃশ্য বাদ দিয়ে গেলে। তোমার মনে পড়ছে না পালিয়ে যাবার আগে এই ঘরে তুমি আর আমি মাটিতে নতজানু হয়ে কত অনুনয়-বিনয় করলাম তোমার মায়ের কাছে? আমাদের সঙ্গে পালিয়ে যাওয়ার জন্য। কত কাঁদলে তুমি তাঁর হাত চেপে ধরে। কিন্তু উনি কীরকম শোকে পাথর হয়ে গিয়েছিলেন। শুধু বলছিলেন, আমি আর কোথায় যাব পল? আমি এই মাটিতেই মরব। তারপর ওরা শুইয়ে দেবে তোমার বাবার পাশে। কারোন গির্জার পিছনের কবরস্থানে আমি শুতে চাই।
একটা প্রচন্ড ব্যথা গুমরে উঠতে লাগল আমার ভেতরে। বেচারি মা! নিজের ছেলেকেও বিদায় দিতে পেরেছিলেন শুধু স্বামীর পাশে শেষ আশ্রয় নেবেন বলে। আর তাঁকেই ওরা ডাইনি বলে পুড়িয়ে ছাই করে দিল। আমার চোখ ফেটে জল এল। আমি চোখ মুছতে মুছতে গিয়ে বসলাম ওই ডাইনি হত্যার ছবির নীচে। আর মনে মনে বলতে থাকলাম, মা, তুমি ক্ষমা করো তোমার অযোগ্য পুত্রকে। এ দেশ থেকে পালিয়ে আমি আমার শরীরটা বাঁচাতে পেরেছি। কিন্তু আমার হৃদয় ডুবে মরেছে ওই নদীর জলে। মাগো!
হঠাৎ ঘরদুয়োর, চারপাশ কাঁপিয়ে প্রচন্ড আওয়াজ। যেন ঘন ঘন বোমা পড়ছে। সর্বত্র। ফ্রান্স যেন আবার আক্রান্ত হয়েছে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের জার্মান হানাদার বোমারুদের দ্বারা। আমি তড়াক করে লাফিয়ে উঠে বেল টিপে বসলাম ফাম দ্য মেনাজকে ডাকার জন্য। মেয়েটি এলও ছুটতে ছুটতে আর হাঁপাতে হাঁপাতে। বাগানে খেলায় মত্ত শিশুকে হাঁক দিলে সে যেভাবে একই সঙ্গে স্ফূর্তি এবং লজ্জা মিশিয়ে হাসতে হাসতে আসে প্রায় সেরকম। ও ঢুকতেই ইন্দু জিজ্ঞেস করল, কী ব্যাপার, মাদমোয়াজেল? এত বোমার আওয়াজ কেন? রায়ট লাগল নাকি?
মেয়েটি বোধ হয় কিছু খাচ্ছিল। ও আমাদের দিকে পিছন ঘুরে জামার আস্তিন দিয়ে চট করে ঠোঁটের ওপরটা মুছে নিয়ে ফের সাঁ করে আমাদের দিকে ঘুরে বলল, না গো মাদাম! আজ তো সেই বিখ্যাত ‘ডাইনির রাত। খুব ধুম হবে এখন শহরে। বিরাট মিছিল বেরিয়েছে ডাইনির ট্যাবলো নিয়ে। আজ রাতে কেউ ঘুমোবে না। ওই ডাইনির চকে সারারাত নাচ-গান আর যাত্রা হবে। আমরাও খেয়ে নিচ্ছি তাড়াতাড়ি তাই। ট্যাবলো এখন হোটেলের সামনে। তোমাদের ঘরের বারান্দায় দাঁড়ালেই দেখতে পাবে।
বলেই মেয়েটি ঘরের সামনের দিকের ফ্রেঞ্চ উইণ্ডোটা ধড়াম করে খুলে ছুটে গেল ব্যালকনিতে। আর আমরা ঘরের ভেতরে দাঁড়িয়ে পূর্বদিকের অন্ধকার আকাশ ভেদ করে গজিয়ে ওঠা অসংখ্য তুবড়ির আলোর মালা নকশা দেখতে পেলাম। দেখতে দেখতে লাল নীল হলুদ রুপোলি তারার মালা গেঁথে যেতে লাগল আকাশের গায়ে। শুরু হল তুবড়ির দ্বৈরথ। একটা তুবড়ি আকাশে উঠে গেলে আরেকটা শূন্যে তাকে ধাওয়া করে এগিয়ে আসে মোকাবিলার জন্য। তুবড়ি আর বাজির আলোর ঝলকানি থেকে থেকে আমাদের ঘরের ভেতরটা দিন করে তুলছে। ব্যালকনির রট আয়রনের রেলিং ধরে তাই দেখে আনন্দে, উচ্ছাসে লাফিয়ে উঠছে পরিচারিকা মেয়েটি। সেপ্টেম্বরের পনেরো সহসা এক ক্রিসমাস হতে শুরু হয়ে গেছে কারোনে। হোটেলের সামনের রাস্তা ধরে বয়ে চলেছে আনন্দে জেগে ওঠা মানুষের এক দীর্ঘ মিছিল। গোটা নগর উৎসবে উদবেল, কিন্তু আমার আর ইন্দুর মনের মধ্যে স্মৃতির আলো-আঁধারির বন্যা আর বেদনার বিক্ষোভ। আমরা কেউ কারও দিকে প্রায় চাইতে পারছি না, কারণ আমাদের নিজেদের এখনকার মুখ দুটোকে দুটো মুখোশ মনে হচ্ছে, যার পিছনে আড়াল হয়ে আছে দুটো সুপ্রাচীন মুখ। পল ও এলিজাবেথ তুরনরের মুখ।
আস্তে আস্তে মিছিলের ট্যাবলো এল আমাদের ব্যালকনির ঠিক নীচে। আমার মা, বহু জন্ম আগের মা, ক্যারিন তুরনরের চেহারার আদলে এক মহিলাকে সাজিয়ে ঠেলাগাড়ির ওপর দাঁড় করানো হয়েছে। তাঁকে এক কাঠের চিতায় হাঁটু গেড়ে বসতে হয়েছে যেমনটি কিছুক্ষণ আগে দেখেছি ঘরের চারকোল ড্রয়িংটাতে। শিল্পীর আঁকা এই দৃশ্যটার যেন নিখুঁত পুনর্গঠন এই ট্যাবলো। পাশে পাদ্রি সেজে এক পুরুষ। তার হাতে বাইবেল। অন্য পাশে জনাকয়েক জল্লাদবেশী যুবক। আর সবার মাঝখানে মাদার জোয়ানার বেশে একজন মহিলা। হঠাৎ মাদার জোয়ানার ওই চেহারায় চোখ পড়তেই বুকটা ছাঁৎ করে উঠল। ভীষণ চেনা চেনা মুখটা যেন। এত চেনা, কিন্তু কিছুতেই ঠাওরে উঠতে পারছি না সে কে। সে কি সেই পূর্বজন্মের কেউ? নাকি এই জন্মের এমন কেউ যাকে মনে না পড়াটা গর্হিত অপরাধ। কিন্তু না, কিছুতেই আমার মানুষটাকে মনে পড়ছে না। মানুষটা আমার মনের মধ্যে থেকেও হারিয়ে গেছে।
