ডাঃ পট্টনায়ক চলে গেলেন। কর্নেল বাংলোর সদর দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকলেন। হাসিরাম মনমরা হয়ে বলল, আমার মাথা ঘুরছে স্যার, বমি বমি লাগছে। হাওয়ায় দুদণ্ড না বসলে আর পারব না।
কর্নেল ভাবলেন, হাসিরাম চাকরি যাবার ভয়ে ঘাবড়ে গেছে, বেচারা! সে বারান্দায় বসে পড়ল। কর্নেল ভিতরে ঢুকে ফের খুঁটিয়ে সবকিছু দেখতে থাকলেন। কিছু চোখ এড়িয়ে গেছে নাকি?
তারপর বেডরুমে ঢুকলেন। ওদিকের দরজাটা ভিতর থেকে এঁটে দিলেন। দরজার কপাটে খুনীর ছাপ থাকা সম্ভব। যাকগে, সে পরের ব্যাপার। বুকশেলফ দটোর কাছে গিয়ে দেখলেন, তালা বন্ধ রয়েছে। রাজনীতি, ফার্মিং, খেলাধুলো সংক্রান্ত নীরস বই সব। কোণের দিকে একটা টুলে একগাদা ইংরেজি পত্রিকা আছে। কর্নেল পত্রিকাগুলো উল্টে চললেন। একটু পরেই তার অবাক লাগল নিজের আচরণ। পত্রিকাগুলো এভাবে নিজের অজান্তে কেন হাতড়াচ্ছেন? কী সূত্র পাবেন বলে আশা করছেন? সেই মুহূর্তে অনুভব করলেন, তিনি যেন এই হত্যাকাণ্ডরূপী রক্তফুলে ভরা গাছটার শিকড় এই বাংলোর তলায় আবিষ্কার করতে চাইছেন। বাংলোর সঙ্গে তার যোগসূত্র আছে বলে কীভাবে যেন বিশ্বাস হয়ে গেছে অবচেতন মনে। বাংলোটা শ্ৰীমদনমোদন পানিগ্রাহীর। অতএব পরোক্ষে তাই কি এই ভদ্রলোকেরই জীবনযাত্রা হাতড়াতে ব্যস্ত হলেন? কেন? এর পিছনে কী কারণ থাকতে পারে? পানিগ্রাহীর নারীঘটিত দুর্বলতা, এই বাংলোয় স্ত্রীলোক নিয়ে নির্জনে একান্তে এসে, থাকা…এইগুলো হচ্ছে বাস্তব তথ্য বা ফ্যাক্টস। এই ফ্যাক্ট তাকে অবচেতনায় প্ররোচিত করেছে নিঃসন্দেহে। অমনি একটু অস্বস্তি হলো। পানিগ্রাহী তো এখনও আসেননি। সুইডেন থেকে পৌঁছেছে কি না তাও জানা নেই। সেটা খবরের কাগজ থেকে আগে জেনে নেওয়া উচিত ছিল। খামোকা বেচারাকে সন্দেহ করা ঠিক হচ্ছে না।
অথচ একটা কিন্তু ভাব থেকেই যাচ্ছে।…
কী একটা খচখচ করে বিধছে মনে।…
হঠাৎ একটা দৃশ্য মাথায় ভেসে এল। ডাঃ.পট্টনায়ক সিগারেট কৌটোটা : দেখামাত্র কেমন হতভম্ব হয়ে পড়েছিলেন। তার মুখের সেই বিস্ময় ও শিহরণ কর্নেলের দৃষ্টি এড়ায়নি।
বারবার মনে হলো, এটা তারই চোখের ভুল। কিন্তু…
ঠিক সেই সময় পত্রিকাটি অন্যমনস্কতার দরুন হাত থেকে পড়ে গেল। তারপর তার পাতার ফাঁকে একটা নীলরঙের খামের কোণা উঁকি মারল। খামটা বের করে নিলেন। নীল খাম। ভিতরে চিঠি রয়েছে। কোনও ডাকটিকিট নেই, পোস্টাপিসের ছাপ নেই। তার মানে হাতে-হাতে পাঠানো হয়েছে। ওপরে পানিগ্রাহীর নাম লেখা।
সাবধানে এক কোণা ধরে চিঠিটা বের করে খুললেন। পরক্ষণে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারলেন না। নানা, এ অসম্ভব। এ কী দেখছেন! আর তারিখ তো গত কালকের! ২২ জুলাই!
চিঠিটা পকেটে ভরে ফেললেন। তাঁর দৃষ্টি আচ্ছন্ন হয়ে রইল কয়েক মুহূর্তের জন্যে। পৃথিবীতে বিস্ময়কর অনেক কিছু আছে কিন্তু অসম্ভব বলে সত্যি কিছু নেই। এ যেন নীলরঙা একটা বাসায় অসম্ভবের ফুটফুটে একটি ছানা। কর্নেল চুরুট। ধরিয়ে বেরিয়ে এলেন।…
.
০৬.
মুখোশ, ছুরি ও নব-র কাণ্ড
কর্নেল একজন সেপাইয়ের জিম্মায় বাংলোর ভার দিয়ে ফার্মের জমিতে গেলেন। ডাঃ পট্টনায়ককে দেখতে পেলেন না। সেনাপতি জানালেন, ডাক্তার তার বাড়িতে গেছেন–ফোরেনসিক ল্যাবের টেবিলে বসবেন গিয়ে। তার সঙ্গে বরাবর পোর্টেবল একটা ল্যাররেটরী থাকে, কর্নেল জানেন।
আরও সব সেপাই ও অফিসার এসে গেছে ততক্ষণে। সেপাইরা ভিড় হটাচ্ছে। ইউক্যালিপটাস গাছের লম্বাটে ছায়ায় একটা টেবিল ও কিছু চেয়ার পাতা হয়েছে। সেগুলো ফার্মের আপিস থেকে আনা হয়েছে।
সেনাপতি দুজন পুলিশ অফিসারের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলেন। ওঁরা দৈবাৎ এসে পড়েছিলেন চন্দনপুর-অন-সী-তে। ইন্সপেক্টর শ্রী আচার্য আর কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরোর শ্রী শর্মা। শর্মা একটা গোপনীয় কেসের ব্যাপারে এসেছেন। কর্নেলের নাম শুনে দুজনেই লাফিয়ে উঠলেন। কারণ গর্ত শীতে কাশ্মীরে স্কি-ট্রেনিং সেন্টারের সেই জোড়া হত্যাকাণ্ড আর কর্নেলের খবর সারা ভারতবর্ষে বড়বড় কাগজগুলো ছড়িয়ে ছিল। দিল্লী রাজধানী জায়গা। সেখান থেকে কিছু প্রচারিত হলেই তা জাতীয় হয়ে ওঠে।
একটি ময়লা প্যান্ট-শার্ট পরা লোক কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তাকেই জিগ্যেসপত্তর করা হচ্ছিল এতক্ষণ। সেনাপতি বললেন, কর্নেল, মেয়েটির কিছু খবর এর কাছে পাওয়া গেল। এর নাম নবসুন্দর–দ্য শার্ক রেস্তোরাঁর কর্মী। আমাদের ইনফরমার। নব, কর্নেলসায়েবকে ব্যাপারটা ফের বলো তো। সে একটা রীতিমতো নাটক কর্নেল। নব, তুমি বলো।
নব গত রাত্রে ‘দ্য শার্কে’ যা-যা ঘটেছিল, সব আওড়ে গেল। এমন কি সেই কাগজের টুকরোগুলোর কথাও বলল। সেনাপতি কাগজের টুকরোগুলো একটা খাম বের করছিলেন, কর্নেল হাত তুলে তাকে থামালেন। তারপর বললেন, আচ্ছা নব, তোমার পুরো নাম কী?
শ্রীনবসুন্দর দাশ, স্যার।
বাড়ি কোথায়?
গ্রাম কাঠাপাড়া, পোঃ সুন্দরী, থানা..
থাক। শার্কে কদ্দিন এসেছ?
তা বছর তিনেক হলো, স্যার। একেবারে গোড়া থেকেই, বলতে পারেন।
শার্ক রাত্রে কতক্ষণ অব্দি খোলা থাকে?
রাত বারোটা অব্দি। তবে কোনও কোনও রাতে একটু দেরিও হয়।
কিন্তু তোমাদের ক্যাশবাবু গতরাতে নটায় চলে গেলেন বলেছ?
