আমার সংবিৎ ফিরল ইন্দুর হাতের টানাটানিতে। চমকে উঠে ওর দিকে চাইতেই ও প্রথমে আমাকে আঙুল দিয়ে দেখাল ওবেলিস্কের ফলকে খোদাই একটা নাম—এলিজাবেথ তুরনর! তারপর ছোটো ছোটো হরফে লেখা—ডাইনিবৃত্তির জন্য এবং স্থানীয় কৃষকদের মঙ্গলের জন্য এখানে আগুন ও ইস্পাতের দ্বারা নিহত। যুবতী ডাইনি মরণকালে তার আসল বৃদ্ধ শরীর ধারণ করে। তার চিতায় প্রথম অগ্নিসংযোগ করেন স্থানীয় স্যাঁৎ বেলার্দিন গির্জার প্রধান পুরোহিত মাদার জোয়ানা। যিনি পরে ডাইনির আত্মার শুদ্ধির জন্য গির্জার বাইরে ধর্মীয় মতে পূজার্চনা পরিচালনা করেন। ডাইনি এলিজাবেথ তুরনরের মৃত্যুর পর এ অঞ্চল ফের শস্যশ্যামলা হয়ে ওঠে।
ইন্দু বলল, ওগো! আমার মাথা ঘুরছে। আমি এখানে আর এক মুহূর্তও দাঁড়িয়ে থাকতে পারব না। চলো যেখানে একটা হোটেল পাই ঢুকে পড়ি। আমার মাথাটা কীরকম গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। আমার ঘুম পাচ্ছে।
মাথার ভেতর গোলমাল বাঁধছিল আমারও। অদ্ভুত, অদ্ভুত সব দৃশ্য ভেসে উঠেছিল চোখের সামনে। আমার কেন জানি না মনে হচ্ছিল যে, আমি আর লিজা এখান থেকে পালিয়ে মার্সেই বন্দরে জাহাজ ধরে চন্দননগরের দিকে রওনা হতে এই মূখ কৃষকগুলো আমার মাকেই ডাইনি সাব্যস্ত করে এখানে এনে পুড়িয়ে মারে। গায়ে আগুন লাগতে আমার মা জননী নিশ্চয়ই আমার নাম ধরে ‘পল! পল! বলে কেঁদে উঠেছিলেন। আর তখন নিশ্চয়ই পৈশাচিক হাসি হেসে শহরের বদমায়েশ পাদ্রিগুলো ঠাট্টা করেছিল, চোপ মাগি! ভূতের মুখে আবার সেন্ট পলের নাম! মর শালী, দেশখাগানি! এসব ভাবতে ভাবতে আর ইন্দুর হাত ধরে ঝড়ের গতিতে রাস্তা পার হতে গিয়ে দু-জনেই আমরা চাপা পড়তে বসেছিলাম একটা ট্রাকের চাকায়। বিরক্ত ড্রাইভারকে জানালার বাইরে মুখ বার করে ধমকে উঠতে শুনলাম, ডাইনির ফেরে পড়লে নাকি হাঁদারাম!
আমরা সত্যি সত্যিই ডাইনির ফেরে পড়েছিলাম। কারণ হোটেলের ঘরে ঢুকে খাটের মাথার কাছের দেওয়ালে যে পুরোনো চারকোল ড্রয়িংটা ঝুলে থাকতে দেখলাম তাও আসলে একটা ডাইনি হত্যার দৃশ্য। আমি বহুক্ষণ একদৃষ্টে ছবিটার দিকে তাকিয়ে আছি দেখে হোটেলের পরিচারিকা মেয়েটি বলে উঠল, ওটা তো কারোনের সেই বিখ্যাত ডাইনিকে পুড়িয়ে মারার ছবি। ও ছবি এখানকার সব বাড়িতেই থাকে। স্টেশনে এই ছবির ছোটো ছোটো প্রিন্টও বিক্রি হয়।
পরিচারিকা মেয়েটি একটু বেশি কথা বলে, কিন্তু ইন্দু দেখলাম ওর কথাবার্তা বেশ উপভোগ করছে। ইন্দু ওকে জিজ্ঞেস করল, সেই বিখ্যাত ডাইনির নাম কি এলিজাবেথ তুরনর? সঙ্গে সঙ্গে সম্মতি জানিয়ে মেয়েটি বলল, মে উই! অবশ্যই! তুমি তো সব জানো দেখছি! কী করে জানলে? ইন্দু বলল, আমরা এখানে আসবার পথে ডাইনির চকে নেমেছিলাম। সেখানে পাথরের গায়ে ওই নামটা লেখা আছে দেখলাম।
এরপর ওই ফাম দ্য মেনাজ বা পরিচারিকা মেয়েটি যা করল তা প্রায় অবিশ্বাস্য। ও কার্পেটমোড়া মেঝেতেই পা টিপে টিপে ইন্দুর কানের কাছে এসে খুব গোপন তথ্য ফাঁস করার ভঙ্গিতে বলল (যা অবিশ্যি পাঁচশত ফুট দূরে দাঁড়িয়ে আমিও শুনতে পেলাম স্পষ্ট), কিন্তু জানো তো, আসল এলিজাবেথ তুরনরকে ওরা কিন্তু ধরতে পারেনি। সে তার স্বামী পলের সঙ্গে পালিয়ে গিয়েছিল প্রাচ্যের কোনো দেশে। ওরা সেই ডাইনির নিরীহ, বৃদ্ধা শাশুড়িকে এনে পুড়িয়ে মেরেছিল। বৃদ্ধা তখন একনাগাড়ে ঈশ্বর ও নিজের ছেলেকে ডেকে যাচ্ছিলেন। ভিড়ের মধ্যে কেউ কেউ যখন প্রতিবাদ করল যে, এই বৃদ্ধা আসলে এলিজাবেথ তুরনর নয়, তখন স্থানীয় পাদ্রিরা তাদের মুখ বন্ধ করার জন্য বলে, ডাইনির আসল বয়স এটাই। ও আগে যুবতীর ভেক ধরে থাকত। কিন্তু তাতেও সব মানুষের পুরোপুরি বিশ্বাস জন্মায়নি।
তখন মানুষের কতটা কী বিশ্বাস হয়েছিল জানি না, কিন্তু স্পষ্ট অনুভব করলাম যে, আমার ভেতরে একটা গভীর বিশ্বাস ক্রমশ গড়ে উঠছে। বিশ্বাসটা হল যে, সুপ্রাচীন এক শাতো বা প্রাসাদকে প্রয়োজনীয় রদবদল করে এই যে, পুরোনো প্রসিদ্ধ হোটেল তৈরি হয়েছে এখানে কখনো না কখনো আমি বসবাস করেছি। বিশেষ করে এই বড়ো শোওয়ার ঘরটার চারপাশ আমার কাছে কী ভীষণ পরিচিত লাগছে। আমি ঘরের বিশাল ফ্রেঞ্চ উইণ্ডোর বিশাল পর্দাটা ফাঁক না করেও বুঝতে পারছি ওই জানালার কাচে চোখ রাখলে আমি কি দেখতে পাব একটা সবুজ বাগান একটু একটু করে উঠতে উঠতে একটা জংলি টিলায় গিয়ে মিশেছে। ওই টিলার
ওপর গিয়ে দাঁড়ালে নগরের ধার বেয়ে বয়ে যাওয়া নদীটা দেখা যাবে। ওই টিলার ওপর থেকে আমি একবার গড়িয়ে পড়েছিলাম নদীতে। তিন বন্ধু—আমি, ফ্রাঁসোয়া আর লোর একটা শেয়ালকে তাড়া করে টিলার ওপর গিয়ে চড়েছিলাম। কিন্তু টিলা থেকে নামবার সময় শেয়ালটা গতিবেগ এইসান বাড়িয়ে দিল (ওরা পারেও বাবা!) যে ওর পিছনে ধাওয়া করতে গিয়ে আমি টাল হারিয়ে ছিটকে পড়লাম জলে। আর সঙ্গে সঙ্গে ধরল সর্দি।
এই সময়েই একটা প্রকান্ড হাঁচি দিল পরিচারিকা মেয়েটি এবং ভয়ানক অভব্যতা হয়েছে দেখে ‘পার্দো মসিয়র!’ ‘পার্দো মাদাম’ ইত্যাদি বলে বলে ক্ষমা চাইতে চাইতে ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে গেল। আর তারপর বহুক্ষণ নীরব থেকে ঘরের চারপাশ ঘুরে ঘুরে দেখে, কীরকম একটা ঘোরের মধ্যে থেকে উঠে এসে ইন্দু কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, জানো তো, ঢুকে অবধি আমার সমানে মনে হচ্ছে এই ঘরটাতে কোনো না কোনো সময়ে আমি থেকেছি। আর শুধু আমি নই, তুমি আর আমি দু-জনেই। নিশ্চয়ই কোনো পূর্বের জীবনে। কিন্তু আমি মনে করতে পারছি না সেই জীবনটা ঠিক কতকাল আগে।
